ইফতেখার রহমান
ভার্ডান্ট গ্লোবাল
সংখ্যার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সুশাসনের ঝুঁকি
দুর্নীতি সব সময় ঘুষ, অবৈধ অর্থ লেনদেন বা সরকারি অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে দৃশ্যমান হয় না। অনেক সময় এটি আরও সূক্ষ্ম রূপে প্রকাশ পায়। যেমন, প্রকৃত আদায় ছাড়াই বারবার ঋণ পুনঃতফসিল করা, সংশ্লিষ্ট পক্ষের ঝুঁকিপূর্ণ লেনদেন যথাযথভাবে প্রকাশ না করা, সম্পদের মূল্যায়নকে যথেষ্টভাবে যাচাই না করা কিংবা নিরীক্ষকের পর্যবেক্ষণ দীর্ঘদিন অমীমাংসিত রাখা।এসব ক্ষেত্রে আর্থিক বিবরণী সম্পূর্ণ বলে মনে হলেও প্রকৃত অর্থনৈতিক বাস্তবতা আড়ালেই থেকে যায়।
বাংলাদেশে হিসাবরক্ষণ ও নিরীক্ষা মানদণ্ডের অভাব নেই। ২০১৫ সালের ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং অ্যাক্টের মাধ্যমে ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি) প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে এফআরসি ২০২০ সালে জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জন্য কোনো পরিবর্তন ছাড়াই আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মানদণ্ড (IFRS) এবং ২০২১ সালে আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা মানদণ্ড (ISA) গ্রহণ করে।¹ কিন্তু প্রকৃত চ্যালেঞ্জ মানদণ্ড প্রণয়নে নয়, বরং তার বাস্তব প্রয়োগে। প্রশ্ন হলো, প্রকাশিত আর্থিক তথ্য কতটা স্বচ্ছ, নিরীক্ষকরা কতটা পেশাগত সংশয় বজায় রাখছেন এবং চিহ্নিত দুর্বলতার বিরুদ্ধে সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না।
ব্যাংকিং খাতের চাপ বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটকে সামনে এনেছে
এই প্রশ্নগুলোর গুরুত্ব সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে ব্যাংকিং খাতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ।² যদিও ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের রেকর্ড উচ্চতার তুলনায় এই হার কিছুটা কমেছে, তবে এ হ্রাসের পেছনে বিশেষ নীতিগত সহায়তায় ব্যাপক ঋণ পুনঃতফসিলের ভূমিকা ছিল। ফলে এটিকে নগদ অর্থ আদায়ে সমপর্যায়ের উন্নতি বা সম্পদের প্রকৃত মানোন্নয়নের প্রতিফলন হিসেবে দেখা যায় না।
উদ্বেগের বিষয়টি এখনো বিদ্যমান। ২০২৬ সালের ১৩ মে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ফিচ রেটিংস জানায়, ২০২৫ সালের শেষে বাংলাদেশের মোট খেলাপি ঋণের হার ৩০ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছে। সংস্থাটি উল্লেখ করে যে অধিকাংশ খেলাপি ঋণ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে কেন্দ্রীভূত এবং নীতিগত ছাড় প্রত্যাহার করা হলে এ হার আরও বাড়তে পারে।³ এর আগে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছিল, বড় ধরনের ক্ষতির অভিযোগ থাকা কয়েকটি ব্যাংকের সম্পদমান যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক আর্নস্ট অ্যান্ড ইয়ং (EY), ডেলয়েট এবং কেপিএমজিকে নিয়োগ দেয়।⁴
স্বাধীন পর্যালোচনার পাশাপাশি বিশ্বাসযোগ্য মূলধন পুনর্গঠন, ঋণ পুনরুদ্ধার এবং প্রয়োজনীয় সমাধানমূলক কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নও জরুরি। ২০২৬ সালের ৮ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংক BRPD-1 সার্কুলার নং ০৬-এর মাধ্যমে IFRS 9 Financial Instruments বাস্তবায়নের নির্দেশিকা জারি করে। এর মাধ্যমে ধাপে ধাপে ভবিষ্যতমুখী Expected Credit Loss পদ্ধতিতে ঋণঝুঁকি মূল্যায়নের ব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়।⁵ তবে এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে তথ্যের মান, মডেলের স্বাধীন যাচাই, সুশাসন এবং স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশের ওপর।
করপোরেট স্বচ্ছতা শুধু আনুষ্ঠানিক অনুবর্তিতায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না
