হাসান হামিদ
সি ইউ ই টি
বাংলাদেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন মোবাইল অপারেটর টেলিটক বিক্রির কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই, ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এমন ঘোষণা দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে টেলিটককে বাজার প্রতিযোগিতা রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। মন্ত্রী সতর্ক করে বলেছেন, টেলিটক না থাকলে বেসরকারি মোবাইল অপারেটরগুলো ইচ্ছামতো সেবার মূল্য বাড়াতে পারে। ভোক্তার স্বার্থ রক্ষায় টেলিটকের সরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকা প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।
তাত্ত্বিকভাবে এই যুক্তির ভিত্তি রয়েছে। তবে বাস্তবে তা গভীরভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে। কারণ যে প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠান কার্যকরভাবে প্রতিযোগিতাই করতে পারে না, তার উপস্থিতি বাজারে প্রতিযোগিতামূলক ভারসাম্য তৈরিতে কতটা ভূমিকা রাখতে পারে, সেটিই মূল প্রশ্ন।
প্রতিযোগিতা
টেলিটক গ্রামীণফোন, রবি এবং বাংলালিংকের মতো বড় অপারেটরের ওপর বাজার নিয়ন্ত্রণকারী চাপ তৈরি করে, এই ধারণা নির্ভর করে একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুমানের ওপর, আর তা হলো টেলিটক একটি কার্যকর প্রতিযোগিতামূলক শক্তি। বাস্তব চিত্র অবশ্য ভিন্ন।
বাংলাদেশের মোবাইল গ্রাহক বাজারে টেলিটকের অংশ খুবই সীমিত। এর নেটওয়ার্ক বিস্তৃতি তুলনামূলকভাবে কম, ব্র্যান্ড ইমেজ দুর্বল এবং অবকাঠামো সম্প্রসারণে বিনিয়োগ সক্ষমতা দীর্ঘদিন ধরেই সরকারি বাজেট প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতার কারণে বাধাগ্রস্ত। বেসরকারি অপারেটরগুলো যেখানে দ্রুত বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নিয়ে বিনিয়োগ করতে পারে, টেলিটক সেখানে সরকারি অনুমোদন ও বাজেট বরাদ্দের ওপর নির্ভরশীল।
যে প্রতিষ্ঠান কাভারেজ, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন কিংবা বিপণন সক্ষমতায় প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে না, সে বাস্তবে বাজারে প্রতিযোগিতার ভারসাম্য তৈরি করতে পারে না। বরং কেবল বিদ্যমান থাকে, স্পেকট্রাম ও বাজারের একটি অংশ ধরে রাখে, কিন্তু সেবার মূল্য কমানো বা মান উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় কোনো চাপ সৃষ্টি করতে পারে না।
মন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন, টেলিটকের আরও টাওয়ার প্রয়োজন এবং এর জন্য সরকারি ও বিদেশি অর্থায়নের চেষ্টা চলছে। এই স্বীকারোক্তিই মূল কাঠামোগত সমস্যাটি তুলে ধরে। একটি টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান যদি সরকারি বাজেট এবং অনিশ্চিত বৈদেশিক অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে দ্রুত পরিবর্তনশীল টেলিযোগাযোগ বাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা তার জন্য কঠিন।
বেসরকারি অপারেটরগুলো যেখানে নিজেদের আয় এবং বাণিজ্যিক ঋণের মাধ্যমে বিনিয়োগ করে, টেলিটক সেখানে অপেক্ষা করে সরকারি আর্থিক অনুমোদনের জন্য। বাজারে প্রতিযোগিতামূলক ভারসাম্য তৈরির জন্য শুধু টেলিটকের অস্তিত্ব যথেষ্ট নয়, বরং বেসরকারি অপারেটরদের বিনিয়োগ সক্ষমতার সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো শক্তিও প্রয়োজন। সেই সক্ষমতা না থাকলে মূল্য নিয়ন্ত্রণের যুক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
সেবার মান
টেলিটকের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং সেবার মান উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে মন্ত্রীর বক্তব্য সমস্যার গভীরতাকে কিছুটা খাটো করে দেখায়। ভোক্তারা শুধুমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বলে দীর্ঘদিন নিম্নমানের সেবা গ্রহণ করবেন, এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।
