ইকরা মনজুর
ইউনিভার্সিটি অব দ্য পাঞ্জাব, লাহোর, পাকিস্তান
“তথ্য একটি জনসম্পদ।” ইউনেসকো তাদের Windhoek+30 Declaration-এ এই নীতিকে পুনর্ব্যক্ত করে বলেছে, নির্ভরযোগ্য ও স্বাধীন তথ্যপ্রাপ্তি গণতন্ত্র, টেকসই উন্নয়ন এবং শান্তির জন্য অপরিহার্য। কিন্তু বর্তমান ডিজিটাল যুগে তথ্য ক্রমেই একটি যৌথ জনসম্পদের পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছে।
পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সংকটও দুই দেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে গভীর উদ্বেগের বিষয়টি সামনে এনেছে। Reporters Without Borders (RSF) প্রকাশিত ২০২৫ সালের World Press Freedom Index-এ ১৮০টি দেশের মধ্যে পাকিস্তানের অবস্থান ১৫৩তম এবং বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৯তম।
এই সূচক স্বাধীন সাংবাদিকতা এবং অবাধ তথ্যপ্রবাহের ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী সীমাবদ্ধতার ইঙ্গিত দেয়। তবে এই সংকটের মূল কারণ শুধু সংবাদমাধ্যম নয়; বরং রাজনৈতিক প্রচারণা, দলীয় পক্ষপাতদুষ্ট গণমাধ্যম এবং ভ্রান্ত তথ্যের মতো একাধিক কাঠামোগত উপাদান সমাজে বিভাজন বাড়াচ্ছে, জনআস্থা দুর্বল করছে এবং গণতান্ত্রিক শাসনকে আরও জটিল করে তুলছে। গণমাধ্যম যখন প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক বর্ণনার যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়, তখন সংবাদমাধ্যমের সততা রক্ষা কেবল সাংবাদিকতার প্রশ্ন থাকে না; বরং গণতন্ত্র রক্ষার অপরিহার্য শর্ত হয়ে ওঠে।
২০২৩ সালের মে মাসে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের গ্রেপ্তারের পর সৃষ্ট রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখিয়েছে, কীভাবে পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক বর্ণনা অল্প সময়ের মধ্যেই জাতীয় সংকটে রূপ নিতে পারে। গ্রেপ্তারের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই টেলিভিশন চ্যানেল, রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবশালীরা ঘটনাটিকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেন।
ইমরান খানের সমর্থকেরা গ্রেপ্তারকে গণতন্ত্র এবং বেসামরিক কর্তৃত্বের ওপর আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেন। অন্যদিকে সরকারপন্থী গণমাধ্যম একে আইনের শাসনের অংশ এবং জবাবদিহিতার বৈধ প্রক্রিয়া হিসেবে তুলে ধরে। এই বিপরীতমুখী বর্ণনা দ্রুত সংঘর্ষের জন্ম দেয়। দেশের বিভিন্ন শহরে সামরিক স্থাপনা, সরকারি ভবন এবং জনসম্পদের ওপর হামলা হয়। পরবর্তী সময়ে গণমাধ্যমের ওপর বিধিনিষেধ, ব্যাপক রাজনৈতিক গ্রেপ্তার এবং বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেট ব্যবহারের ঘটনা ঘটে।
এই পরিস্থিতির কঠোর সমালোচনা করে Amnesty International। সংস্থাটি অনির্দিষ্টকালের জন্য মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিধিনিষেধকে জনগণের তথ্যপ্রাপ্তি ও মতপ্রকাশের অধিকারের গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যায়িত করে। এই অভিজ্ঞতা দেখায়, বিভক্ত গণমাধ্যম জনমনে ক্ষোভ বাড়ায় এবং সামাজিক অস্থিরতা আরও ত্বরান্বিত করতে পারে।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় বাংলাদেশও এক সহিংস বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। সরকারি চাকরিতে নিয়োগব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ধীরে ধীরে বৃহত্তর রাজনৈতিক সংঘাতে রূপ নেয়। শুরুতে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অনেক গণমাধ্যম আন্দোলনের মূল দাবি ও জনউদ্বেগকে গুরুত্ব না দিয়ে একে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কর্মসূচি হিসেবে উপস্থাপন করে। এর ফলে তথ্যপ্রবাহে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়।
মানবাধিকার পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এবং United Nations Human Rights Office উল্লেখ করেছে, গণমাধ্যমের ওপর বিধিনিষেধ এবং প্রাণঘাতী “shoot-on-sight” কারফিউ নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যাপক দমন অভিযানের বাস্তব চিত্র আড়াল করতে ব্যবহৃত হয়েছিল। তাদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, সেই অভিযানে প্রায় ১,৪০০ মানুষের মৃত্যু ঘটে।
