সৌমিলি চট্টোপাধ্যায়
বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়, দুবাই
পরিষ্কার বাতাস একটি অভিন্ন জনসম্পদ বা পাবলিক গুডের সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে দূষিত দুই শহরে এই মৌলিক সম্পদকে ক্রমেই নেতিবাচক বহিঃপ্রভাবের বর্জ্যভাণ্ডারে পরিণত করা হচ্ছে।
ঢাকা ও নয়াদিল্লি উভয়ই এমন দুটি রাজধানী, যেখানে মানুষের জীবনধারণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ, বাতাসের মান, ক্রমাগত অবনতির দিকে যাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) যেখানে বায়ুর মানের জন্য প্রতি ঘনমিটারে ৫ মাইক্রোগ্রাম (μg/m³) পিএম ২.৫ মাত্রাকে নিরাপদ সীমা হিসেবে নির্ধারণ করেছে, সেখানে ২০২৫ সালে ঢাকায় পিএম ২.৫ এর ঘনত্ব ছিল ৬৮ μg/m³, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিত মাত্রার ১৩ গুণেরও বেশি। অন্যদিকে নয়াদিল্লিতে এই মাত্রা আরও ভয়াবহ, যেখানে বার্ষিক গড় প্রায় ৮৮ μg/m³।
এই দুই শহরের জন্য বায়ুদূষণ কেবল পরিবেশগত ব্যর্থতার বিষয় নয়। এর প্রভাব স্পষ্ট হচ্ছে মানুষের আয়ু কমে যাওয়া, হাসপাতালের শয্যায় চাপ বৃদ্ধি এবং শিশুদের শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যার মধ্যে।এই প্রবন্ধে দুই রাজধানীর পরিবেশগত বাস্তবতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ বাতাস নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নীতিগত সংস্কার বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর দুর্বলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা
নয়াদিল্লির ভয়াবহ বায়ুদূষণের পেছনে রয়েছে যানবাহনের ধোঁয়া, শিল্পকারখানার নির্গমন এবং নির্মাণকাজের ধুলা। শীতকালে শহরের ভৌগোলিক অবস্থান, বিশেষ করে ইন্দো গাঙ্গেয় সমভূমির আবহাওয়া ও ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে দূষিত বায়ু আটকে থাকে।
ভারতের জাতীয় নির্মল বায়ু কর্মসূচি (NCAP) এর মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় পিএম ২.৫ মাত্রা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও দিল্লির শীতকালীন দূষণ নিয়ন্ত্রণ এখনো কঠিন হয়ে আছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলোতে কৃষিজমির ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানো। অর্থনীতির ভাষায় এটি একটি আঞ্চলিক নেতিবাচক বহিঃপ্রভাবের উদাহরণ, যেখানে দিল্লির দূষণের বড় অংশের উৎস শহরের বাইরে।
অন্যদিকে ঢাকার বায়ুদূষণের উৎস মূলত অভ্যন্তরীণ। পুরোনো ও দূষণকারী ইটভাটা, খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানো, পুরোনো বাস ও তিন চাকার যানবাহনের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং অপরিকল্পিত দ্রুত নগরায়ণ এই সংকটকে তীব্র করেছে।
এই দূষণের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলেও বাস্তবে তা হচ্ছে না। পরিবেশ অধিদপ্তরের (DoE) কার্যক্রম অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও শিল্পগোষ্ঠীর প্রভাবের কারণে দুর্বল হয়ে পড়ে। শক্তিশালী স্থানীয় শিল্পের চাপের কারণে জরিমানা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা কঠিন হয়ে যায়।
বায়ুদূষণ: একটি বৈষম্যমূলক অর্থনৈতিক কর
প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার বাইরে বায়ুদূষণের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে অর্থনীতির ওপর, বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর।উচ্চ আয়ের মানুষ পরিবেশগত ঝুঁকি থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখার সামর্থ্য রাখেন। কিন্তু নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সেই সুযোগ সীমিত।
যখন দুই শহরের কর্তৃপক্ষ দূষণের মাত্রা বেড়ে গেলে মানুষকে ঘরে থাকার পরামর্শ দেয়, তখন উচ্চ আয়ের কর্মীরা বায়ু পরিশোধন সুবিধাযুক্ত অফিস বা ঘরে আশ্রয় নিতে পারেন। অন্যদিকে শ্রমজীবী মানুষকে বেছে নিতে হয়, হয় আয় হারানো, অথবা বিষাক্ত বায়ু গ্রহণ করে কাজ চালিয়ে যাওয়া। এই দূষণের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তাদের স্বাস্থ্য ও কর্মক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
ঢাকার অনেক নিম্নআয়ের পরিবার এখনো জ্বালানি হিসেবে কাঠ ও কৃষিজ অবশিষ্টাংশের মতো জৈব জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে তারা বাইরের বায়ুদূষণের পাশাপাশি ঘরের ভেতরের দূষণেরও শিকার হয়। হাসান ও মেহেদী হাসানের (২০২৩) গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকা বিভাগের গ্রামীণ এলাকার ৮২ শতাংশ পরিবার এখনো প্রধান জ্বালানি হিসেবে জৈব জ্বালানি ব্যবহার করে।
অন্যদিকে নয়াদিল্লিতে গৃহস্থালি পর্যায়ে জৈব জ্বালানির ব্যবহার অত্যন্ত কম। ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর পপুলেশন সায়েন্সেস (IIPS) ও ICF এর ২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী, দিল্লির ৯৯ শতাংশ পরিবার পরিচ্ছন্ন রান্নার জ্বালানি ব্যবহার করে। ফলে পরিবেশগত বৈষম্যের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হয় দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে।
পরিবেশগত সংস্কারের জন্য নীতিগত কাঠামো
