সরস্বতী শ্রীনিবাসন
বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়, দুবাই
আয় বৈষম্য কখনোই কেবল একটি অর্থনৈতিক সূচক নয়। যখন সম্পদ সীমিতসংখ্যক মানুষের হাতে অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত হয়, তখন তা নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ভোগের সক্ষমতাকেও প্রভাবিত করে। ভারত ও বাংলাদেশকে প্রায়ই দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সফল উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে উভয় দেশের ক্ষেত্রেই একটি পরিচিত বৈপরীত্য রয়েছে: জাতীয় আয় দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও সেই আয়ের সুফল সমাজের বিভিন্ন স্তরে সমানভাবে পৌঁছায়নি।
এই প্রবন্ধে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) কে সমতাভিত্তিক প্রবৃদ্ধির মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করে ভারত ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামো তুলনা করা হয়েছে। SDG 10 অনুযায়ী, সমাজের নিচের ৪০ শতাংশ মানুষের আয় জাতীয় গড় আয়ের তুলনায় দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া উচিত। একই সঙ্গে SDG 1 (দারিদ্র্য বিমোচন), SDG 3 (স্বাস্থ্য), SDG 4 (শিক্ষা) এবং SDG 16 (ন্যায়বিচার ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান) দেখায়, কীভাবে আয় বৈষম্য মৌলিক অধিকার পাওয়ার ক্ষেত্রেও বৈষম্য তৈরি করে।
এই কাঠামোর আলোকে মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, উভয় দেশই এখনও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা থেকে পিছিয়ে রয়েছে। বৈষম্য কমাতে শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়, প্রয়োজন কার্যকর নীতিগত সংস্কারও।
ভারত: কাঠামোগত বৈষম্য ও সম্পদের কেন্দ্রীভবন
ভারত বর্তমানে বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতিগুলোর একটি। দেশটির জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭.৬ শতাংশ। তবে ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি রিপোর্ট ২০২৬ অনুযায়ী, ভারতের শীর্ষ ১০ শতাংশ মানুষ জাতীয় আয়ের প্রায় ৫৮ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে, যেখানে নিচের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর হাতে রয়েছে মাত্র ১৫ শতাংশ আয়। এই চিত্র SDG 10 এর অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে।
সম্পদের কেন্দ্রীভবন আরও বেশি প্রকট। দেশের সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষের হাতে প্রায় ৬৫ শতাংশ সম্পদ রয়েছে এবং শীর্ষ ১ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে প্রায় ৪০ শতাংশ সম্পদ। ২০১৪ সালের পর থেকে উচ্চ প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও এই বৈষম্যের চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন হয়নি। একই সময়ে নারীর কর্মসংস্থানের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি। দীর্ঘ সময় ধরে তা প্রায় ১৫.৭ শতাংশের কাছাকাছি রয়েছে।
ভারতের আয় বৈষম্য আরও জটিল হয়েছে জাতপাত, ধর্ম ও আঞ্চলিক বিভাজনের কারণে। ফলে SDG 3 এবং SDG 4 এর ফলাফলও ভিন্ন হয়ে দাঁড়ায়। যারা ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষায় বিনিয়োগ করতে পারে এবং যারা সীমিত সম্পদের সরকারি সেবার ওপর নির্ভরশীল, তাদের অভিজ্ঞতার মধ্যে বড় পার্থক্য তৈরি হয়।
শ্রমবাজারেও এই বৈষম্যের প্রতিফলন দেখা যায়। ইন্ডিয়া এমপ্লয়মেন্ট রিপোর্ট ২০২৪ অনুযায়ী, ভারতের প্রায় ৮২ শতাংশ কর্মী অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন এবং প্রায় ৯০ শতাংশ কর্মসংস্থান অনানুষ্ঠানিক প্রকৃতির। ফলে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক ন্যূনতম মজুরি ও সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকেন। কৃষকদের দীর্ঘদিনের সংকট ও আন্দোলনও দেখায়, আয় অনিশ্চয়তা কীভাবে আর্থসামাজিক অধিকার ও নীতিগত জবাবদিহির প্রশ্নে বড় ধরনের জনঅসন্তোষ তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশ: অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও শিল্প খাতের ঝুঁকি
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক গতিপথ ভারতের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন। রাজনৈতিক পরিবর্তন ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবে ২০২৫ অর্থবছরে দেশের অর্থনীতি ৩.৯ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি রিপোর্ট ২০২৬ এর তথ্য অনুযায়ী, ভারতে তুলনায় বাংলাদেশে আয় বৈষম্যের মাত্রা কিছুটা কম। দেশের শীর্ষ ১০ শতাংশ মানুষ মোট আয়ের প্রায় ৪১ শতাংশ অর্জন করে, যেখানে নিচের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর আয় ১৯ শতাংশ।
সম্পদের ক্ষেত্রেও শীর্ষ ১০ শতাংশ মানুষের হাতে প্রায় ৫৮ শতাংশ সম্পদ রয়েছে এবং শীর্ষ ১ শতাংশের কাছে রয়েছে প্রায় এক-চতুর্থাংশ সম্পদ। বাংলাদেশে আয় বৈষম্যের অনুপাত ২০১৪ সালের ২২.৩ থেকে ২০২৪ সালে সামান্য কমে ২১.৬ হয়েছে। নারীর শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ২২.৩ শতাংশে স্থির রয়েছে, যা কম হলেও ভারতের তুলনায় বেশি।
