ফারাহ জেহির
সম্পাদক, অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
এই প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য হলো একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তিগত ত্রুটি কীভাবে বাংলাদেশের একক প্ল্যাটফর্ম নির্ভরতাকে প্রকাশ করে দিয়েছে, তা তুলে ধরা। ফেসবুক বিভ্রাটকে কেন্দ্র করে লেখাটি দৈনন্দিন যোগাযোগ, ব্যবসা ও সামাজিক সংযোগে এই নির্ভরতার ঝুঁকি নিয়ে একটি বৃহত্তর নীতিগত প্রশ্ন তুলেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯শে জুলাই স্থানীয় সময় দুপুর প্রায় সোয়া একটার দিকে ফেসবুকে বিভ্রাট শুরু হয়। ডেস্কটপ ব্যবহারকারীরা “অ্যাকাউন্ট সাময়িকভাবে অনুপলব্ধ” বার্তা দেখতে পান, আর মোবাইল অ্যাপ ব্যবহারকারীরা পৃষ্ঠা রিফ্রেশ না হওয়ার সমস্যায় পড়েন। বাংলাদেশের ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ও ব্যান্ডউইথ সরবরাহকারীরা নিশ্চিত করেছে যে দেশীয় নেটওয়ার্কে কোনো ত্রুটি ছিল না এবং সরকারের পক্ষ থেকেও কোনো নির্দেশনা ছিল না। সমস্যাটি সম্পূর্ণভাবে ফেসবুকের নিজস্ব অবকাঠামোতে ছিল, যা সমাধানে বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষ বা ব্যবহারকারীদের কিছুই করার ছিল না।
বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ব্যবসা, সংবাদ প্রচার এমনকি সরকার ও নাগরিকের মধ্যে যোগাযোগেও ফেসবুক যেভাবে অপরিহার্য হয়ে উঠেছে, তা বিবেচনায় নিয়ে নীতিনির্ধারকদের উচিত প্ল্যাটফর্ম বৈচিত্র্যকরণে উদ্যোগ নেওয়া। স্থানীয় বা বিকল্প যোগাযোগ মাধ্যম উন্নয়নে সহায়তা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে এসএমএস, নিজস্ব ওয়েবসাইট বা অন্যান্য অ্যাপের মতো বিকল্প চ্যানেল বজায় রাখতে উৎসাহিত করা এবং একক বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর না করে দেশীয় ডিজিটাল অবকাঠামোতে বিনিয়োগ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
নির্ভরতার ব্যাপ্তি
বাংলাদেশ শুধু ফেসবুকের একজন ভোক্তা নয়। বরং পৃথিবীর সবচেয়ে ফেসবুকনির্ভর জাতিগুলোর একটি এই দেশ। লাখো নাগরিকের কাছে ফেসবুকই যেন ইন্টারনেট। ছোট ব্যবসাগুলো একচেটিয়াভাবে ফেসবুক পেজ ও মেসেঞ্জার কথোপকথনের মাধ্যমে চলে। ফ্রিল্যান্সাররা এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমেই আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। সংবাদমাধ্যমগুলো নিজেদের ওয়েবসাইটে প্রকাশের আগেই ফেসবুকে খবর প্রকাশ করে। কমিউনিটি গ্রুপগুলো ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমে সামাজিক কার্যক্রম সংগঠিত করে। প্ল্যাটফর্ম অকার্যকর হয়ে পড়লে এসব কার্যক্রম কেবল ধীর হয়ে যায় না, একেবারে থমকে যায়। ব্যক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক কোনো স্তরেই বিকল্প কোনো অবকাঠামো বা পরিকল্পনা নেই।
পর্দার আড়ালে মানবিক মূল্য
সংখ্যার বাইরেও একটি নীরব ও ব্যক্তিগত ক্ষতি রয়েছে, যা নীতিনির্ধারণী আলোচনায় খুব কমই উঠে আসে। ঢাকা বা রংপুরের একজন গৃহভিত্তিক উদ্যোক্তা, যাঁর পুরো জীবিকা একটি ফেসবুক পেজের ওপর নির্ভরশীল, তাঁর কাছে এক ঘণ্টার বিভ্রাট নিছক অসুবিধা নয়, বরং সেদিনের আয়ের ওপর সরাসরি হুমকি। ছোট উদ্যোক্তাদের মধ্যে দ্রুত উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে, কারণ তাঁরা নিশ্চিত হতে পারেন না ক্রেতার টাকা পৌঁছেছে কি না, অর্ডার গৃহীত হয়েছে কি না, নাকি সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে গড়ে তোলা আস্থা একটি জমাট পাতার আড়ালে হারিয়ে গেছে। এসব বিক্রেতার একটি বড় অংশ নারী, যাঁরা ঘরে বসেই ব্যবসা পরিচালনা করেন এবং ফেসবুকই তাঁদের কাছে একমাত্র সহজলভ্য বাজার, যেখানে দোকান ভাড়া বা আলাদা ওয়েবসাইটের খরচ নেই।
