ফারাহ জেহির
অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
সাম্প্রতিক সময়ে সংবাদপত্রে প্রকাশিত গবেষক পাভেল পার্থের ‘আমাদের অরক্ষিত প্রাণবৈচিত্র্য বনাম অসম বাণিজ্যচুক্তি’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি পড়ার পর অত্যন্ত গভীরভাবে মনে হয়েছে যে, দেশীয় সম্পদ রক্ষা ও বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার স্বার্থে এই বিষয়ে আরও একটি কঠোর ও সমালোচনামূলক মূল্যায়ন প্রয়োজন। আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত, যেকোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরের আগে এর প্রতিটি নিয়মকানুন ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অত্যন্ত সতর্কতার সাথে স্টাডি করা, যাতে আমরা আমাদের ঐতিহ্য চিরতরে হারিয়ে না ফেলি। বহির্বিশ্বে নিজেদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আগে আমাদের প্রথমে নিজস্ব সম্পদ দিয়ে দেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে হবে এবং দেশের মানুষের চাহিদা মেটাতে হবে। যেকোনো দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় বাণিজ্যচুক্তি অবশ্যই বাংলাদেশের নিজস্ব অনুকূলে হতে হবে, আন্তর্জাতিক বাজারের চাপ বা মর্জির ওপর ভিত্তি করে নয়।
আমাদের মনে রাখা দরকার, বাংলাদেশের এই প্রাকৃতিক সম্পদ ও লোকায়ত ঐতিহ্য আজ নতুন নয়; এটি ব্রিটিশ আমল থেকেই বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত। সেই ঔপনিবেশিক যুগে বিদেশি শাসকেরা এই উর্বর ভূখণ্ডের ওপর নজর দিয়েছিল, আমাদের এদেশীয় মানুষকে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটিয়েছিল এবং আমাদের উৎপাদিত অত্যন্ত দামী ও মূল্যবান সম্পদ এদেশ থেকে লুটে নিয়ে নিজেদের আখের গুছিয়েছিল। ঢাকাই মসলিন থেকে শুরু করে নীল, রেশম বা মসলা, সবকিছুই ছিল বিশ্বসেরা। আজ স্বাধীন দেশ হিসেবে আমাদের সেই গৌরব ও আত্মমর্যাদা ফিরিয়ে আনার সময় এসেছে। আমাদের বৈচিত্র্যময় সম্পদকে বৈশ্বিক দরবারে এমনভাবে তুলে ধরতে হবে যেন আমরা বিশ্বমঞ্চে এক নম্বর রাষ্ট্র হিসেবে বুক ফুলিয়ে গর্ব করতে পারি। কিন্তু তার আগে এই ঐতিহ্যবাহী সম্পদকে নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করা এবং এর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা আমাদের পরম দায়িত্ব।
এই প্রেক্ষাপটে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানের সাথে করা চুক্তিগুলোর আইনি ও বাণিজ্যিক দিকগুলো গভীরভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি। চুক্তিতে উল্লেখিত ট্রিপস (TRIPS) চুক্তির ২৭.৩(খ) ধারা এবং ইউপিওভি (UPOV)-এর মতো শর্তগুলো আমাদের দেশীয় জিআই পণ্য এবং স্থানীয় কৃষকদের অধিকারকে চরম হুমকির মুখে ফেলছে। ইউপিওভি মূলত বড় প্রজননবিদদের স্বার্থ রক্ষা করে, যার ফলে আমাদের স্থানীয় কৃষকদের বহু কষ্টের উদ্ভাবন, যেমন সাতক্ষীরার লবণসহনশীল ‘চারুলতা’ ধান কিংবা রাজশাহীর খরাসহিষ্ণু ‘নূর ধান’, তাদের ন্যায্য স্বীকৃতি ও আইনি সুরক্ষা হারাবে। একইভাবে, মার্কিন চুক্তির ২.৪ অনুচ্ছেদের ফাঁদে পড়ে আমাদের জামদানি, টাঙ্গাইল শাড়ি বা সুন্দরবনের মধুর মতো জিআই পণ্যের মৌলিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে যদি প্রশ্ন তোলা হয়, তবে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো আমাদের এই ঐতিহাসিক নামগুলো তাদের নিজস্ব পণ্যে ব্যবহারের বৈধতা পেয়ে যাবে। এই ধরনের প্রাণডাকাতি বা বায়োপাইরেসি রুখতে সরকারকে অবিলম্বে আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোর শর্ত পুনঃমূল্যায়ন করতে হবে।
সর্বোপরি, আমাদের এই অমূল্য প্রাকৃতিক ও জাতীয় সম্পদ যারা ধ্বংস করছে, তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে এখনই আপসহীন ও কঠোরতম অবস্থান নিতে হবে। সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র, শালবনের প্রাকৃতিক পরিবেশ কিংবা সিলেটের ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটির মূল ভিত্তি ‘মুর্তা গাছ’ ও স্থানীয় উদ্ভিদ যারা নির্বিচারে ধ্বংস করছে, তারা দেশের শত্রু। সরকারের উচিত একটি সুনির্দিষ্ট ‘সুই জেনেরিস’ বা বিশেষ আইনি কাঠামো তৈরি করা এবং দেশের সম্পদ বিনষ্টকারীদের জন্য দৃষ্টান্তমূলক ও সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করা। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি আমাদের নদী-নালা দূষণ, বন উজাড় বা প্রাণসম্পদ পাচারের মাধ্যমে এই প্রাকৃতিক ঐতিহ্যকে বিপন্ন করে, তবে তাদের আইনগতভাবে কঠোর শাস্তি ও দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড দিতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের ঐতিহ্যের স্বীকৃতি ও অর্থনৈতিক লাভ যেমন দরকার, তার চেয়ে কোটি গুণ বেশি জরুরি দেশের অভ্যন্তরে আমাদের নিজস্ব সম্পদের সার্বভৌমত্ব, আইনি সুরক্ষা এবং জাতীয় স্বার্থ নিশ্চিত করা।
