ড. নাঈমা পারভীন
কভেন্ট্রি ইউনিভার্সিটি
শিরোনামের আড়ালে যে প্রশ্ন
২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণার জন্য ২২৬ কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ বেশি এই বরাদ্দকে ঘিরে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
গণমাধ্যমে এমন খবর প্রকাশিত হয়েছিল যে, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণার জন্য আলাদা কোনো বরাদ্দ রাখা হয়নি। সেই প্রেক্ষাপটে ইউজিসির এই ঘোষণা অনেকের কাছে আশ্বস্ত করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হয়েছে। কিন্তু মূল প্রশ্ন রয়ে গেছে, এই অর্থ বরাদ্দ কি সত্যিই জ্ঞানভিত্তিক উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার দিকে কৌশলগত অগ্রযাত্রার ইঙ্গিত, নাকি জনসমালোচনার মুখে নেওয়া একটি তাৎক্ষণিক সংশোধনী পদক্ষেপ?
আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু কেবল অর্থের পরিমাণ নয়। বিষয়টি আরও গভীর। গবেষণা, উদ্ভাবন, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় উন্নয়নকে বাংলাদেশ কীভাবে দেখছে, সেই দৃষ্টিভঙ্গিরও প্রতিফলন এতে রয়েছে। গবেষণায় বিনিয়োগ কোনো সাধারণ ব্যয় নয়। বরং বৈজ্ঞানিক সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, নীতিনির্ধারণে নতুন জ্ঞান এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। যেসব দেশ জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে সফলভাবে রূপান্তরিত হয়েছে, তারা তা করেছে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় ধারাবাহিক, পরিকল্পিত এবং কৌশলগত বিনিয়োগের মাধ্যমে, বিচ্ছিন্ন বা পরিস্থিতিনির্ভর বরাদ্দ দিয়ে নয়।
ঘোষণার অঙ্ক কতটা বাস্তবসম্মত
প্রথম দৃষ্টিতে ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক মনে হতে পারে। কিন্তু নামমাত্র বৃদ্ধি সব সময় বাস্তব অগ্রগতি নির্দেশ করে না। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির ধারাবাহিক চাপ সরকারি ব্যয়ের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। ফলে কোনো বাজেট বৃদ্ধিকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কেবল সংখ্যার দিকে নয়, বাস্তব মূল্যমানের দিকেও নজর দেওয়া জরুরি। কাগজে-কলমে বৃদ্ধি দেখা গেলেও প্রকৃত অর্থে তা স্থবিরতা, এমনকি কার্যত হ্রাসও হতে পারে।
আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। দেশের ৫০টিরও বেশি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ২২৬ কোটি টাকা ভাগ হলে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের প্রাপ্য গড় বরাদ্দ খুব বেশি নয়। গবেষণাভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজন অত্যাধুনিক পরীক্ষাগার, সফটওয়্যার, বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি, গবেষণা সহকারী, মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ, আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনার ব্যয় এবং স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি পর্যায়ের গবেষণা বৃত্তি। বহু ক্ষেত্রে অর্থবহ গবেষণা কয়েক বছরব্যাপী ধারাবাহিক বিনিয়োগ দাবি করে, যার তুলনায় সম্ভাব্য বরাদ্দ সীমিত।
আন্তর্জাতিক পরিসরে গবেষণাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা ও উন্নয়নে বিপুল বিনিয়োগ করে। ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, যেসব দেশের উদ্ভাবন ব্যবস্থা শক্তিশালী, তারা জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কৌশলের অংশ হিসেবে উচ্চশিক্ষা গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় করে। অন্যদিকে বাংলাদেশের গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে মোট জাতীয় ব্যয় এখনো জিডিপির এক শতাংশেরও নিচে, যা অনেক উদীয়মান ও উন্নত অর্থনীতির তুলনায় অনেক কম।
কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বনাম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতা
নতুন অর্থায়ন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কেন্দ্রীয় তদারকি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নির্দিষ্ট খাতভিত্তিক গবেষণা প্রস্তাব ও বাজেট জমা দিতে হবে। পর্যালোচনার পর ইউজিসি অনুমোদন দেবে এবং অর্থ ছাড় করবে। এই ব্যবস্থার সমর্থকদের মতে, কেন্দ্রীয় তদারকি জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারে। গবেষণার পুনরাবৃত্তি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অসম ব্যয়ের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে এমন সমন্বিত ব্যবস্থা সীমিত সম্পদের আরও দক্ষ ব্যবহারে সহায়ক হতে পারে।
