হাসান হামিদ
সি ইউ ই টি
বিশ্বের যেসব দেশ সৌর শক্তি ব্যবহারের জন্য সবচেয়ে অনুকূল অবস্থানে রয়েছে, বাংলাদেশের নাম তাদের মধ্যে অন্যতম। উচ্চ সূর্যালোক প্রাপ্ত অঞ্চলে অবস্থান, বছরের অধিকাংশ সময় পর্যাপ্ত রোদ পাওয়া এবং দ্রুত নগরায়ণ ও জীবনমান বৃদ্ধির কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি, সব মিলিয়ে দেশটির সামনে সৌর শক্তিকে ভবিষ্যৎ জ্বালানি ব্যবস্থার একটি মূল ভিত্তি হিসেবে গড়ে তোলার বাস্তব সুযোগ রয়েছে।
ফটোভোলটাইক প্রযুক্তির খরচ দ্রুত কমে আসায় এই সম্ভাবনা আরও শক্তিশালী হয়েছে। তবে ভৌগোলিক সুবিধাকে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তায় রূপান্তর করতে কেবল প্যানেল বসানো যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন একটি সুসমন্বিত ও সংস্কারমুখী কৌশল, যেখানে অর্থায়ন, অবকাঠামো, ভূমি ব্যবস্থাপনা, শিল্পনীতি এবং সামাজিক ন্যায়বিচার একসঙ্গে বিবেচিত হবে।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছে যে বড় পরিসরে সৌর শক্তি বাস্তবায়ন সম্ভব। অফ গ্রিড সৌর বিদ্যুৎ কর্মসূচির মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ গ্রামীণ পরিবার বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে। পাশাপাশি কয়েকটি ইউটিলিটি স্কেল প্রকল্প এবং পাবলিক প্রাইভেট অংশীদারিত্বও চলছে। তবে এই অগ্রগতি এখন একটি সীমায় পৌঁছেছে।
বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা এখনো সতর্ক অবস্থানে আছেন। অর্থায়নের ঘাটতি, উচ্চ ঝুঁকির ধারণা এবং অনিয়মিত নীতিমালা, বিশেষ করে ট্যারিফ কাঠামোর অস্থিতিশীলতা, দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং অনির্দিষ্ট ক্রয়নীতি, এসব কারণে বিনিয়োগ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।
গ্রিড ব্যবস্থাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সীমিত বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ক্ষমতা এবং পুরনো অবকাঠামোর কারণে সৌর শক্তির অনিয়মিত উৎপাদন অনেক সময় পুরোপুরি গ্রহণ করা যায় না, ফলে উৎপাদিত বিদ্যুৎ অপচয় হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। একই সঙ্গে ভূমির স্বল্পতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে, কারণ বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর একটি হিসেবে বাংলাদেশে কৃষি জমি ও বসতির সঙ্গে বড় সৌর প্রকল্প প্রতিযোগিতায় পড়ে।
এই বাধাগুলো অতিক্রম করার প্রথম শর্ত হলো নিয়ন্ত্রক কাঠামোর স্পষ্টতা। বাংলাদেশের প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি, প্রযুক্তি নিরপেক্ষ নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্য এবং ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য ক্রয় পরিকল্পনা, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য আস্থার পরিবেশ তৈরি করবে।
লাইসেন্সিং ও ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াকে একক ডিজিটাল ব্যবস্থায় নিয়ে আসা জরুরি, যেখানে সব কিছু এক জানালা পদ্ধতিতে সম্পন্ন হবে। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় কমবে এবং ব্যয়ও নিয়ন্ত্রণে থাকবে। একই সঙ্গে স্থিতিশীল ট্যারিফ কাঠামো, দীর্ঘমেয়াদি পাওয়ার পারচেজ এগ্রিমেন্ট এবং স্বচ্ছ প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ব্যবস্থা বিনিয়োগ ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অর্থায়নের ক্ষেত্রে ব্লেন্ডেড ফাইন্যান্স একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে, যেখানে ছাড়মূলক ঋণ, গ্যারান্টি এবং ইকুইটি একত্রিত করে মূলধন ব্যয় কমানো যায় এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা সম্ভব হয়। গ্রিন ব্যাংকিং ব্যবস্থা, স্থানীয় মুদ্রাভিত্তিক ঋণ এবং পে অ্যাজ ইউ গো মডেল সৌর শক্তিকে সাধারণ পরিবার ও ছোট ব্যবসার জন্য আরও সহজলভ্য করবে।
গ্রিড আধুনিকীকরণও সমান গুরুত্বপূর্ণ, স্মার্ট মিটার, ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, উন্নত বিতরণ নেটওয়ার্ক এবং ব্যাটারি সংরক্ষণ ক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সৌর শক্তিকে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুতে রূপান্তর করা সম্ভব হবে।
ভূমি সংকট মোকাবিলায় স্মার্ট ব্যবহার একটি বাস্তবসম্মত পথ। জলাশয় ও খালে ভাসমান সৌর প্রকল্প, কৃষিজমির সঙ্গে একসঙ্গে ব্যবহারের অ্যাগ্রিভোলটাইক ব্যবস্থা, শহর ও শিল্প ভবনের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন এবং অনুৎপাদনশীল জমি ব্যবহার করে বড় ধরনের ক্ষতি ছাড়াই উল্লেখযোগ্য উৎপাদন সম্ভব।
যেসব অঞ্চলে গ্রিড সম্প্রসারণ অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নয়, সেখানে কমিউনিটি ভিত্তিক মাইক্রোগ্রিড গুরুত্বপূর্ণ সমাধান হতে পারে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই রূপান্তরের সুফল যেন সবার মধ্যে সমানভাবে পৌঁছে। স্থানীয় পর্যায়ে সৌর উপাদান উৎপাদন, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, কমিউনিটি মালিকানা মডেল এবং নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি নিশ্চিত করতে পারলে সৌর বিপ্লব কেবল প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নয়, বরং সামাজিক ন্যায়বিচারের একটি মাধ্যম হয়ে উঠবে।
পরিবেশগত দিকেও দায়িত্বশীলতা জরুরি। প্রকল্প নির্বাচন, ব্যবহৃত প্যানেলের পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা এবং জীববৈচিত্র্য সুরক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে যাতে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির এই যাত্রা নিজেই নতুন পরিবেশগত সমস্যার জন্ম না দেয়।
বাংলাদেশের সূর্যালোক যেমন প্রাচুর্যময়, তেমনি এটি সবার জন্য উন্মুক্ত। জ্বালানি নীতিও তেমনই হওয়া উচিত, সবার জন্য সমান সুযোগ, দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা এবং টেকসই ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা।
