ডেস্ক রিপোর্ট
অনিকেত ডেস্ক রিপোর্ট
বাংলাদেশে দান ও মানবিক সহায়তার একটি দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ঐতিহ্য রয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে অনেকেই একটি মহৎ দায়িত্ব বলে মনে করেন। ধর্মীয় মূল্যবোধ, সামাজিক দায়বদ্ধতা কিংবা দুর্ভিক্ষ ও অভাবের সময়ের স্মৃতি থেকে উৎসাহিত হয়ে মানুষ যুগের পর যুগ দানশীলতার চর্চা করে আসছে। তবে দাতব্য কার্যক্রমের পরিধি যত বিস্তৃত হচ্ছে, ততই একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং কিছুটা অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে আসছে। বাংলাদেশের দানভিত্তিক সহায়তা ব্যবস্থা কি অনিচ্ছাকৃতভাবে দারিদ্র্য দূরীকরণের প্রচেষ্টাকেই দুর্বল করে দিচ্ছে?
সমস্যা দান নয়, বরং দান প্রদানের পদ্ধতিতে। যখন সহায়তা নিঃশর্ত, দীর্ঘমেয়াদি এবং কোনো ধরনের প্রচেষ্টা বা অগ্রগতির প্রত্যাশার সঙ্গে যুক্ত থাকে না, তখন তা ধীরে ধীরে দারিদ্র্য সম্পর্কে মানুষের ধারণাকে পরিবর্তন করতে পারে। দারিদ্র্যকে এমন একটি সাময়িক অবস্থা হিসেবে দেখার পরিবর্তে, যা থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব, সেটিকে জীবনের স্থায়ী বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণ করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। ঢাকার নিম্নআয়ের এলাকাগুলো থেকে শুরু করে বরিশাল ও ময়মনসিংহের গ্রামীণ জনপদ পর্যন্ত বিভিন্ন অঞ্চলে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কিছু ক্ষেত্রে এই সহায়তা এমন পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে, যাকে অর্থনীতিবিদেরা “ওয়েলফেয়ার ডিপেনডেন্সি” বা সহায়তানির্ভরতা বলে অভিহিত করেন। অর্থাৎ, কিছু পরিবার আয় উপার্জনের জন্য কাজ করার পরিবর্তে ভবিষ্যতে সহায়তা পাওয়ার প্রত্যাশায় কর্মপ্রচেষ্টা কমিয়ে দেয়।
এই বিষয়টির একটি গুরুত্বপূর্ণ মানসিক দিকও রয়েছে। যখন কোনো সমাজে মানুষ মনে করতে শুরু করে যে অর্থনৈতিক সহায়তা ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা বা অর্জনের ওপর নির্ভরশীল নয়, তখন ধীরে ধীরে এমন একটি ধারণা তৈরি হয় যে উন্নতি আসে অন্যের দয়া বা উদারতা থেকে, নিজের শ্রম ও উদ্যোগ থেকে নয়। এর ফলে সম্মানের সঙ্গে জীবিকা অর্জনের ধারণা, আত্মনির্ভরতার মাধ্যমে অর্জিত তৃপ্তি এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
যেসব এলাকায় এনজিও কার্যক্রম বেশি, বিশেষ করে বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ে নিয়মিত ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে, সেখানে দেখা গেছে যে নিয়মিত খাদ্য ও নগদ সহায়তা অনেক সময় স্থানীয় শ্রমবাজারেও প্রভাব ফেলে। কৃষক ও নির্মাণখাতের উদ্যোক্তারা ব্যস্ত মৌসুমে কিংবা তার পরপরই স্বল্পমেয়াদি কাজের জন্য শ্রমিক খুঁজতে সমস্যায় পড়েন। কারণ, যখন কোনো পরিশ্রম ছাড়াই অর্থ বা খাদ্য সহায়তা পাওয়া যায়, তখন শ্রমের মাধ্যমে আয় অর্জনের প্রণোদনা সাময়িকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। সময়ের সঙ্গে এই প্রবণতা আরও গভীর হয় এবং স্থানীয় শ্রমবাজারে দীর্ঘস্থায়ী বিকৃতি সৃষ্টি করতে পারে।
এর অর্থ এই নয় যে দাতব্য কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া উচিত বা দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো থেকে সরে আসতে হবে। বরং প্রয়োজন বিদ্যমান ব্যবস্থাকে নতুনভাবে ভাবা এবং কিছু মৌলিক নীতির ভিত্তিতে সংস্কার করা।
প্রথমত, যেখানে উপকারভোগীরা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে সক্ষম, সেখানে পুনরাবৃত্ত নিঃশর্ত সহায়তার পরিবর্তে শর্তসাপেক্ষ এবং ধাপে ধাপে কমে আসা সহায়তা ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। এমন সহায়তা, যা মানুষের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের দিকে এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করে, দীর্ঘমেয়াদে তাদের জীবনমান উন্নত করতে পারে। সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোকেও সে অনুযায়ী দ্রুত পুনর্গঠন করা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, দাতব্য সংস্থাগুলোর জন্য উপকারভোগীদের কর্মসংস্থান ও আয়সংক্রান্ত তথ্য তিন থেকে পাঁচ বছর ধরে সংরক্ষণ ও প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা উচিত। এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর তত্ত্বাবধানে একটি স্বচ্ছতা কাঠামো গড়ে তোলা হলে দাতা এবং সাধারণ মানুষ বুঝতে পারবেন কোন কর্মসূচি মানুষকে আত্মনির্ভরশীল করে তুলছে এবং কোন কর্মসূচি দীর্ঘমেয়াদে নির্ভরশীলতা বাড়াচ্ছে।
তৃতীয়ত, যাকাত এবং করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিলের মাধ্যমে যে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়, তার বড় অংশ খাদ্য ও নগদ সহায়তার পরিবর্তে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরির প্রাথমিক অনুদান, কারিগরি দক্ষতার সনদ অর্জনে ভর্তুকি এবং সমবায়ভিত্তিক উদ্যোগ গড়ে তোলার কাজে ব্যবহার করা উচিত। কারও হাতে সরাসরি অর্থ তুলে দেওয়ার চেয়ে তাকে আয় করার সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া অনেক বেশি উদার ও টেকসই সহায়তা।
চতুর্থত, স্কুলের পাঠ্যক্রমে দক্ষতা ও শ্রমভিত্তিক কাজের মর্যাদাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে। যে সমাজে অফিসকেন্দ্রিক চাকরিকে অধিক সম্মানজনক এবং হাতে কলমে কাজকে তুলনামূলক কম মূল্যবান হিসেবে দেখা হয়, সেখানে অর্থনীতির বাস্তব চাহিদার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়তেই থাকবে। দাতব্য খাত যা-ই করুক না কেন, এই সাংস্কৃতিক বাস্তবতা পরিবর্তন না হলে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রকৃত দানশীলতার ধারণাকে তাৎক্ষণিক কষ্ট লাঘবের গণ্ডি পেরিয়ে মানুষের স্থায়ী সক্ষমতা গড়ে তোলার দিকে অগ্রসর হতে হবে। সমাজ তার সবচেয়ে অসচ্ছল মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় যে কাজটি করতে পারে, তা হলো এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে শ্রমের ন্যায্য মূল্য পাওয়া যায়, আয় নির্ভরযোগ্য হয় এবং কঠোর পরিশ্রম মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনার মতো যথেষ্ট ফল বয়ে আনে।
