আমিরা হায়দার
স্বতন্ত্র স্থপতি
বাংলাদেশ মূলত জলনির্ভর একটি দেশ। দেশের ভূখণ্ডজুড়ে ছড়িয়ে আছে সাত শতাধিক নদী, দক্ষিণে রয়েছে বঙ্গোপসাগর এবং বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপ এই দেশের ভৌগোলিক পরিচয়ের মূল ভিত্তি।
কিন্তু কয়েক দশক ধরে এই বিশাল জলব্যবস্থার ওপর গড়ে ওঠা শহরগুলো পানিকে সম্পদ হিসেবে ব্যবহারের পরিবর্তে এমন একটি সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করেছে, যাকে নিয়ন্ত্রণ করে দূরে সরিয়ে রাখতে হবে।
“নীল নগর” বা ব্লু সিটি ধারণা এই প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন ঘটাতে পারে। পানিকে উপেক্ষা করে নয়, বরং পানিকে কেন্দ্র করেই যেখানে নগর পরিকল্পনা, অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হবে, সেই নগর মডেল বাংলাদেশের আগামী দিনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
এই নিবন্ধে বাংলাদেশে নীল নগর ধারণার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
নীল নগর কী
নীল নগরে পানি থাকে নগর পরিকল্পনা, অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রে। সাধারণভাবে শহরের বৃষ্টির পানি দ্রুত সরিয়ে দেওয়া, নদী ও খালকে বাধা হিসেবে বিবেচনা করা কিংবা ভরাট করে ফেলার পরিবর্তে নীল নগর পানি সংরক্ষণ, ব্যবস্থাপনা এবং পরিকল্পিত ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেয়।
এই ধারণা অনেকাংশে চীনের “স্পঞ্জ সিটি” মডেল থেকে অনুপ্রাণিত, যেখানে পানি শোষণকারী ভূমি, প্রাকৃতিক জলধারণ ব্যবস্থা, বৃষ্টির বাগান এবং জলাধারের মাধ্যমে শহর অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি ধারণ করে এবং ধীরে ধীরে তা নির্গত করে। এর ফলে বন্যার ঝুঁকি কমে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনরুদ্ধার হয় এবং শহরের তাপমাত্রাও নিয়ন্ত্রণে থাকে।
কেন বাংলাদেশ এই মডেলের জন্য উপযুক্ত
বিশ্বের খুব কম দেশই বাংলাদেশের মতো নীল নগর ধারণার জন্য উপযুক্ত। এর পেছনে দুটি প্রধান কারণ রয়েছে: একদিকে দেশের জলবায়ুজনিত ঝুঁকি, অন্যদিকে পানিকে ঘিরে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। ঝুঁকির দিক থেকে দেখা যায়, বর্ষা মৌসুমে দেশের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ ভূমি বন্যার ঝুঁকিতে থাকে। এর পেছনে শুধু প্রাকৃতিক কারণ নয়, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও নীতিগত দুর্বলতাও দায়ী।
ঢাকার সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে শত শত প্রাকৃতিক খাল ও জলাভূমি হারিয়ে গেছে, যেগুলো একসময় শহরের পানি নিষ্কাশনের গুরুত্বপূর্ণ পথ ছিল। খুলনায় একসময়ের প্রধান জলনিষ্কাশন পথ ময়ূর নদী অবৈধ দখল ও বর্জ্য ফেলার কারণে সংকুচিত হয়েছে। ফলে শহরে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার সমস্যা তৈরি হচ্ছে। যেখানে প্রাকৃতিকভাবে পানি শোষণের সক্ষমতা থাকা মাটি দ্রুত কংক্রিটে পরিণত হচ্ছে, সেখানে বিদ্যমান পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। এর ফল হচ্ছে প্রতিবছর জলাবদ্ধতা, স্থির পানি, রোগব্যাধি এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি।
অন্যদিকে সম্ভাবনার দিক থেকে বাংলাদেশ এমন এক সামুদ্রিক সম্পদের ওপর অবস্থান করছে, যার পূর্ণ ব্যবহার এখনো শুরু হয়নি। আন্তর্জাতিক রায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগরে প্রায় ১ লাখ ১৯ হাজার বর্গকিলোমিটারের একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল নিশ্চিত হয়েছে। প্রায় ৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলজুড়ে রয়েছে চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা বন্দর। বর্তমানে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণাধীন রয়েছে।
মৎস্যসম্পদ, নৌপরিবহন, উপকূলীয় পর্যটন এবং সমুদ্রভিত্তিক জ্বালানি নিয়ে গঠিত নীল অর্থনীতি ইতোমধ্যে ১ কোটি ৭০ লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত। তবে এই খাত এখনো তার পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে পারেনি। এর পেছনে অন্যতম কারণ দেশের অভ্যন্তরীণ শহরগুলোর মতোই পানির অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা।
নীল নগর ধারণার মূল শিক্ষা হলো, বাংলাদেশের বন্যা সমস্যা এবং সামুদ্রিক অর্থনীতির অপূর্ণ ব্যবহার দুটি আলাদা সমস্যা নয়। উভয়ের পেছনে রয়েছে পানিকে কেন্দ্র করে শহর পরিকল্পনার ব্যর্থতা। একটি সমন্বিত পানি ভিত্তিক নগর পরিকল্পনা এই দুই ক্ষেত্রেই পরিবর্তন আনতে পারে।
পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত শহর
