ক্যারোলিন মেওয়েন্ডে
স্বতন্ত্র বিশ্লেষক
আঞ্চলিক বাণিজ্য করিডর অর্থনৈতিক সংহতি জোরদার, পরিবহন ব্যয় হ্রাস এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভারত, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার (আইবিএম) বাণিজ্য ট্রানজিট করিডর দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগপথ হিসেবে ব্যাপক কৌশলগত সম্ভাবনা ধারণ করে। পাশাপাশি ভারতের Act East Policy এবং BIMSTEC সহযোগিতার মতো আঞ্চলিক উদ্যোগকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও এই করিডরের গুরুত্ব অপরিসীম।
তবে বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এই করিডর এখনও নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি। জটিল সীমান্ত প্রক্রিয়া, অপর্যাপ্ত পরিবহন অবকাঠামো, বিচ্ছিন্ন কাস্টমস ব্যবস্থা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের ঘাটতি বাণিজ্য প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে। এই প্রেক্ষাপটে ট্রেডমার্ক ইস্ট আফ্রিকা (টিএমইএ) একটি কার্যকর দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতায় পার্থক্য থাকলেও টিএমইএ মডেলের বেশ কয়েকটি কার্যকর উপাদান ভারত, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার বাণিজ্য ট্রানজিট ব্যবস্থার উন্নয়নে অভিযোজিত করা সম্ভব।
ট্রেডমার্ক ইস্ট আফ্রিকা মডেল: একটি পরিচিতি
ট্রেডমার্ক আফ্রিকা, যা আগে ট্রেডমার্ক ইস্ট আফ্রিকা নামে পরিচিত ছিল, একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সহায়তা সংস্থা। সংস্থাটি সরকার, কাস্টমস কর্তৃপক্ষ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা সংস্থা, বেসরকারি খাত এবং আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সময় ও ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে।
সমন্বিত বাণিজ্য সুবিধাকরণ, সীমান্ত আধুনিকায়ন, ডিজিটাল কাস্টমস ব্যবস্থা এবং করিডর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পূর্ব আফ্রিকায় বিদ্যমান বহু সমস্যার সফল সমাধান করেছে এই সংস্থা। সীমান্ত অতিক্রমে সময় কমানো এবং পণ্য পরিবহনের দক্ষতা বৃদ্ধি করে টিএমইএ দেখিয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা ও লক্ষ্যভিত্তিক সংস্কার কীভাবে একটি আঞ্চলিক বাণিজ্য করিডরকে আমূল পরিবর্তন করতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ার জন্য টিএমইএ মডেলের প্রাসঙ্গিকতা
ভারত, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার করিডর বর্তমানে সেই ধরনের অনেক সমস্যার সম্মুখীন, যেগুলো একসময় পূর্ব আফ্রিকাতেও ছিল। অসম পরিবহন অবকাঠামো, অদক্ষ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, কাস্টমস ও ডিজিটাল সমন্বয়ের অভাব, নীতিগত ও নিয়ন্ত্রক বৈসাদৃশ্য, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত চ্যালেঞ্জ এবং বেসরকারি খাতের সীমিত অংশগ্রহণ এই করিডরের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। ট্রেডমার্ক ইস্ট আফ্রিকার অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রাণিত একটি আঞ্চলিক কাঠামো এই বাধাগুলো মোকাবিলায় অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।
ভারত, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার করিডরের ক্ষেত্রে কাস্টমস প্রক্রিয়া সহজীকরণ, নথিপত্রের মান একীভূত করা এবং ইলেকট্রনিক তথ্য বিনিময় ব্যবস্থা চালু করা হলে লেনদেন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি একটি নিবেদিত আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠান এসব সংস্কারের বাস্তবায়ন তদারকি, কর্মক্ষমতা মূল্যায়ন এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারে।
টিএমইএ মডেলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারত্ব। কারণ ট্রানজিট করিডরের প্রধান ব্যবহারকারী ব্যবসায়ী সমাজ, যারা বাস্তব পরিচালনাগত সমস্যাগুলো সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো ধারণা রাখে। তাই আঞ্চলিক কাঠামোর মধ্যে রপ্তানিকারক, আমদানিকারক, লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠান, বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং পরিবহন কোম্পানিগুলোর সঙ্গে নিয়মিত পরামর্শের ব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা উচিত। এর ফলে নীতিগত সংস্কার বাস্তব বাণিজ্যিক প্রয়োজনের সঙ্গে আরও বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
