আরিফ রেশাদ
ইউনিভার্সিটি অব এসেক্স
রাষ্ট্র যেখানে পৌঁছাতে পারে না, সেখানকার ঘাটতি পূরণ করাই ছিল বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মূল উদ্দেশ্য। গ্রামীণ ঋণ, কৃষি সম্প্রসারণ, মাতৃস্বাস্থ্য ও দুর্যোগ মোকাবিলার মতো ক্ষেত্রে জনগণের পাশে দাঁড়ানো ছিল তাদের প্রধান ভূমিকা। কিন্তু গত দুই দশকে বাংলাদেশে সেই লক্ষ্য বারবার ভিন্ন দিকে মোড় নিয়েছে। রাজনৈতিকভাবে অনুগত জনগোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়া এবং বিরোধী রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত জনগোষ্ঠীকে উপেক্ষা বা শাস্তি দেওয়ার প্রবণতা ক্রমেই দৃশ্যমান হয়েছে। ফলে দেশের বেসরকারি উন্নয়ন খাতের বিশ্বাসযোগ্যতা নিরপেক্ষ উন্নয়ন ফলাফলের চেয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রের নিয়ন্ত্রণে থাকা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
দুই দশকের রাজনৈতিক প্রভাবাধীন তদারকি
এই ব্যবস্থার কেন্দ্রে রয়েছে এনজিও বিষয়ক ব্যুরো। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন এই প্রতিষ্ঠান বিদেশি অনুদান গ্রহণকারী সংগঠনগুলোর নিবন্ধন, প্রকল্প অনুমোদন এবং বিদেশি অর্থায়নের সুযোগ নিয়ন্ত্রণ করে। বাংলাদেশের প্রায় সব বড় উন্নয়ন সংস্থাই বিদেশি দাতাদের অর্থের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে ব্যুরোর বিবেচনাধিকার রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের একটি নীরব কিন্তু শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
২০০০ ও ২০১০ এর দশকে এই বিবেচনাধিকার ক্রমেই কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে। ২০১২ সালে সরকার নিষ্ক্রিয়তা কিংবা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে কথিত সম্পৃক্ততার অভিযোগে প্রায় ছয় হাজার এনজিওর নিবন্ধন বাতিলের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানায়। পরবর্তী বছরগুলোতেও একই ধরনের অভিযানে আরও শত শত সংগঠনের নিবন্ধন বাতিল করা হয়। পরবর্তীতে আইনি পরিবর্তনও এই প্রবণতাকে আরও শক্তিশালী করে।
বিদেশি অনুদান নিয়ন্ত্রণে ২০১৬ সালে প্রণীত আইনে এমন প্রকল্প প্রত্যাখ্যান বা বাতিল করার ক্ষেত্রে ব্যুরোকে স্পষ্ট ক্ষমতা দেওয়া হয়, যেখানে সরকার, সংসদ বা সংবিধান সম্পর্কে এমন কোনো মন্তব্য রয়েছে বলে মনে করা হয়, যা রাষ্ট্রের স্বার্থের পরিপন্থী বা অবমাননাকর। এই ধরনের ভাষা এতটাই বিস্তৃত যে প্রায় যেকোনো সমালোচনামূলক বক্তব্যের আওতায় পড়ার সুযোগ রয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন অধিকার এই ব্যবস্থার সরাসরি অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের ঘটনা নিয়ে সংগঠনটির প্রতিবেদন দেশের ভাবমূর্তি বিদেশে ক্ষুণ্ন করছে এমন অভিযোগ তুলে ব্যুরো তার নিবন্ধন নবায়ন নিয়ে দীর্ঘদিন আপত্তি জানিয়েছে।
পৃষ্ঠপোষকতা, শাস্তি ও আঞ্চলিক বৈষম্য
নিবন্ধন বাতিলের মতো সরাসরি পদক্ষেপের বাইরে আরও নিত্যদিনের যে পক্ষপাত দেখা গেছে, তার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো উন্নয়ন ব্যয়ের বণ্টন। ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অথবা দলটির কাছে গ্রহণযোগ্য এনজিওগুলো ক্ষুদ্রঋণ, কৃষি ও গ্রামীণ অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য প্রকল্প অনুমোদন, জমি ব্যবহারের সুযোগ এবং স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা তুলনামূলকভাবে সহজে পেয়েছে। অন্যদিকে বিরোধী দলের প্রতি সহানুভূতিশীল হিসেবে বিবেচিত সংগঠন কিংবা প্রকাশ্যে কোনো রাজনৈতিক পক্ষের সঙ্গে যুক্ত হতে অনিচ্ছুক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধীরগতির অনুমোদন, বাছাই করা নিরীক্ষা এবং লাইসেন্স নবায়নে নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে।
