নাঈমা অনামিকা
কমিশনিং সম্পাদক, অনিকেত বুলেটিন
বাংলাদেশে বসবাসকারী আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলো দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সামাজিক বৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো, সাঁওতাল, ম্রোসহ অর্ধশতাধিক আদিবাসী সম্প্রদায়ের সম্মিলিত জনসংখ্যা কয়েক মিলিয়ন। পার্বত্য চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, রাজশাহী এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা এসব জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে সমান অধিকার ভোগের সাংবিধানিক নিশ্চয়তা পেলেও বিচার ও আইন ব্যবস্থায় তাদের প্রতিনিধিত্ব এবং অধিকার সুরক্ষা এখনও অত্যন্ত সীমিত। বাংলাদেশের সংবিধান সকল নাগরিকের জন্য সমতা ও ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি প্রদান করলেও বাস্তবে আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলো বিচারব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে কাঠামোগত বৈষম্যের মুখোমুখি হয়। তাদের নিজস্ব সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা জাতীয় আইন কাঠামোর মধ্যে পর্যাপ্ত স্বীকৃতি পায় না, ফলে বিচারপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে তারা প্রায়শই অসুবিধার সম্মুখীন হয়।
প্রথাগত আইন ও বিচারব্যবস্থার স্বীকৃতির সংকট
আদিবাসী সমাজে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত বিভিন্ন প্রথাগত আইন ও বিরোধ নিষ্পত্তি পদ্ধতি স্থানীয় সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। চাকমা ও মারমা সম্প্রদায়ের প্রথাগত রীতি, গারোদের মাতৃতান্ত্রিক উত্তরাধিকার ব্যবস্থা কিংবা সাঁওতাল সমাজের সালিশভিত্তিক বিরোধ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া তাদের সামাজিক কাঠামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু জাতীয় বিচারব্যবস্থায় এসব প্রথাগত আইনের কোনো কার্যকর ও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি নেই। ফলে কোনো বিরোধ আদালতে গেলে আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে এমন একটি আইনি কাঠামোর মুখোমুখি হতে হয়, যা মূলত সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি সমাজের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। এর ফলে তাদের সামাজিক বাস্তবতা প্রায়শই বিচারিক প্রক্রিয়ায় উপেক্ষিত থেকে যায়।
ভাষা, সংস্কৃতি ও বিচারপ্রাপ্তির প্রতিবন্ধকতা
বিচারব্যবস্থায় প্রবেশের অন্যতম বড় বাধা হলো ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক দূরত্ব। অনেক আদিবাসী নাগরিকের মাতৃভাষা বাংলা নয়। কিন্তু আদালতের কার্যক্রম, আইনি নথিপত্র এবং বিচারিক যোগাযোগ প্রায় সম্পূর্ণরূপে বাংলাভিত্তিক। এছাড়া বিচারক, আইনজীবী কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বড় অংশ আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সামাজিক বাস্তবতা, ভূমি-সংক্রান্ত ঐতিহ্যগত অধিকার কিংবা ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির বিধান সম্পর্কে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নন। ফলে আইনের আনুষ্ঠানিক সমতা বাস্তবে অনেক সময় ন্যায়বিচারের সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়।
আইন পেশায় প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি
বাংলাদেশের আইন পেশা এবং বিচার বিভাগে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি অত্যন্ত সীমিত। এর পেছনে শিক্ষাগত ও অর্থনৈতিক বৈষম্য বড় ভূমিকা পালন করে। পার্বত্য ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ দীর্ঘদিন ধরে সীমিত থাকায় অনেক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে না। যারা আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে, তারাও প্রায়শই পেশাগত নেটওয়ার্ক, আর্থিক সক্ষমতা এবং সামাজিক সংযোগের অভাবে পিছিয়ে পড়ে।
আইন অনুষদগুলোর পাঠ্যক্রমেও আদিবাসী অধিকার, প্রথাগত আইন বা পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ আইনি বাস্তবতা সাধারণত প্রান্তিক বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে ভবিষ্যৎ আইনজীবী ও বিচারকদের বড় অংশ দেশের বহুসাংস্কৃতিক আইনি বাস্তবতা সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পায় না। অন্যদিকে উচ্চ আদালত ও বিচার বিভাগে নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও বৈচিত্র্য নিশ্চিত করার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। ফলে বিচার বিভাগের উচ্চ পর্যায় মূলত একই সামাজিক ও পেশাগত গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে যায়।
সামাজিক এবং মানবিক ক্ষতিগ্রস্থতা
এই প্রতিনিধিত্ব সংকটের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় ব্যক্তিগত ও সামাজিক পর্যায়ে। বহু মেধাবী আদিবাসী শিক্ষার্থী আইন বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেও পেশাগত সুযোগের অভাবে নিজেদের দক্ষতা বিকাশের সুযোগ হারান। বিশেষ করে আদিবাসী নারীরা জাতিগত পরিচয় এবং লিঙ্গ—উভয় ক্ষেত্রেই বৈষম্যের মুখোমুখি হন। এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন ব্যর্থতা নয়; বরং এমন একটি কাঠামোগত বাস্তবতার প্রতিফলন, যেখানে প্রতিনিধিত্ব ও অন্তর্ভুক্তিকে এখনও প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি।
প্রয়োজনীয় সংস্কার ও নীতিগত উদ্যোগ
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিস্থিতির উন্নয়নে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
প্রথমত, বিচার বিভাগীয় নিয়োগ ও বিচারিক সেবার পরীক্ষায় আদিবাসী প্রার্থীদের জন্য কার্যকর প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন শিক্ষায় আদিবাসী অধিকার, প্রথাগত আইন এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি সম্পর্কিত বিষয়গুলো বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য ভাষাগত ও সাংস্কৃতিকভাবে সক্ষম আইনগত সহায়তা কেন্দ্র গড়ে তোলা জরুরি, যাতে তারা সহজে আইনি পরামর্শ ও সহায়তা পেতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রথাগত আইন ও বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান করা। এতে একদিকে স্থানীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শিত হবে, অন্যদিকে বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা বৃদ্ধি পাবে। একটি বিচারব্যবস্থার প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে তার অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রের ওপর। যদি কোনো জনগোষ্ঠী ভাষা, সংস্কৃতি, প্রতিনিধিত্ব কিংবা কাঠামোগত বৈষম্যের কারণে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়, তবে সেই বিচারব্যবস্থা তার মৌলিক উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারে না।
বাংলাদেশের রয়েছে সাংবিধানিক ভিত্তি, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নীতিগত অঙ্গীকার, যাতে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তিকে বিশেষ সুবিধা নয়, বরং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একটি সত্যিকারের ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে হলে বিচারব্যবস্থাকে দেশের সকল নাগরিকের জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত ও প্রতিনিধিত্বশীল হতে হবে।