গ্রাহকরা স্বাভাবিকভাবেই সেই অপারেটরের দিকে ঝুঁকবেন, যারা উন্নত কাভারেজ, দ্রুতগতির ইন্টারনেট এবং নির্ভরযোগ্য সংযোগ দিতে পারে। টেলিটকের বিদ্যমান গ্রাহকসংখ্যা অনেকাংশে মূল্য সংবেদনশীল গ্রাহক এবং এমন এলাকার মানুষের কারণে টিকে থাকতে পারে, যেখানে বিকল্প সীমিত, সন্তুষ্টির কারণে নয়।
এখানে একটি চক্রাকার সমস্যা তৈরি হয়েছে। নিম্নমানের সেবা গ্রাহক কমায়, ফলে আয় কমে যায়। আয় কমে গেলে বিনিয়োগের সক্ষমতা হ্রাস পায়, আর তার ফল হিসেবে সেবার মান আরও খারাপ হয়। সরকারি মালিকানা এই চক্র ভাঙতে পারেনি, বরং ক্ষতির বোঝা শেষ পর্যন্ত সরকারি ব্যবস্থার ওপরই চাপিয়ে দিয়েছে।
মূল্য নির্ধারণ
টেলিটক না থাকলে বেসরকারি অপারেটরগুলো ইচ্ছামতো দাম বাড়াতে পারে, মন্ত্রীর এই আশঙ্কার একটি অর্থনৈতিক ভিত্তি রয়েছে। কোনো কেন্দ্রীভূত বাজারে দুর্বল প্রতিযোগীও সরিয়ে দিলে অবশিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মূল্য সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে বাংলাদেশের মোবাইল গ্রাহকদের জন্য আরও তাৎক্ষণিক ও বাস্তব সমস্যা হলো, সাত বা ১৫ দিনের ইন্টারনেট প্যাকেজের মেয়াদ শেষ হলে অব্যবহৃত ডেটা হারিয়ে যাওয়া। এই বিষয়ে জনমনে অসন্তোষের কথা মন্ত্রী নিজেও স্বীকার করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সঙ্গে অপারেটরদের আলোচনা হলেও তেমন অগ্রগতি হয়নি। কোম্পানিগুলো তাদের ব্যবসায়িক নীতির যুক্তি দেখিয়ে এই অবস্থান বজায় রেখেছে।
যদি নিয়ন্ত্রক সংস্থা ডেটা মেয়াদ শেষ হওয়ার মতো মৌলিক ভোক্তা অধিকার সম্পর্কিত বিষয়েও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে না পারে, তাহলে শুধু টেলিটকের উপস্থিতি মূল্য নিয়ন্ত্রণ করবে, এই দাবি দুর্বল হয়ে পড়ে। কার্যকর ভোক্তা সুরক্ষার জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক ক্ষমতা, দুর্বল বাজার প্রতিযোগী নয়।
একইভাবে, কল ড্রপের মতো সেবার মানসংক্রান্ত সমস্যায় মন্ত্রীর বক্তব্য মূলত অব্যাহত চাপ তৈরির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু প্রয়োজন চাপ নয়, কার্যকর মানদণ্ড এবং তা বাস্তবায়নের ক্ষমতা। বাংলাদেশের গ্রাহকদের এমন একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক সংস্থা দরকার, যা ন্যূনতম সেবার মান নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন করতে পারে।
টেলিটকের ভবিষ্যৎ: বাজার প্রতিযোগিতা নাকি কৌশলগত ভূমিকা?
সরকার টেলিটক ধরে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এই সিদ্ধান্তকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভুল বলা যায় না। একটি রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যেমন, বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক নয় এমন এলাকায় যোগাযোগ সেবা নিশ্চিত করা, কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে যোগাযোগ অবকাঠামোর নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হিসেবে কাজ করা।
তবে টেলিটককে এমন একটি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা দেওয়া, যা মূল্য ও সেবার মানের ক্ষেত্রে বাজারে ভারসাম্য রক্ষা করবে, যখন প্রতিষ্ঠানটি সেই প্রতিযোগিতার সক্ষমতাই অর্জন করতে পারেনি, তখন তা বাস্তব পরিস্থিতির ভুল ব্যাখ্যা তৈরি করে।
মূল চ্যালেঞ্জ হলো বিটিআরসির নিয়ন্ত্রক সক্ষমতা বাড়ানো, ডেটা মেয়াদ শেষ হওয়ার মতো ভোক্তা সমস্যা সমাধান করা, কল মানের নির্ধারিত মানদণ্ড কার্যকর করা এবং টেলিটককে হয় প্রকৃত প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতায় উন্নীত করা, অথবা স্বীকার করা যে এর প্রকৃত মূল্য বাজার নিয়ন্ত্রণে নয়, বরং অন্য কোনো কৌশলগত ভূমিকায়।