সংশ্লিষ্ট পক্ষের লেনদেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনিয়ম নয়। তবে পারিবারিক বা ঘনিষ্ঠ মালিকানাভিত্তিক ব্যবসা গোষ্ঠীতে এ ধরনের লেনদেন এবং জটিল করপোরেট কাঠামো অনেক সময় মুনাফা, দায় এবং ঝুঁকিকে এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর বা আড়াল করার সুযোগ তৈরি করে। ফলে ঋণদাতা, বিনিয়োগকারী এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর জন্য প্রকৃত আর্থিক অবস্থা মূল্যায়ন কঠিন হয়ে পড়ে। IAS 24 অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট পক্ষের সম্পর্ক, লেনদেন, বকেয়া দায় ও অঙ্গীকারসমূহ প্রকাশ করতে হয়, যদি সেগুলো আর্থিক বিবরণী ব্যাখ্যায় প্রভাব ফেলতে পারে।⁶ কিন্তু কেবল হিসাবের নোটে কিছু তথ্য সংযোজন যথেষ্ট নয়। ব্যবহারকারীরা যদি লেনদেনের প্রকৃত অর্থনৈতিক সম্পর্ক বুঝতে না পারেন, তাহলে স্বচ্ছতার উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়।
এ কারণে ট্রান্সফার প্রাইসিং তদারকি আরও জোরদার করা প্রয়োজন। ২০২৩ সালের আয়কর আইনের অধীনে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক লেনদেনের জন্য ইতোমধ্যে Arm’s Length Pricing কাঠামো বিদ্যমান।⁷ এখন প্রয়োজন কার্যকর বাস্তবায়ন। এর মধ্যে রয়েছে কর প্রশাসনের সক্ষমতা বৃদ্ধি, ঝুঁকিভিত্তিক পর্যালোচনা, নির্ভরযোগ্য তুলনামূলক তথ্যভাণ্ডার এবং কর ও শুল্ক কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয়। তবে সংস্কার এমন হতে হবে যাতে বৈধ ব্যবসা অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক জটিলতার মুখে না পড়ে। পরিচালনা পর্ষদ ও অডিট কমিটির উচিত সংশ্লিষ্ট পক্ষের পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র তৈরি, সুস্পষ্ট অনুমোদন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা এবং অস্বাভাবিক লেনদেনের স্বাধীন পর্যালোচনা করা। নিয়ন্ত্রকদেরও শুধু তথ্য প্রকাশ নয়, বরং লেনদেনের প্রকৃত অর্থনৈতিক বাস্তবতার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
নিরীক্ষকের স্বাধীনতা দৃশ্যমান হতে হবে
নিরীক্ষার মান অনেকাংশে নির্ভর করে পেশাগত সংশয়ের ওপর। কিন্তু বাণিজ্যিক নির্ভরতা, দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বা দুর্বল তদারকি নিরীক্ষকদের ব্যবস্থাপনার সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করার সক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। বাংলাদেশে এ বিষয়ে কিছু সুরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের একটি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, কোনো তালিকাভুক্ত কোম্পানি একই চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্সি ফার্মকে টানা তিন বছরের বেশি সময় আইনগত নিরীক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিতে পারে না। এছাড়া নিরীক্ষায় প্রযোজ্য ISA, মান নিয়ন্ত্রণ এবং নৈতিক মানদণ্ড অনুসরণের বাধ্যবাধকতাও রয়েছে।⁸ তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিয়মগুলোর ধারাবাহিক প্রয়োগ। এর মধ্যে রয়েছে স্বার্থসংঘাত সৃষ্টি করতে পারে এমন অডিটবহির্ভূত সেবার ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, অডিট ও নন অডিট ফি সম্পর্কে স্বচ্ছতা, অডিট কমিটির জবাবদিহি এবং এফআরসির পরিদর্শন ফলাফলের বেনামি প্রকাশ।
সাম্প্রতিক একটি ঘটনা এই আলোচনাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। ২০২৬ সালের মে মাসে দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জানায়, বৈশ্বিক পুনর্গঠন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কেপিএমজি বাংলাদেশের সহযোগী প্রতিষ্ঠান রহমান রহমান হক থেকে আলাদা হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। একই ধরনের পরিবর্তন মিসর ও পাকিস্তানেও ঘটছে।⁹ এই সিদ্ধান্তকে বাংলাদেশের নিরীক্ষা ব্যবস্থার কোনো নির্দিষ্ট ব্যর্থতার প্রমাণ হিসেবে দেখা উচিত নয়। তবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন সামনে আনে: আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কভুক্ত নিরীক্ষা সক্ষমতা বজায় রেখে কীভাবে দেশীয় নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা ও কারিগরি দক্ষতা আরও শক্তিশালী করা যায়?