বিভ্রাট শুধু আর্থিক ক্ষতি করে না, তাঁদের উদ্যোক্তা হিসেবে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হওয়ার আত্মবিশ্বাসেও আঘাত হানে। একই অসহায়ত্ব দেখা যায় ফ্রিল্যান্সারদের মধ্যেও, যাঁরা ফাঁকা পর্দার সামনে বসে ভাবতে থাকেন, বিদেশি ক্লায়েন্ট হয়তো ভাবছেন তাঁরা ইচ্ছাকৃতভাবেই চুপ হয়ে গেছেন। এমন একটি ব্যবস্থার সঙ্গে পেশাগত ও আর্থিকভাবে বাঁধা থাকা, যার নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেই এবং যোগাযোগ করারও কোনো উপায় নেই, এই মানসিক চাপ প্রায় স্বীকৃতিই পায় না, অথচ সাধারণ মানুষের মানসিক প্রশান্তির ওপর ডিজিটাল নির্ভরতার সবচেয়ে ক্ষয়কারী প্রভাবগুলোর একটি এটাই।
টাকা, আস্থা এবং একটি অনিয়ন্ত্রিত বাজার
একটি কঠিন প্রশ্ন তোলাই সংগত। ফেসবুক কখনোই কোনো পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম বা নিয়ন্ত্রিত বাজার হিসেবে তৈরি হয়নি, তবু বাংলাদেশে এটি দুটি ভূমিকাই পালন করছে। ক্রেতারা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সেবার মাধ্যমে অগ্রিম টাকা পাঠান শুধু একটি মেসেঞ্জার কথোপকথন আর একটি পণ্যের ছবির ভরসায়। এখানে কোনো এসক্রো ব্যবস্থা নেই, নেই যাচাইকৃত বিক্রেতা নিবন্ধন, নেই বিরোধ নিষ্পত্তির কোনো প্রক্রিয়া, আর নেই এমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নিশ্চয়তা যে ফেসবুক চ্যাটের মাধ্যমে হাতবদল হওয়া টাকা কোনোভাবে সুরক্ষিত। প্ল্যাটফর্ম বন্ধ হয়ে গেলে এসব অনানুষ্ঠানিক লেনদেন কোনো রসিদ, কোনো গ্রাহকসেবা লাইন কিংবা অভিযোগ জানানোর মতো কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা ছাড়াই শূন্যে ঝুলে থাকে।
এই দুর্বলতা কেবল বিভ্রাটের সময়েই প্রকাশ পায় না, বরং এটি একটি স্থায়ী কাঠামোগত ঘাটতি। বাংলাদেশ কার্যত তার ডিজিটাল বাজার ও অনানুষ্ঠানিক পেমেন্ট ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে একটি বিদেশি প্ল্যাটফর্মের সদিচ্ছা ও সচলতার ওপর ছেড়ে দিয়েছে, প্রকৃত ইকমার্স অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয় সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে না তুলেই।
সরকার কি এই বিষয়ে ভেবেছে?
এখানে নীতিনির্ধারকদের কাছে একটি ন্যায্য ও বহুকাল ধরে উপেক্ষিত প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন, সরকার কি কখনো গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখেছে জাতীয় অর্থনীতির কত বড় অংশ এমন একটি প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরশীল, যার মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণ কোনোটাই তার হাতে নেই? সমন্বিত ঝুঁকি মূল্যায়ন, কোনো জরুরি পরিকল্পনা, এমনকি ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য একক প্ল্যাটফর্মনির্ভরতার ঝুঁকি সম্পর্কে সাধারণ একটি সতর্কবার্তা পর্যন্ত সরকারিভাবে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। বছরের পর বছর ধরে ছোট ছোট বিভ্রাট ও ধীরগতির মধ্য দিয়ে সতর্কসংকেত স্পষ্ট থাকলেও, সরকারি পরিকল্পনায় সতর্কতা এখনো অনেকাংশে অনুপস্থিত।
সামাজিক ও তথ্যগত প্রভাব
