নাঈমা অনামিকা
কমিশনিং সম্পাদক, অনিকেত বুলেটিন
বাংলাদেশে ব্যবহৃত সীসা-অ্যাসিড (Lead-Acid) ব্যাটারির পুনর্ব্যবহার বর্তমানে এক গভীর জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত সংকটে পরিণত হয়েছে। শিল্পায়ন, নগরায়ন এবং বৈদ্যুতিক তিনচাকার যানবাহনের দ্রুত বিস্তারের ফলে ব্যবহৃত ব্যাটারির পরিমাণ ক্রমাগত বাড়ছে। কিন্তু এই বিপুল পরিমাণ ব্যাটারির অধিকাংশই নিরাপদ ও পরিবেশসম্মত উপায়ে পুনর্ব্যবহার না হয়ে অনিয়ন্ত্রিত ও অবৈধ কারখানায় প্রক্রিয়াজাত হচ্ছে। ফলে সীসা দূষণ আজ বাংলাদেশের অন্যতম গুরুতর অথচ তুলনামূলকভাবে উপেক্ষিত সংকট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
সংকটের বর্তমান চিত্র
বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ২ লাখ টন সীসা বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার প্রায় ৮০ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক ও অবৈধ পুনর্ব্যবহার কেন্দ্রের মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এসব কারখানায় ব্যবহৃত অপরিকল্পিত ও নিম্নমানের প্রযুক্তির কারণে মোট সীসার ১০ থেকে ২০ শতাংশ সরাসরি পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে বাতাস, মাটি ও পানি মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী সীসা দূষণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশ বর্তমানে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। দেশের পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের প্রায় ৩৮ শতাংশের রক্তে স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেশি সীসা পাওয়া যায়। গবেষণা অনুযায়ী, সীসাজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি ও উৎপাদনশীলতা হ্রাসের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রতিবছর প্রায় ২৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ ক্ষতি হয়, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (GDP) প্রায় ৮ শতাংশের সমান।
কেন প্রাধান্য পাচ্ছে অনানুষ্ঠানিক পুনর্ব্যবহার
এই পরিস্থিতি কেবল আইন প্রয়োগের দুর্বলতার ফল নয়; বরং এটি একটি সুস্পষ্ট বাজারব্যর্থতার (Market Failure) উদাহরণ। অনানুষ্ঠানিক পুনর্ব্যবহারকারীরা কর, পরিবেশগত মানদণ্ড ও নিরাপত্তা বিধি এড়িয়ে চলার মাধ্যমে উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে ফেলতে সক্ষম হয়। ফলে তারা বৈধ ও পরিবেশবান্ধব পুনর্ব্যবহারকারীদের তুলনায় অধিক প্রতিযোগিতামূলক হয়ে ওঠে। এখানে তথাকথিত “লেমনস প্রবলেম” (Lemons Problem)ও বিদ্যমান। সাধারণ ভোক্তারা দীর্ঘস্থায়ী ও মানসম্পন্ন ব্যাটারি এবং নিম্নমানের ব্যাটারির মধ্যে পার্থক্য সহজে বুঝতে পারেন না। ফলে উৎপাদকদের মানোন্নয়নের উৎসাহ কমে যায় এবং স্বল্পস্থায়ী ব্যাটারির ব্যবহার বৃদ্ধি পায়।
দেশজুড়ে ১,১০০-এরও বেশি অনানুষ্ঠানিক পুনর্ব্যবহার কেন্দ্র রয়েছে, যাদের অধিকাংশই আবাসিক এলাকায় অবস্থিত। এসব কারখানায় খোলা পরিবেশে সীসা গলানো হয়, যার ফলে বিষাক্ত ধোঁয়া, অ্যাসিড ও সীসাযুক্ত বর্জ্য আশপাশের পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে। শুধু শ্রমিকরাই নয়, তাদের পরিবার ও স্থানীয় জনগণও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে শিশুরাও এসব কাজে জড়িত থাকে এবং দূষিত এলাকায় বসবাসকারী শিশুদের একটি বড় অংশ প্রতিদিন সীসাদূষিত পরিবেশের সংস্পর্শে আসে।
জনস্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব
সীসা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত বিষাক্ত একটি ধাতু। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এটি মস্তিষ্কের বিকাশে স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে। বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা হ্রাস, শিক্ষাগত দুর্বলতা, আচরণগত সমস্যা, স্নায়বিক জটিলতা এবং শারীরিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির জন্য সীসা দায়ী। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রেও সীসা দূষণ উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি রোগ, হৃদরোগ এবং প্রজননস্বাস্থ্যজনিত জটিলতার কারণ হতে পারে। ফলে এটি কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়; বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি মানবসম্পদ উন্নয়ন সংকট।
কার্যকর নীতিগত সংস্কারে যেসব পদক্ষেপ প্রয়োজন
এই সংকট মোকাবিলায় বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; বরং একটি সমন্বিত ও বহুমাত্রিক নীতিমালা প্রয়োজন।
প্রথমত, Extended Producer Responsibility (EPR) আইন প্রণয়নের মাধ্যমে ব্যাটারি উৎপাদকদের ব্যবহৃত ব্যাটারি সংগ্রহ ও নিরাপদ পুনর্ব্যবহারের দায়িত্ব বাধ্যতামূলক করতে হবে। এর ফলে উৎপাদকরা তাদের পণ্যের সম্পূর্ণ জীবনচক্রের জন্য জবাবদিহির আওতায় আসবে। দ্বিতীয়ত, নতুন ব্যাটারি বিক্রয়ের সময় একটি Smelting Fee বা গলন ফি আরোপ করা যেতে পারে। এই অর্থ পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারকারী বৈধ পুনর্ব্যবহার প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ভর্তুকি হিসেবে ব্যবহার করা হলে অনানুষ্ঠানিক খাতের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা কমবে।
তৃতীয়ত, শুল্ক কাঠামো পুনর্বিন্যাস করে সীসা-নির্ভর প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং তুলনামূলক নিরাপদ লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি ব্যবহারে উৎসাহ প্রদান করা যেতে পারে। তবে নিম্নমানের ব্যবহৃত লিথিয়াম ব্যাটারি আমদানি বা বাজারজাতকরণ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। চতুর্থত, প্রতিটি ব্যাটারির উৎপাদন থেকে পুনর্ব্যবহার পর্যন্ত পুরো যাত্রাপথ পর্যবেক্ষণের জন্য QR Code-ভিত্তিক ট্রেসেবিলিটি ব্যবস্থা চালু করা জরুরি। এর মাধ্যমে ব্যাটারির গন্তব্য ও পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
পঞ্চমত, জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার অংশ হিসেবে রক্তে সীসার মাত্রা পর্যবেক্ষণ কর্মসূচি চালু করতে হবে। জেলা পর্যায়ে নিয়মিত পরীক্ষার মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল শনাক্ত করা এবং নীতিমালার কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা সহজ হবে।
উপসংহার
বাংলাদেশের সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারি পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থা বর্তমানে একটি ভঙ্গুর ও অকার্যকর চক্রে আটকে আছে। সমস্যার সমাধান সম্পর্কে নীতিনির্ধারকদের কাছে ধারণা ও উদাহরণ উভয়ই বিদ্যমান, কিন্তু সমন্বিত বাস্তবায়নের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। সীসা দূষণের কারণে শিশুদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ব্যাহত হওয়া এবং জাতীয় অর্থনীতির বিপুল ক্ষতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।
অতএব, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে এখনই কার্যকর আইন, শক্তিশালী তদারকি এবং সমন্বিত নীতিগত সংস্কার বাস্তবায়ন করা অপরিহার্য। অন্যথায়, এই নীরব বিষক্রিয়া বাংলাদেশের মানবসম্পদ ও উন্নয়নের সম্ভাবনাকে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