তবে এখানেই নীতিগত একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বন্দ্ব রয়েছে। একদিকে জবাবদিহি, অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন। উচ্চশিক্ষা প্রশাসন বিষয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণা বলছে, অতিরিক্ত কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ সৃজনশীলতা কমিয়ে দিতে পারে এবং প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা সীমিত করে। বিশ্ববিদ্যালয় তখনই সবচেয়ে কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে, যখন তারা নিজেদের গবেষণার অগ্রাধিকার নির্ধারণ, নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং বিশেষায়িত দক্ষতা গড়ে তোলার স্বাধীনতা পায়।
গবেষণার বিষয় নির্ধারণের আগে কেন্দ্রীয় অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা অনিচ্ছাকৃতভাবে গবেষকদের এমন প্রস্তাব তৈরিতে উৎসাহিত করতে পারে, যা নীতিনির্ধারকদের প্রত্যাশার সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর ফলে মৌলিক ও অনুসন্ধানধর্মী গবেষণার পরিসর সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, অথচ দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে যুগান্তকারী আবিষ্কার অনেক সময় এমন গবেষণা থেকেই আসে।
শুধু অনুদান দিয়ে গবেষণা সংস্কৃতি গড়ে ওঠে না
ইউজিসি শিক্ষার্থীদের গবেষণায় অংশগ্রহণ বাড়ানো, জ্যেষ্ঠ ও নবীন গবেষকদের মধ্যে সহযোগিতা উৎসাহিত করা এবং জাতীয় গবেষণা সংস্কৃতি শক্তিশালী করার মতো গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এসব উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসনীয়।
তবে একটি শক্তিশালী গবেষণা পরিবেশ গড়ে তুলতে কেবল অর্থ বরাদ্দই যথেষ্ট নয়। সফল গবেষণা ব্যবস্থা গড়ে ওঠে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের সমন্বয়ে। যেমন,
• আধুনিক গবেষণাগার ও গবেষণা অবকাঠামো
• প্রতিযোগিতামূলক গবেষণা অনুদান ব্যবস্থা
• পিএইচডি ও পোস্টডক্টরাল প্রশিক্ষণ
• আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতা
• একাডেমিক প্রকাশনায় সহায়তা
• ডিজিটাল ডেটাবেস ও তথ্যভান্ডারে প্রবেশাধিকার
• বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন এবং দক্ষ নেতৃত্ব
বিশ্বের উন্নত উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা বলছে, টেকসই গবেষণা সংস্কৃতি গড়ে ওঠে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা উন্নয়নের মাধ্যমে, স্বল্পমেয়াদি প্রকল্পভিত্তিক অর্থায়নের মাধ্যমে নয়।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনো গবেষণাগারের সীমাবদ্ধতা, গবেষণা প্রশাসনের দুর্বলতা, পিএইচডি প্রশিক্ষণের ঘাটতি, আন্তর্জাতিক প্রকাশনার স্বল্পতা এবং শিক্ষকদের অতিরিক্ত পাঠদানের চাপের মতো নানা সমস্যার মুখোমুখি। এসব কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর না হলে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের সুফলও সীমিত থেকে যেতে পারে।
নীতিগত করণীয়
১. জাতীয় বিনিয়োগে গবেষণার অংশ বৃদ্ধি
উচ্চশিক্ষা গবেষণা এবং জাতীয় গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যয় ধীরে ধীরে বাড়ানোর জন্য মধ্যমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক মানের দিকে অগ্রসর হওয়ার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা উদ্ভাবনভিত্তিক উন্নয়নের প্রতি রাষ্ট্রের প্রকৃত অঙ্গীকারের পরিচায়ক হবে।
২. জবাবদিহির সঙ্গে স্বায়ত্তশাসনের ভারসাম্য
আর্থিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন, তবে গবেষণার অগ্রাধিকার নির্ধারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আরও স্বাধীনতা দিতে হবে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, জবাবদিহি ও একাডেমিক স্বাধীনতার সমন্বিত কাঠামো গবেষণার মান উন্নত করে।
৩. প্রতিযোগিতাভিত্তিক গবেষণা অনুদান চালু করা
প্রশাসনিক বণ্টনের পরিবর্তে সহকর্মী মূল্যায়নভিত্তিক প্রতিযোগিতামূলক অনুদান ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। যোগ্যতা ও মানের ভিত্তিতে অর্থায়ন গবেষণার উৎকর্ষ ও উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করে।