বাংলাদেশের কয়েকটি শহর নীল নগর ধারণার জন্য বিশেষভাবে উপযোগী। খুলনায় ইতোমধ্যে স্পঞ্জ সিটি ধারণা নিয়ে গবেষণা হয়েছে, যেখানে ময়ূর নদীর পুনরুদ্ধার, পানি শোষণকারী উন্মুক্ত স্থান এবং নদীতীরবর্তী এলাকাকে শুকনো মৌসুমে বিনোদন ক্ষেত্র এবং বর্ষায় জলাধার হিসেবে ব্যবহারের প্রস্তাব রয়েছে। নারায়ণগঞ্জ, যা একসময় “বাংলার ডান্ডি” নামে পরিচিত ছিল এবং শীতলক্ষ্যা ও বুড়িগঙ্গা নদীর সঙ্গে যুক্ত, সেখানে খাল পুনরুদ্ধারের কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ আরও বিস্তৃত করা সম্ভব।
দেশের প্রধান বন্দরনগরী চট্টগ্রামে রয়েছে সামুদ্রিক অর্থনীতির বিশাল সম্ভাবনা। একই সঙ্গে জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধসের মতো সমস্যাও রয়েছে, যা নীল অবকাঠামোর মাধ্যমে মোকাবিলা করা যেতে পারে। বরিশাল, যাকে প্রায়ই “পূর্বের ভেনিস” বলা হয়, তার নদীভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আবারও নগর পরিবহন ও বাণিজ্যের মূল ভিত্তি হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।
বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন সমুদ্রসৈকতের শহর কক্সবাজারও অপরিকল্পিত হোটেল নির্মাণের পরিবর্তে উপকূলীয় পরিবেশ সংরক্ষণভিত্তিক পর্যটন মডেলের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।
অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের নীল অর্থনীতির সম্ভাবনার পক্ষে পরিসংখ্যানগুলো যথেষ্ট শক্তিশালী। ইলিশ মাছের অর্থনীতি একাই দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় এক শতাংশে অবদান রাখে। চট্টগ্রাম বন্দর দেশের মোট বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ পরিচালনা করে। জাহাজ নির্মাণ শিল্প প্রায় ২০০ কোটি ডলারের একটি খাতে পরিণত হয়েছে। কক্সবাজার, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ এবং কুয়াকাটার পরিবেশবান্ধব পর্যটন খাত প্রতিবছর লাখো পর্যটক আকর্ষণ করে, যদিও এই খাতগুলো এখনো তাদের পূর্ণ সক্ষমতার নিচে রয়েছে।
তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। গভীর সমুদ্রবন্দরের সক্ষমতা এখনো সীমিত। মৎস্য খাতে আধুনিক নৌযান ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়। সামুদ্রিক খাতে কর্মরত জনবলের মাত্র দুই শতাংশের আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ রয়েছে। নীল অর্থনীতি সংশ্লিষ্ট খাতে সরকারি ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদনের মাত্র অর্ধ শতাংশের কাছাকাছি। এ ছাড়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে দায়িত্ব বিভক্ত থাকায় সমন্বয়ের অভাব রয়েছে এবং এখনো কোনো কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান নেই। অতিরিক্ত মাছ আহরণ, প্লাস্টিক দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন এই সম্পদের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করছে।
সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ
নীল নগরের এই সম্ভাবনা বাস্তবায়নের জন্য সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। উপকূলীয় ও বদ্বীপ অঞ্চলের প্রতিটি শহরের মাস্টারপ্ল্যানে পানি সংবেদনশীল নকশা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। একটি সমন্বিত নীল অর্থনীতি কর্তৃপক্ষ গঠন, মাতারবাড়ী বন্দর নির্মাণ সম্পন্ন করা এবং এর সঙ্গে আশপাশের শহরগুলোর কার্যকর সংযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। প্রতি বছর অন্তত ১০ হাজার দক্ষ কর্মী তৈরির লক্ষ্যে জাতীয় প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। পাঁচশ মিলিয়ন ডলারের প্রস্তাবিত “ব্লু বন্ড”-এর মতো উদ্ভাবনী অর্থায়ন ব্যবস্থাও বিবেচনা করা যেতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। বিভিন্ন পরীক্ষামূলক প্রকল্পে দেখা গেছে, জনগণের নেতৃত্বে পরিচালিত ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার ও খাল পরিষ্কার কার্যক্রম পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক উভয় সুফল প্রায় দ্বিগুণ বাড়াতে পারে। বাংলাদেশ আর পানির সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে না। দীর্ঘদিনের অবহেলার কারণে শহরগুলো হয় পানিতে ডুবে থাকবে, অথবা পানির সঙ্গে সহাবস্থান করে সেই সম্পদকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করবে।
নীল নগর কোনো কল্পনাভিত্তিক ধারণা নয়। একটি বদ্বীপ রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্য এটি একটি বাস্তবসম্মত এবং জরুরি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।