তবে SDG 1 এর দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যমাত্রার আলোকে পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালে প্রায় ২০ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়েছে। এর পেছনে অন্যতম কারণ হলো তৈরি পোশাক শিল্পের সম্পদ বণ্টনের কাঠামো। এই খাতে বিপুল সম্পদ মূলত কারখানা মালিক ও নগরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে, যেখানে শ্রমিকরা মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত মজুরি হ্রাস এবং সীমিত শ্রম অধিকার ভোগের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন।
এই বৈষম্য SDG 16 এর আওতায় প্রাতিষ্ঠানিক প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলছে। উচ্চ আয়ের পরিবারগুলো প্রশাসনিক ও আইনি কাঠামো ব্যবহারে তুলনামূলকভাবে বেশি সক্ষম হলেও নিম্ন আয়ের নাগরিকরা দুর্বল শ্রম আইন প্রয়োগ এবং সম্পত্তির অধিকার সুরক্ষার সমস্যার মুখোমুখি হন।একইভাবে সরকারি সেবায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাবে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা এবং বেসরকারি ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষা মূলত উচ্চ আয়ের জনগোষ্ঠীর নাগালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।
তুলনামূলক কাঠামোগত কারণ
বাংলাদেশে আয় বৈষম্য মূলত কয়েকটি রপ্তানিমুখী শিল্প ও নগরকেন্দ্রিক অর্থনীতিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে। ফলে লক্ষ্যভিত্তিক শ্রমবাজার সংস্কারের মাধ্যমে বৈষম্য কমানোর সুযোগ তুলনামূলকভাবে বেশি।
অন্যদিকে ভারতের বৈষম্য জাতপাত, ধর্ম, অঞ্চল এবং বৃহৎ অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বিপুলসংখ্যক শ্রমিক ন্যূনতম মজুরি ও সামাজিক নিরাপত্তার বাইরে থাকায় এই বৈষম্য কাঠামোগত রূপ নিয়েছে এবং শুধুমাত্র অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে তা দূর করা কঠিন।
SDG ভিত্তিক নীতিগত সংস্কার
উভয় দেশের প্রবৃদ্ধি মডেলকে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রয়োজন।
প্রথমত, শ্রমবাজারকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনা।
দুই দেশেই স্বাধীন ও পর্যাপ্ত সম্পদসম্পন্ন শ্রম পরিদর্শন ব্যবস্থা প্রয়োজন, যা ন্যূনতম মজুরি, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা এবং শ্রমিকদের সংগঠনের অধিকার নিশ্চিত করবে।
দ্বিতীয়ত, প্রগতিশীল রাজস্ব সংস্কার।
প্রত্যক্ষ করের আওতা বাড়ানো, শ্রম আয়ের তুলনায় মূলধনী আয়ের প্রতি বিদ্যমান সুবিধা কমানো এবং সেই অর্থ জনস্বাস্থ্য ও শিক্ষায় বিনিয়োগ করা প্রয়োজন। ভারতের ক্ষেত্রে পরোক্ষ কর, বিশেষ করে জিএসটির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর তুলনামূলক বেশি চাপ সৃষ্টি করে। তাই ধনী শ্রেণির ওপর প্রগতিশীল প্রত্যক্ষ কর ও সম্পদ করের ব্যবহার বৈষম্য কমাতে সহায়ক হতে পারে।
তৃতীয়ত, লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য নগদ সহায়তা, সরকারি স্বাস্থ্যসেবা এবং মানসম্মত শিক্ষা সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। ভারতে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত প্রায় ৮২ শতাংশ শ্রমিককে সামাজিক নিরাপত্তা ও ন্যূনতম মজুরি কাঠামোর আওতায় আনা জরুরি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নতুন দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানো প্রয়োজন।
উপসংহার
ভারত ও বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা দেখায়, কেবল সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উন্নয়নের পূর্ণাঙ্গ পরিমাপক হতে পারে না। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার আলোকে প্রকৃত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে শ্রম অধিকার বাস্তবায়ন, জনসেবা অর্থায়নের জন্য প্রগতিশীল কর ব্যবস্থা এবং অনানুষ্ঠানিক ও গ্রামীণ শ্রমজীবী মানুষের জন্য কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় অব্যাহত জিডিপি প্রবৃদ্ধি আয় বৈষম্য কমানোর পরিবর্তে আরও গভীর করতে পারে এবং মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চনার সঙ্গে অর্থনৈতিক বৈষম্যের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।
তথ্যসূত্র
Chancel, L., Pikely, T., Moshrif, R., Ghosh, J., & Stiglitz, J. (2026). Ricardo Gómez-Carrera (Lead Author) World Inequality Report. World Inequality LAB. https://wir2026.wid.world/www-site/uploads/2026/04/World_Inequality_Report_2026.pdf
ILO. (2024). Youth employment, education and skills. https://www.ilo.org/sites/default/files/2024-08/India%20Employment%20%20web_8%20April.pdf
The Daily Star. (2025). Economic inequality set to widen in Bangladesh in the short-term: World Bank. In The Daily Star. https://www.thedailystar.net/business/news/economicinequality-set-widen-bangladesh-short-term-world-bank-4044286
World Bank Group. (n.d.). world bank open data. In World Bank Open Data. Retrieved August 2, 2026, from https://data.worldbank.org/?locations=IN-BD