৪. পিএইচডি ও নবীন গবেষকদের অগ্রাধিকার দেওয়া
ভবিষ্যতের গবেষণা সক্ষমতা নির্ভর করে নতুন প্রজন্মের গবেষক তৈরির ওপর। তাই পিএইচডি শিক্ষার্থী, পোস্টডক্টরাল গবেষক এবং কর্মজীবনের শুরুতে থাকা শিক্ষকদের জন্য বিশেষ অর্থায়ন দীর্ঘমেয়াদে বড় সুফল বয়ে আনবে।
৫. গবেষণায় উৎকর্ষ কেন্দ্র গড়ে তোলা
সীমিত সম্পদ সব প্রতিষ্ঠানে সমানভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিবর্তে নির্বাচিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জলবায়ু পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জনস্বাস্থ্য, কৃষি প্রযুক্তি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির মতো কৌশলগত খাতে বিশেষায়িত উৎকর্ষ কেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে।
৬. আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতা সম্প্রসারণ
বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা নেটওয়ার্কের সঙ্গে অংশীদারত্ব গবেষণার মান বৃদ্ধি, জ্ঞান বিনিময় এবং আন্তর্জাতিক প্রকাশনার প্রভাব বাড়াতে সহায়ক। জাতীয় গবেষণা কৌশলের অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার জন্য পৃথক অর্থায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
উপসংহার
গবেষণার জন্য ২২৬ কোটি টাকার এই বরাদ্দকে একদিকে যেমন গুরুত্বহীন বলা যায় না, অন্যদিকে একে যুগান্তকারী পরিবর্তনও বলা কঠিন। বরাদ্দটি অন্তত স্বীকার করে যে গবেষণা জাতীয় উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে জ্ঞান সৃষ্টি ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে যে পরিমাণ বিনিয়োগ এবং কৌশলগত পরিকল্পনা প্রয়োজন, তার তুলনায় এই উদ্যোগ এখনো সীমিত।
আসল প্রশ্ন অর্থের পরিমাণ নয়, বরং জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় গবেষণাকে কতটা কেন্দ্রীয় অবস্থানে রাখা হচ্ছে। যদি এই বরাদ্দ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন, ধারাবাহিক বিনিয়োগ, গবেষণা অবকাঠামো উন্নয়ন, পিএইচডি প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাভিত্তিক বৃহত্তর সংস্কারের সূচনা হয়, তাহলে তা দেশের উচ্চশিক্ষার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।
কিন্তু যদি এই উদ্যোগ জনসমালোচনার তাৎক্ষণিক জবাব কিংবা প্রতীকী অঙ্গীকারেই সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসবে না। বাংলাদেশের জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে গবেষণা খাতে সামান্য বাজেট বৃদ্ধি নয়, বরং গবেষণাকে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ওপর।
তথ্যসূত্র
Altbach, P. G. (2015). Knowledge and Education as International Commodities. International Higher Education, 28, 2–5.
Marginson, S. (2016). The Dream Is Over: The Crisis of Clark Kerr’s California Idea of Higher Education. University of California Press.
OECD. (2024). Main Science and Technology Indicators 2024. Organisation for Economic Co-operation and Development, Paris.
Salmi, J. (2009). The Challenge of Establishing World-Class Universities. Washington, DC: World Bank.
UNESCO Institute for Statistics. (2023). Research and Experimental Development Statistics. Montreal: UNESCO.
World Bank. (2023). World Development Report: Education and Human Capital for Development. Washington, DC: World Bank.
Aghion, P., Dewatripont, M., Hoxby, C., Mas-Colell, A., & Sapir, A. (2010). The Governance and Performance of Universities: Evidence from Europe and the United States. Economic Policy, 25(61), 7–59.
Geuna, A. (2001). The Changing Rationale for European University Research Funding: Are There Negative Unintended Consequences? Journal of Economic Issues, 35(3), 607–632.
Hazelkorn, E. (2015). Rankings and the Reshaping of Higher Education: The Battle for World-Class Excellence (2nd ed.). Palgrave Macmillan.
UNESCO. (2021). UNESCO Science Report: The Race Against Time for Smarter Development. Paris: UNESCO Publishing.
World Bank. (2024). Bangladesh Development Update: Higher Education and Innovation Challenges. Washington, DC: World Bank.
