আরিফ রেশাদ
ইউনিভার্সিটি অব এসেক্স, যুক্তরাজ্য
পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশগুলোর কাতারে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক প্রবেশ ঘটে ২০২৬ সালের এপ্রিলে, যখন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি লোডিং শুরু হয়। বাংলাদেশের জন্য ঘটনাটি নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। এর মধ্য দিয়ে পারমাণবিক শক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৩তম দেশে পরিণত হয়।
তবে এই সাফল্য দেশের পারমাণবিক গবেষণার দুর্বল ভিত্তিটিও স্পষ্ট করে তুলেছে। বাংলাদেশ যে পরিসরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তুলছে, তার তুলনায় পারমাণবিক গবেষণার অবকাঠামো ও দক্ষতা এখনও অনেক পিছিয়ে। এই ব্যবধান দূর করার উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশে পারমাণবিক গবেষণার বর্তমান চিত্র
১৯৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন দেশের পারমাণবিক গবেষণা অবকাঠামোর প্রধান প্রতিষ্ঠান। ভৌত বিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান ও প্রকৌশল, এই তিনটি প্রধান ক্ষেত্রে কমিশনের গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা অবকাঠামো হলো সাভারে অবস্থিত ৩ মেগাওয়াট ক্ষমতার ট্রিগা মার্ক-২ গবেষণা চুল্লি। ১৯৮৬ সাল থেকে চালু থাকা এই চুল্লি নিউট্রন সক্রিয়করণ বিশ্লেষণ, রেডিওগ্রাফি, বিচ্ছুরণ পরীক্ষা এবং তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ উৎপাদনের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০২৪ সালে কোরিয়া অ্যাটমিক এনার্জি রিসার্চ ইনস্টিটিউট চুল্লিটির আধুনিকায়ন করে এবং এর কার্যকাল বাড়ায়। তবে একটি পুরোনো গবেষণা চুল্লি দিয়ে বাণিজ্যিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনাকারী একটি দেশের প্রয়োজনীয় বিস্তৃত গবেষণা চাহিদা পূরণ করা কঠিন।
গবেষণা চুল্লির বাইরে কমিশনের অধীনে ঢাকায় রয়েছে ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালাইড সায়েন্সেস। দেশের বিভিন্ন আঞ্চলিক কেন্দ্রেও তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ ব্যবহার করে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
সাভারের ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিশ্লেষণধর্মী সেবা ও বিকিরণভিত্তিক বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে। এর মধ্যে খাদ্যপণ্যে বিকিরণ প্রয়োগ ও জীবাণুমুক্তকরণও রয়েছে। ময়মনসিংহের বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার এগ্রিকালচার কৃষি উৎপাদন ও ফসলের উন্নয়নে বিকিরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে।
এসব প্রতিষ্ঠানের প্রত্যেকটির নিজস্ব সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু বড় সমস্যা হলো, তারা অনেকাংশে বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গেও তাদের সমন্বয় সীমিত। কমিশন, বিশ্ববিদ্যালয়, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও শিল্পখাতের মধ্যে অভিন্ন যোগাযোগব্যবস্থা, সমন্বিত জাতীয় গবেষণা পরিকল্পনা কিংবা জ্ঞান ব্যবস্থাপনার কার্যকর কাঠামো এখনও গড়ে ওঠেনি।
শিক্ষা ও গবেষণার ধারাও খুব শক্তিশালী নয়। মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি দেশের হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের একটি, যেখানে পারমাণবিক বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিষয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞানের পাঠ্যক্রমে পারমাণবিক বিজ্ঞানের কিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকলেও পারমাণবিক পদার্থবিজ্ঞান, পারমাণবিক প্রকৌশল কিংবা বিকিরণ বিজ্ঞানে পিএইচডি পর্যায়ের গবেষণা এখনও সীমিত।
সমস্যা শুধু উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম হওয়া নয়। অভিজ্ঞ শিক্ষক, আধুনিক গবেষণাগার এবং পর্যাপ্ত গবেষণা অর্থায়নের ঘাটতিও বড় বাধা। ২,৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর পথে থাকা একটি দেশ যদি প্রয়োজনীয় সংখ্যক দক্ষ বিশেষজ্ঞ তৈরি করতে না পারে, তাহলে পারমাণবিক বিদ্যুৎ খাত পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নের সক্ষমতা নিয়েই প্রশ্ন থেকে যায়।
সরকারকে যে পদক্ষেপগুলো এখনই নিতে হবে
আগামী দিনের পথচলার শুরু হওয়া উচিত একটি জাতীয় পারমাণবিক গবেষণা কৌশল প্রণয়নের মাধ্যমে। রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিচালনাগত প্রয়োজন, পারমাণবিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার চাহিদা এবং চিকিৎসা, কৃষি ও শিল্পখাতে তেজস্ক্রিয় আইসোটোপের ক্রমবর্ধমান প্রয়োজন, সবকিছুর সঙ্গে গবেষণার অগ্রাধিকারকে সরাসরি যুক্ত করতে হবে।
কোন গবেষণাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, সেই বিষয়ে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত ছাড়া কোনো কৌশলই কার্যকর হবে না। বাংলাদেশের নিজস্ব বাস্তবতা থেকে যেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি, জাতীয় গবেষণা পরিকল্পনায় সেগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। যেমন, নিউট্রন বিকিরণের প্রভাবে বাংলাদেশের স্থানীয় নির্মাণসামগ্রীর আচরণ কেমন, দেশের নদীগুলোর পলি ও মাটির তেজস্ক্রিয় বৈশিষ্ট্য কী, কিংবা দীর্ঘমেয়াদে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় জনগোষ্ঠীর কমমাত্রার বিকিরণের সংস্পর্শে থাকার ফলে কী ধরনের স্বাস্থ্যগত প্রভাব তৈরি হতে পারে।