পাকিস্তান ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এক নয়। তবে দুই দেশের অভিজ্ঞতা কয়েকটি অভিন্ন কাঠামোগত দুর্বলতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মেরুকরণ, প্রাতিষ্ঠানিক অবিশ্বাস, সুশাসনের ঘাটতি এবং জনঅসন্তোষই সংকটের মূল ভিত্তি। প্রচারণা কিংবা ভ্রান্ত তথ্য এই বিভাজনের জন্ম দেয়নি, বরং আবেগনির্ভর বর্ণনার মাধ্যমে বিভাজনকে আরও তীব্র করেছে। রাজনৈতিক স্বার্থে গণমাধ্যম ব্যবহৃত হলে গঠনমূলক জনআলোচনার ক্ষেত্র ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ে।
এই প্রবণতার প্রতিফলন দেখা যায় V-Dem Institute-এর মূল্যায়নেও। সংস্থাটি পাকিস্তান ও বাংলাদেশকে electoral autocracy হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে, যেখানে পরিকল্পিত ভ্রান্ত তথ্যের বিস্তার গণতান্ত্রিক আলোচনাকে সরাসরি দুর্বল করে। একই সঙ্গে বিভিন্ন গণমাধ্যম পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এবং Reporters Without Borders (RSF) স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ ও নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি ধারাবাহিকভাবে নথিভুক্ত করেছে।
ডিজিটাল গণমাধ্যমের দ্রুত বিস্তার দক্ষিণ এশিয়ার তথ্যসংকটকে আরও গভীর করেছে। অ্যালগরিদমনির্ভর প্ল্যাটফর্মগুলোতে আবেগপ্রবণ বিষয়বস্তু প্রায়ই যাচাইকৃত সংবাদকে ছাড়িয়ে যায়। ফলে নির্ভুল তথ্যের পরিবর্তে উত্তেজনাপূর্ণ প্রচারণা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এই কাঠামোগত দুর্বলতা মোকাবিলায় পাকিস্তান ও বাংলাদেশের প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। প্রতিক্রিয়াশীল সেন্সরশিপ কিংবা ইন্টারনেট বন্ধের পরিবর্তে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, স্বচ্ছতা এবং জনআস্থা শক্তিশালী করার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
প্রথমত, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে পরিচালিত হতে হবে। লাইসেন্স প্রদান, তদারকি এবং আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় স্বার্থ নয়, বরং স্বচ্ছ আইনি কাঠামো অনুসরণ করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, পাকিস্তানের Prevention of Electronic Crimes Act (PECA) এবং বাংলাদেশের Cyber Security Act-এর বাস্তবায়ন নিয়ে সাংবাদিক, নাগরিক সমাজ এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উদ্বেগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। অনলাইন ক্ষতি প্রতিরোধের উদ্যোগ যেন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত সীমাবদ্ধতামূলক না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, সাংবাদিকদের জন্য শক্তিশালী আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে এবং জনস্বার্থভিত্তিক স্বাধীন সাংবাদিকতা ও তথ্য যাচাই উদ্যোগকে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দিতে হবে, যাতে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়েও নির্ভুল ও ভারসাম্যপূর্ণ সংবাদ প্রকাশ সম্ভব হয়।
সবশেষে, ইন্টারনেট বন্ধের মতো তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের পরিবর্তে জবাবদিহিমূলক ডিজিটাল সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সময়োপযোগী সরকারি তথ্যপ্রকাশ, ভ্রান্ত তথ্য মোকাবিলায় লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবস্থা এবং জাতীয় পর্যায়ে ডিজিটাল সাক্ষরতা কর্মসূচি গ্রহণ করা জরুরি। পাকিস্তান ও বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা দেখায়, ইন্টারনেট বন্ধ করে দিলে জনআস্থা কমে, যাচাইবিহীন তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং অর্থনীতি ও সমাজ উভয় ক্ষেত্রেই বড় ধরনের ক্ষতি হয়।
সবশেষে বলা যায়, একটি সহনশীল গণতন্ত্রের ভিত্তি গড়ে ওঠে স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর, যেখানে নির্ভুলতা, জবাবদিহিতা এবং জনআস্থাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়। রাজনৈতিক মেরুকরণ কমিয়ে গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা শক্তিশালী করার জন্য স্বাধীন ও দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যমের কোনো বিকল্প নেই।
তথ্যসূত্র