ক্ষমতাসীন দলের শক্ত ঘাঁটিগুলো যেহেতু নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকায় বেশি কেন্দ্রীভূত থাকে, এই প্রবণতা শেষ পর্যন্ত দৃশ্যমান আঞ্চলিক বৈষম্য তৈরি করেছে। কিছু জেলায় ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম, কৃষি সম্প্রসারণ কর্মসূচি এবং দুর্যোগ মোকাবিলার অবকাঠামোর ঘনত্ব বেড়েছে। বিপরীতে বিরোধী রাজনৈতিক অবস্থানের জেলাগুলো পিছিয়ে পড়েছে। ফলে যে ধরনের অসম উন্নয়ন দূর করার লক্ষ্যেই এনজিওগুলোর সৃষ্টি হয়েছিল, রাজনৈতিক পক্ষপাত সেই বৈষম্যকেই আরও শক্তিশালী করেছে।
২০১০ এর দশকে গ্রামীণ ব্যাংক ও এর প্রতিষ্ঠাতাকে ঘিরে রাজনৈতিকভাবে উত্তপ্ত পরিস্থিতিও এই বাস্তবতার একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। প্রতিষ্ঠাতার সঙ্গে সরকারের প্রকাশ্য বিরোধপূর্ণ সম্পর্কের মধ্যে ব্যাংকটির নেতৃত্ব ও মালিকানা কাঠামো পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত একটি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানও তখন একটি নিরপেক্ষ উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং রাজনৈতিক বিরোধের অংশ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি।
তিনটি সংস্কার
এই রাজনৈতিকীকরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে তিনটি কাঠামোগত পরিবর্তন আনা যেতে পারে।
প্রথমত, এনজিও নিবন্ধন ও প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বাইরে একটি স্বাধীন আইনসিদ্ধ কমিশনের কাছে হস্তান্তর করা উচিত। কমিশনের সদস্যদের নির্দিষ্ট মেয়াদে নিয়োগ দিতে হবে এবং স্বচ্ছ ও বহুদলীয় বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের নির্বাচন করতে হবে। উন্নয়ন তহবিল প্রবাহের প্রধান প্রবেশদ্বার কোনো একক সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকা উচিত নয়।
দ্বিতীয়ত, নিবন্ধন বাতিলের ক্ষেত্রে বর্তমানে ব্যবহৃত অস্পষ্ট মানদণ্ড, যেমন রাষ্ট্রের ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড, বাতিল করে সুনির্দিষ্ট ও আদালতে পর্যালোচনাযোগ্য মানদণ্ড নির্ধারণ করতে হবে। আর্থিক জালিয়াতি, যাচাই করা নিরাপত্তাঝুঁকি অথবা সংগঠনের ঘোষিত দাতব্য উদ্দেশ্যের সুস্পষ্ট লঙ্ঘনের মতো নির্দিষ্ট কারণেই কেবল নিবন্ধন বাতিলের সুযোগ থাকা উচিত। এর মাধ্যমে সমালোচনামূলক অবস্থান গ্রহণকারী কিংবা বিরোধী রাজনৈতিক মতের কাছাকাছি বলে বিবেচিত সংগঠনকে লক্ষ্যবস্তু করার সুযোগ কমবে।
তৃতীয়ত, এনজিও পরিচালিত উন্নয়ন ব্যয়ের তথ্য বাধ্যতামূলকভাবে একটি উন্মুক্ত ও বিস্তারিত সরকারি তথ্যভান্ডারে প্রকাশ করতে হবে। কোন জেলা এবং কোন রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত এলাকায় এনজিওগুলোর মাধ্যমে কৃষি, ক্ষুদ্রঋণ ও অবকাঠামো খাতে কত অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত থাকা দরকার। এর ফলে স্বাধীন গবেষক ও নির্বাচন পর্যবেক্ষকেরা আঞ্চলিক পক্ষপাত ঘটার সময়ই তা শনাক্ত করতে পারবেন, বহু বছর পর নয়।
উপসংহার
এই সংস্কারগুলোর কোনোটিই এনজিও খাতের মাধ্যমে অর্থপাচার বা উগ্রপন্থী কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন প্রতিরোধে রাষ্ট্রের বৈধ দায়িত্বকে দুর্বল করার দাবি জানায় না। বরং প্রয়োজন হলো বৈধ নিয়ন্ত্রক দায়িত্বকে রাজনৈতিক প্রণোদনা থেকে আলাদা করা। এখন পর্যন্ত ক্ষমতায় আসা প্রতিটি নির্বাচিত সরকারের মধ্যেই উন্নয়ন খাতের অর্থায়নকে পুরস্কার ও শাস্তির রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের প্রণোদনা দেখা গেছে।
এই দুই ক্ষেত্রের মধ্যে সুস্পষ্ট বিভাজন প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের উন্নয়নমূলক এনজিওগুলো দেশের রাজনৈতিক বিভাজনকে দূর করার পরিবর্তে তারই প্রতিচ্ছবি হয়ে থাকবে। সুশীল সমাজের শক্তি তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন রাজনৈতিক আনুগত্য নয়, মানুষের প্রয়োজন এবং উন্নয়নের প্রকৃত ফলাফল হবে সম্পদ ও সুযোগ বণ্টনের প্রধান ভিত্তি।