টিএমইএ মডেল থেকে গ্রহণযোগ্য প্রধান সংস্কার
সম্পূর্ণ ডিজিটাল কাস্টমস ব্যবস্থা চালু এবং ঝুঁকিভিত্তিক পণ্য পরিদর্শন সম্প্রসারণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের মধ্যে অন্যতম। এর মাধ্যমে পণ্য খালাসের সময় কমবে এবং স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে। দ্বিতীয় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত একটি কার্যকর ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো ব্যবস্থা গড়ে তোলা। বর্তমানে ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সঙ্গে পৃথকভাবে যোগাযোগ করতে হয়, যার ফলে একই তথ্য বারবার জমা দিতে হয় এবং অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব সৃষ্টি হয়। একটি সমন্বিত সিঙ্গেল উইন্ডো ব্যবস্থা প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে দক্ষতা বাড়াবে।
অবকাঠামো উন্নয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সড়ক, সেতু ও বন্দর উন্নয়নে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও সম্ভাব্য ট্রানজিট প্রবাহ মোকাবিলায় আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন। বিশেষ করে সড়ক, রেলপথ, অভ্যন্তরীণ নৌপথ এবং বন্দরকে সমন্বিত করে বহুমাত্রিক পরিবহন সংযোগ জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
নিয়ন্ত্রক কাঠামোর সমন্বয় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার। যানবাহনের অনুমতিপত্র, পণ্য ট্র্যাকিং ব্যবস্থা, ট্রানজিট গ্যারান্টি এবং পরিবহন নথিপত্রের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে অভিন্ন মানদণ্ড তৈরিতে কাজ করতে হবে। সমন্বিত নীতিমালার অভাবে বর্তমানে পরিবহন পরিচালনায় অনিশ্চয়তা ও অতিরিক্ত ব্যয় সৃষ্টি হচ্ছে। একটি অভিন্ন নিয়ন্ত্রক কাঠামো বাণিজ্যকে আরও পূর্বানুমানযোগ্য ও নির্বিঘ্ন করবে।
একই সঙ্গে স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত করাও অপরিহার্য। বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীরা এমন একটি পরিবেশ প্রত্যাশা করেন, যেখানে আইন ও বিধিমালা ধারাবাহিকভাবে এবং ন্যায্যভাবে প্রয়োগ করা হবে। দুর্নীতিবিরোধী ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, বিরোধ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া উন্নত করা এবং নিয়ন্ত্রক স্বচ্ছতা বৃদ্ধি ট্রানজিট ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা বহুগুণ বাড়িয়ে তুলবে।
টিএমইএ মডেল থেকে শিক্ষণীয় বিষয়
ভারত, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার বাণিজ্য ট্রানজিট ব্যবস্থা উন্নয়নে ট্রেডমার্ক ইস্ট আফ্রিকা মডেল গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করে। অবকাঠামো উন্নয়ন, বাণিজ্য সহজীকরণ, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং অংশীজনদের সম্পৃক্ততার সমন্বিত পদ্ধতি এই করিডরের বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলোর সঙ্গে অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সফল বাস্তবায়নের জন্য কাস্টমস আধুনিকায়ন, ডিজিটাল রূপান্তর, অবকাঠামো উন্নয়ন, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং নিয়ন্ত্রক সমন্বয়ে ব্যাপক সংস্কার প্রয়োজন। এই উদ্যোগগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে সমগ্র অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, ভারত, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার ট্রানজিট ব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত কৌশলগত। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে মিয়ানমারের একটি স্বাভাবিক সংযোগস্থল। পাশাপাশি দেশের সমুদ্রবন্দরগুলো আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা সৃষ্টি করে। ফলে এই করিডরভিত্তিক যেকোনো উদ্যোগের সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করবে বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত অঙ্গীকারের ওপর।