নয়াদিল্লির ক্ষেত্রে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বারবার পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলোকে ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানো বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। তবে দুর্বল প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং কৃষকদের প্রতিরোধের কারণে এসব নির্দেশ কার্যকর করা কঠিন হয়েছে।
এই সংকট সমাধানে শুধু আইনি নিষেধাজ্ঞার ওপর নির্ভর না করে অর্থনৈতিক প্রণোদনা দিতে হবে। সরকারকে পরিচ্ছন্ন কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য সরাসরি ভর্তুকি দিতে হবে। পাশাপাশি ফসল বৈচিত্র্যকরণে সহায়তা দিলে কৃষকরা এমন ফসলে যেতে পারবেন, যেগুলোতে কৃষিজ অবশিষ্টাংশ কম তৈরি হয় এবং পোড়ানোর প্রয়োজনও কমে।
যানবাহনজনিত দূষণ কমাতে নয়াদিল্লিতে নির্গমনভিত্তিক যানবাহন কর চালু করা যেতে পারে। কম দূষণকারী গাড়ির জন্য কর ছাড় এবং বেশি দূষণকারী যানবাহনের জন্য অতিরিক্ত কর আরোপ করা যেতে পারে। এছাড়া নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্গমন ফি আরোপ করা যেতে পারে, যাতে তারা সৃষ্ট দূষণের অর্থনৈতিক দায় বহন করে। এসব পদক্ষেপ নয়াদিল্লির নির্মল বায়ু লক্ষ্য অর্জনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
ঢাকার ক্ষেত্রে প্রয়োজন ইটভাটার সার্বক্ষণিক নজরদারি এবং পুরোনো দূষণকারী বাস ও তিন চাকার যানবাহন ধীরে ধীরে বন্ধ করা। পরিবেশ অধিদপ্তরকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে, যাতে তারা কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে পারে এবং খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানো বন্ধ করতে পারে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশকে ব্রাজিলের বেলেমে অনুষ্ঠিত COP30 আলোচনায় জলবায়ু অভিযোজন অর্থায়ন বৃদ্ধির যে প্রতিশ্রুতি এসেছে, তা বাস্তব ও নির্ভরযোগ্য অর্থায়ন ব্যবস্থায় রূপান্তর করতে হবে। এই অর্থ জনস্বাস্থ্য অবকাঠামো ও নগর স্থিতিস্থাপকতা বৃদ্ধিতে ব্যবহার করা যেতে পারে, যা বায়ুদূষণের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় সহায়ক হবে।
উপসংহার
নয়াদিল্লি ও ঢাকা উভয় শহরই বায়ুদূষণ মোকাবিলায় জরুরি নিষেধাজ্ঞা ও সীমিত আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এসব উদ্যোগের কিছু প্রভাব থাকলেও বড় পরিসরে সমস্যার সমাধান এখনো সম্ভব হয়নি। এর মূল কারণ হলো গভীর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা।
নয়াদিল্লির ক্ষেত্রে পার্শ্ববর্তী রাজ্যের কৃষিজ দূষণ নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। অন্যদিকে ঢাকার অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং স্থানীয় শিল্পের প্রভাবের কারণে।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ বাতাস নিশ্চিত করতে দুই দেশের সরকারকেই পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ ও ভর্তুকির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশবান্ধব নীতি একসঙ্গে কার্যকর করতে পারলেই টেকসই সমাধান সম্ভব। দূষণের উৎস পরিবর্তন করে সহজলভ্য ও পরিচ্ছন্ন বিকল্প তৈরি করার মাধ্যমেই ভারত ও বাংলাদেশ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নির্মল বাতাসের অধিকার নিশ্চিত করতে পারবে।
তথ্যসূত্র
- Haque, N. (2024). Access to Green Finance Improves Compliance with Environmental Regulations in Bangladesh. [online] BU Global Development Policy Centre. Available at: https://www.bu.edu/gdp/2024/07/01/access-to-green-finance-improves-compliance-with-environmental-regulations-in-bangladesh/ [Accessed 31 July 2026].
- Hassan, M. and Mehedi Hasan, M. (2023). Analysis of household energy consumption and energy consumption cost (Biofuel) in rural areas of Dhaka division, Bangladesh. International Journal of Energy and Environmental Science, 8(3). doi: 10.11648/j.ijees.20230803.11.
- International Institute for Population Sciences (IIPS) and ICF (2021). The People’s Archive of Rural India. [online] People’s Archive of Rural India. Available at: https://ruralindiaonline.org/or/library/resource/national-family-health-survey-nfhs-5-2019-21-national-capital-territory-nct-of-delhi/ [Accessed 31 July 2026].
- Matheson, T. (n.d.). Taxing Pollution Urban-Brookings Tax Policy Center. [online] Available at: https://documents1.worldbank.org/curated/en/691261636143890139/pdf/Taxing-Pollution.pdf [Accessed 31 July 2026].
- Patel, S. (2023). India’s Top Court Tells States to Stop Crop Burning as New Delhi’s Air Turns Hazardous. Reuters. [online] 7 Nov. Available at: https://www.reuters.com/world/india/indias-top-court-tells-states-stop-crop-burning-new-delhis-air-turns-hazardous-2023-11-07/ [Accessed 31 July 2026].
- Taukir (2025). Care24. [online] Care24. Available at: https://care24.co.in/blog/understanding-delhis-pollution-crisis-causes-and-consequences/ [Accessed 31 July 2026].