সরকারি খাতের নিরীক্ষা শুধু প্রতিবেদনে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না
সরকারি খাতেও একই ধরনের জবাবদিহি প্রয়োজন। বাংলাদেশের মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (CAG) একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান।¹⁰ তবে বাংলাদেশের Public Expenditure and Financial Accountability (PEFA) মূল্যায়নে দেখা গেছে, নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুসরণ, সংসদীয় পর্যালোচনা এবং নিরীক্ষা ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশের ক্ষেত্রে এখনও দুর্বলতা রয়েছে।¹¹ এক্ষেত্রে একটি বাস্তবসম্মত সংস্কার কর্মসূচির মধ্যে থাকা উচিত নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ব্যবস্থাপনার জবাবদিহি, অমীমাংসিত নিরীক্ষা পর্যবেক্ষণের ডিজিটাল ট্র্যাকিং, সংসদীয় তদারকি জোরদার করা এবং প্রতারণা, ইচ্ছাকৃত অনিয়ম বা ক্রয়সংক্রান্ত দুর্নীতির অভিযোগে সুস্পষ্ট রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
আর্থিক বিশ্বাসযোগ্যতা একটি অর্থনৈতিক সম্পদ
নিরীক্ষা সংস্কার কেবল পেশাগত কোনো বিষয় নয়। এটি মূলধনের ব্যয়, আমানতকারীর আস্থা, কর পরিপালন, সরকারি ক্রয়ের স্বচ্ছতা এবং বিনিয়োগকারীদের তথ্যের ওপর নির্ভরশীলতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বড় অংশ গড়ে তুলেছে। এখন প্রয়োজন বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া। এর মধ্যে রয়েছে সময়মতো তথ্য প্রকাশ, বিশ্বাসযোগ্য পরিদর্শন, দ্রুত সংশোধনমূলক ব্যবস্থা এবং দৃশ্যমান জবাবদিহি। যখন আর্থিক বিবরণী বিশ্বাসযোগ্য হয়, তখন মূলধন আরও দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহৃত হয় এবং অনিয়ম গোপন রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
কিন্তু যখন আর্থিক তথ্যের ওপর আস্থা থাকে না, তখন ক্ষতি শুধু বিনিয়োগকারী বা ঋণদাতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। অবিশ্বস্ত সংখ্যা প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে, ঝুঁকির সঠিক মূল্যায়নকে বিকৃত করে এবং শেষ পর্যন্ত দুর্বল সুশাসনের বোঝা করদাতা, আমানতকারী ও দায়িত্বশীল ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঁধে চাপিয়ে দেয়।
তথ্যসূত্র: (মূল লেখায় উল্লিখিত সূত্রসমূহ)
¹ Financial Reporting Council Bangladesh, ‘Jurisdiction, Implementation of IFRS and Challenges in Bangladesh’, presentation to the IFRS Emerging Economies Group, November 2025, p. 8, accessed 2 June 2026.
² Md Mehedi Hasan, ‘Bad Loans Fall by Tk 87,298cr in Three Months’, The Daily Star, 3 March 2026, accessed 2 June 2026.
³ Fitch Ratings, ‘Fitch Revises Outlook on Bangladesh to Negative; Affirms at “B+”’, 13 May 2026, accessed 2 June 2026.
⁴ John Reed and Redwan Ahmed, ‘Bangladesh Hires Big Four Audit Firms to Review “Robbed” Banks’, Financial Times, 26 January 2025, accessed 2 June 2026.
⁵ Bangladesh Bank, Banking Regulation and Policy Department-1, Guidance for Banks in Implementing IFRS 9 Financial Instruments, BRPD-1 Circular No. 06, 8 March 2026, accessed 2 June 2026. See also Bangladesh Sangbad Sangstha, ‘BB Issues Implementation Guidance for IFRS 9 Financial Instruments’, 8 March 2026, accessed 2 June 2026.
⁶ IFRS Foundation, ‘IAS 24 Related Party Disclosures’, issued standard summary, accessed 2 June 2026.
⁷ National Board of Revenue, Government of Bangladesh, Income Tax Act 2023, Part 15, Chapter II, sections 233-239, authentic English text published pursuant to S.R.O. No. 404-Law/2025, accessed 2 June 2026.
⁸ Bangladesh Securities and Exchange Commission, Notification on Financial Reporting and Disclosure, Notification No. BSEC/CMRRCD/2006-158/208/Admin/81, dated 20 June 2018, published in the Bangladesh Gazette, Extraordinary Issue, 8 August 2018, conditions 2(2), 2(4) and 2(5), pp. 1-2, accessed 2 June 2026.
⁹ Doulot Akter Mala, ‘Big Four Accounting Firm KPMG Set to Exit Bangladesh’, The Financial Express, 24 May 2026, accessed 2 June 2026.
¹⁰ Office of the Comptroller and Auditor-General of Bangladesh, ‘Constitutional Mandate’, Articles 127-132 of the Constitution of the People’s Republic of Bangladesh, accessed 2 June 2026.
¹¹ PEFA Secretariat and World Bank, Bangladesh Public Expenditure and Financial Accountability Assessment 2021, April 2023, pp. 120 and 164-166, accessed 2 June 2026.