এর পরের ধাপে বাংলাদেশকে দ্বিতীয় একটি গবেষণা চুল্লি নির্মাণের পরিকল্পনা নিতে হবে। বর্তমান চুল্লির তুলনায় বেশি নিউট্রন প্রবাহ ক্ষমতাসম্পন্ন নতুন গবেষণা চুল্লি থাকলে শুধু আইসোটোপ উৎপাদন নয়, উপকরণ পরীক্ষা, পারমাণবিক জ্বালানির মান যাচাই এবং উন্নত নিউট্রন রশ্মি গবেষণার মতো কাজও করা সম্ভব হবে।
একটি মাত্র ৩ মেগাওয়াটের গবেষণা চুল্লির ওপর চিকিৎসা খাতের আইসোটোপের চাহিদা, শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ এবং কয়েক দশক ধরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপদ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ গবেষণার দায়িত্ব একসঙ্গে চাপিয়ে দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে গবেষণার যোগসূত্র শক্তিশালী করতে হবে
শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে পারমাণবিক গবেষণার গভীর সংযোগ ছাড়া এই উদ্যোগ সফল হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণাকে বিচ্ছিন্ন প্রকল্প হিসেবে না দেখে জাতীয় পারমাণবিক সক্ষমতা গড়ে তোলার স্থায়ী কাঠামোর অংশ করতে হবে।
অন্তত পাঁচটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পারমাণবিক বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিষয়ে পৃথক বিভাগ প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে এসব বিভাগের শিক্ষকদের বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার সুযোগ তৈরি করা দরকার। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে জ্ঞান ও দক্ষতার নিয়মিত আদানপ্রদান সম্ভব হবে।
পাঠ্যক্রম তৈরির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মানদণ্ড অনুসরণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি বাংলাদেশের নিজস্ব সমস্যা, তথ্য ও গবেষণার প্রয়োজনকেও পাঠ্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ করতে হবে।
জননিরাপত্তায় জাতীয় বিকিরণ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা প্রয়োজন
জননিরাপত্তার দিক থেকেও বাংলাদেশকে বড় ধরনের প্রস্তুতি নিতে হবে। দেশের প্রতিটি বিভাগকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি জাতীয় বিকিরণ পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন। এই ব্যবস্থায় তাৎক্ষণিক তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের জন্য আধুনিক তথ্য অবকাঠামো এবং একটি কেন্দ্রীয় তেজস্ক্রিয় জরুরি পরিস্থিতি ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র থাকা জরুরি।
বর্তমানে পরিবেশে তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা পর্যাপ্তভাবে পর্যবেক্ষণ কিংবা তেজস্ক্রিয়তাজনিত দুর্ঘটনার কার্যকর মোকাবিলার জন্য বাংলাদেশের সক্ষমতা সীমিত। ঘনবসতিপূর্ণ বদ্বীপ অঞ্চলে একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার ক্ষেত্রে এই ঘাটতি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
একই সঙ্গে স্বাধীন একটি তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ গঠন করা প্রয়োজন। পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবহারের পর অবশিষ্ট বর্জ্য, নিম্নমাত্রার তেজস্ক্রিয় বর্জ্য এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভবিষ্যৎ অবসানকালীন বর্জ্য, পুরো জীবনচক্রের ব্যবস্থাপনা এই কর্তৃপক্ষের নজরদারিতে থাকা উচিত।
তেজস্ক্রিয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত কোনো দায়িত্ব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। পারমাণবিক কর্মসূচির শুরু থেকেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য পৃথক ও শক্তিশালী কাঠামো প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক গবেষণায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে
সবশেষে রূপপুর প্রকল্পকে ঘিরে গড়ে ওঠা দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার বাইরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক গবেষণা অংশীদারত্ব আরও বিস্তৃত করা দরকার। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা, কোরিয়া ও জাপানের পারমাণবিক শক্তি সংস্থাগুলো এবং ইউরোপের বিভিন্ন পারমাণবিক গবেষণা জোটের সঙ্গে নিয়মিত ও কাঠামোবদ্ধ সহযোগিতা বাংলাদেশের গবেষকদের বহুজাতিক গবেষণা প্রকল্পে সরাসরি অংশ নেওয়ার সুযোগ দিতে পারে।
বাংলাদেশ যেন শুধু প্রযুক্তি গ্রহণকারী দেশ হয়ে না থাকে, বরং আন্তর্জাতিক পারমাণবিক গবেষণায় নিজস্ব জ্ঞান ও গবেষণার অবদান রাখতে পারে, সেই লক্ষ্য সামনে রাখতে হবে। পারমাণবিক জ্ঞান কোনো একটি দেশের একক সম্পদ নয়, বৈশ্বিক গবেষণা ও জ্ঞানভাণ্ডারের অংশ। সেই জ্ঞানভাণ্ডার থেকে সুবিধা নেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশকেও সেখানে নিজের অবদান রাখার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
রূপপুর বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ যুগের সূচনা করেছে। এখন প্রয়োজন সেই বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশে একটি শক্তিশালী জাতীয় গবেষণা ব্যবস্থা গড়ে তোলা। কারণ পারমাণবিক সক্ষমতা শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার বিষয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে গবেষণা, দক্ষ জনবল, নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ, জনস্বাস্থ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত সক্ষমতা। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পারমাণবিক নিরাপত্তা ও সক্ষমতা অনেকটাই নির্ভর করবে আমরা সেই গবেষণার ভিত্তি কত দ্রুত এবং কতটা শক্তভাবে গড়ে তুলতে পারি তার ওপর।