বাণিজ্যের বাইরেও এই বিভ্রাট তথ্যব্যবস্থায় আঘাত হেনেছে। বিভ্রাটের সময় ব্যবহারকারীরা অন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছুটে গিয়ে সমস্যাটি নিশ্চিত করার চেষ্টা করেন ও সর্বশেষ তথ্য জানতে চান, যা প্রমাণ করে বাংলাদেশে তাৎক্ষণিক তথ্যের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে ফেসবুক। সেই মাধ্যম বিকল হয়ে পড়লে সাধারণ মানুষ তথ্যশূন্যতায় পড়ে যায়। ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমে নিয়মিত প্রচারিত নাগরিক ঘোষণা, জরুরি সমন্বয় ও সামাজিক নিরাপত্তা সতর্কবার্তা সাময়িকভাবে অসম্ভব হয়ে পড়ে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থাপ্রবণ একটি দেশের জন্য এই দুর্বলতা কাল্পনিক নয়, বরং একটি বাস্তব ও বারবার ফিরে আসা ঝুঁকি।
প্রয়োজনীয় সংস্কার
এই নির্ভরতা মোকাবিলায় একযোগে একাধিক পদক্ষেপ প্রয়োজন। প্রথমত, সরকারকে একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বৈচিত্র্যকরণ কৌশল গ্রহণ করতে হবে, যার মধ্যে থাকবে সরকারি নিজস্ব যোগাযোগ চ্যানেল, এসএমএসভিত্তিক সতর্কব্যবস্থা এবং বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণাধীন দেশীয়ভাবে হোস্ট করা প্ল্যাটফর্ম। দেশীয় নাগরিক যোগাযোগের জন্য একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোর ওপর নির্ভরতা একটি সার্বভৌম দুর্বলতা, যা কোনো দায়িত্বশীল সরকারেরই মেনে নেওয়া উচিত নয়।
দ্বিতীয়ত, ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য প্রকৃত বিকল্প দরকার। নাগরিকেরা যদি ঘরোয়া বা ছোট উদ্যোগ থেকে আয় করতে চান, তবে তাঁদের এমন নিরাপদ, ব্যবহারবান্ধব এবং স্থানীয়ভাবে সহায়তাপ্রাপ্ত ইকমার্স প্ল্যাটফর্মের প্রবেশাধিকার প্রয়োজন, যেখানে জবাবদিহিতা নেই এমন একটি বিদেশি অ্যাপের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর থাকতে না হয়। সরকারসমর্থিত ডিজিটাল বাজার, যাচাইকৃত বিক্রেতা ব্যবস্থা এবং যথাযথ গ্রাহকসুরক্ষাসহ সহজ ও সাশ্রয়ী পেমেন্ট গেটওয়ে উদ্যোক্তাদের জন্য একটি নিরাপদ ভিত্তি তৈরি করতে পারে। কর প্রণোদনা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং স্বল্পমূল্যের হোস্টিং সুবিধা এই রূপান্তরকে দ্রুততর করতে পারে।
তৃতীয়ত, প্ল্যাটফর্ম কেন্দ্রীকরণের বাস্তবতার সঙ্গে সংগতি রেখে নিয়ন্ত্রক কাঠামো হালনাগাদ করতে হবে। বাংলাদেশের প্রয়োজন তথ্য স্থানীয়করণ নীতি, বাধ্যতামূলক পুনরুদ্ধার ব্যবস্থা এবং বৃহৎ সংখ্যক ব্যবহারকারী সেবাদানকারী প্রধান প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সেবা চুক্তি, পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যমে সম্পাদিত লেনদেনের জন্য স্পষ্ট গ্রাহকসুরক্ষা বিধি।
চতুর্থত, ডিজিটাল সাক্ষরতা কর্মসূচির মাধ্যমে নাগরিক ও ব্যবসায়ীদের শেখাতে হবে কীভাবে একাধিক প্ল্যাটফর্মে কার্যক্রম পরিচালনা করা যায়, পুরো ডিজিটাল ও আর্থিক জীবন একটি জায়গায় কেন্দ্রীভূত না রেখে। ফেসবুককে একসঙ্গে ইমেইল, বার্তাসেবা, বাজার, ব্যাংক এবং সংবাদমাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার এই প্রবণতা একটি একক ব্যর্থতার বিন্দু তৈরি করে, যা কোনো ব্যক্তির মেনে নেওয়া উচিত নয়, আর কোনো নীতিপরিবেশেরও উৎসাহিত করা উচিত নয়।
ফেসবুকে আবার বিভ্রাট ঘটবে। এটি কোনো পূর্বাভাস নয়, বরং একটি প্রযুক্তিগত নিশ্চয়তা। আসল প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ এবং এই একক প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরশীল ছোট ব্যবসায়ীরা পরবর্তীবার একই রকম অরক্ষিত থেকে যাবেন কি না। ওপরে উল্লেখিত সংস্কারগুলো কোনো কল্পনাপ্রসূত পরিকল্পনা নয়। এগুলো জরুরি, বাস্তবসম্মত এবং দীর্ঘদিন ধরে বিলম্বিত। নীতিগত প্রতিক্রিয়া ছাড়া প্রতিটি বিভ্রাট কাঠামোগত নির্ভরতাকে আরও গভীর করে এবং শেষ পর্যন্ত হিসাব মেটানোর মূল্যকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
