সায়েম চৌধুরী
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
দ্য অনিকেত বুলেটিন-এ প্রকাশিত ‘কুমিল্লার হস্তশিল্প: ঐতিহ্যের বুননে আধুনিকতার ক্যানভাস’ শীর্ষক নিবন্ধের ধারাবাহিকতায় এই প্রবন্ধে বিশ্লেষণ করা হয়েছে, কেন কুমিল্লার শতাব্দীপ্রাচীন হস্তশিল্প ঐতিহ্য, বিশেষ করে ময়নামতির পোড়ামাটির শিল্প ও বিজয়পুরের মৃৎশিল্প, এবং চান্দিনার খাদি বয়ন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সেই স্বীকৃতি অর্জন করতে পারেনি, যা বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনীয় কারুশিল্প পেয়েছে। আলোচনার মূল উদ্দেশ্য হলো, এই শিল্পগুলোর প্রকৃত ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক মূল্য এবং সেই মূল্যকে বৈশ্বিক পরিসরে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তার মধ্যে বিদ্যমান ব্যবধান চিহ্নিত করা। পাশাপাশি, ঐতিহ্যভিত্তিক ব্র্যান্ড নির্মাণে ইউরোপ ও ভারতের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশ কী শিক্ষা নিতে পারে, তা পর্যালোচনা করা হয়েছে।
গবেষণার প্রধান পর্যবেক্ষণ স্পষ্ট। কুমিল্লার হস্তশিল্প এমন এক ঐতিহাসিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যা বিশ্বের বহু সুপরিচিত কারুশিল্প অঞ্চলের সঙ্গে তুলনীয়। সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতকের বৌদ্ধ বিহারকেন্দ্রিক শিল্পধারা, ১৯৬১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে গড়ে ওঠা বিজয়পুরের সমবায়ভিত্তিক মৃৎশিল্প এবং ১৯২১ সালে মহাত্মা গান্ধীর সফরের সঙ্গে সম্পর্কিত চান্দিনার খাদি ঐতিহ্য এই উত্তরাধিকারের সাক্ষ্য বহন করে।
তবু এসব শিল্প আজও বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক ব্র্যান্ডিংয়ের মূলধারায় স্থান করে নিতে পারেনি। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণে রপ্তানি বৃদ্ধি ও সমবায়ের টিকে থাকার প্রশ্ন তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে; অথচ ঐতিহ্যভিত্তিক বর্ণনা নির্মাণ, প্রত্যয়ন ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বিপণন অবকাঠামো গড়ে তোলার মতো বিষয়গুলো পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি। ফলে আঞ্চলিক কারুশিল্পকে জাতীয় পরিচয়ের আন্তর্জাতিক প্রতীকে রূপ দেওয়ার প্রক্রিয়া অসম্পূর্ণ থেকে গেছে।
বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার উপযোগী সমৃদ্ধ ঐতিহ্য
সমস্যা কারুশিল্পে নয়। ময়নামতির প্রত্নস্থলে আবিষ্কৃত পোড়ামাটির ফলক ও ভাস্কর্য শতাব্দীব্যাপী শিল্পসৃজনের উৎকর্ষের সাক্ষ্য দেয়। অন্যদিকে পাল সম্প্রদায়ের হাতে সংরক্ষিত বিজয়পুরের মৃৎশিল্প ইতোমধ্যে ইউরোপ ও জাপানের বাজারে পৌঁছে আন্তর্জাতিক সম্ভাবনারও পরিচয় দিয়েছে।
চান্দিনার খাদিও একইভাবে এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার বহন করে। উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনের সময় আত্মনির্ভরতার প্রতীক হিসেবে যে খাদির পরিচিতি গড়ে উঠেছিল, পরবর্তীকালে বিবি রাসেলের মতো নকশাবিদদের উদ্যোগে তা নতুন রূপ পেয়েছে এবং বাংলাদেশের স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচয়ের দাবিদার এক বস্ত্রে পরিণত হয়েছে। ঘাটতি শিল্পে নয়; ঘাটতি রয়েছে শিল্পকে ঘিরে প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয়। ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) স্বীকৃতি, সমন্বিত আন্তর্জাতিক বিপণন, জাদুঘরভিত্তিক অংশীদারত্ব এবং উৎপত্তিস্থানের সঙ্গে পণ্যের পরিচয়কে স্থায়ীভাবে যুক্ত করার কার্যকর বর্ণনাই এখনও অনুপস্থিত।
কারুশিল্পের ব্র্যান্ড নির্মাণে ইউরোপের মডেল
ইউরোপের বহু দেশ দীর্ঘদিন ধরেই কারুশিল্পের ঐতিহ্যকে কেবল বাণিজ্যিক পণ্য নয়, রাষ্ট্রীয় সাংস্কৃতিক সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে। ইতালি ও ফ্রান্সের মতো দেশগুলো মুরানো কাচ কিংবা লিমোজ পোর্সেলিনের মতো আঞ্চলিক কারুশিল্পকে আইনগতভাবে উৎপত্তিস্থানের স্বীকৃতি, জাদুঘরকেন্দ্রিক প্রচার এবং সাংস্কৃতিক পর্যটনের সঙ্গে সংযুক্ত করে আন্তর্জাতিক মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।
এই স্বীকৃতি ব্যবস্থার কার্যকারিতা অনেকটা উৎকৃষ্ট মানের ওয়াইন বা পনিরের উৎপত্তিস্থানভিত্তিক সুরক্ষার মতো। পণ্যের উৎপত্তিস্থানই তার মূল মূল্য সংযোজনের অংশ হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে সরকার আন্তর্জাতিক প্রদর্শনী ও বাণিজ্য মেলায় ধারাবাহিকভাবে অংশগ্রহণের মাধ্যমে এসব কারুশিল্পকে বিশ্ববাজারে দৃশ্যমান রাখে। ফলে ঐতিহ্য সংরক্ষণ বিচ্ছিন্ন কোনো প্রকল্প নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে পরিণত হয়েছে।
ভারতের ভৌগোলিক নির্দেশক ব্যবস্থার সাফল্য
আঞ্চলিক বাস্তবতায় ভারতের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ। বেনারসি রেশম, কাশ্মীরি পশমিনা এবং মধুবনী চিত্রকলার মতো ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্প ভারতের ভৌগোলিক নির্দেশক ব্যবস্থার আওতায় নিবন্ধিত হয়েছে। এর ফলে এসব পণ্য আইনগত সুরক্ষা পেয়েছে এবং নির্দিষ্ট অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত একটি স্বতন্ত্র আন্তর্জাতিক পরিচয় গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।
ভারতের কেন্দ্রীয় ও অঙ্গরাজ্য সরকার রপ্তানি উন্নয়ন পরিষদ, কারুশিল্প জাদুঘর এবং সাংস্কৃতিক কূটনীতির বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে এসব শিল্পকে ধারাবাহিকভাবে আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরে। বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য মেলা ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে এসব ঐতিহ্যের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়। ফলস্বরূপ ইউরোপ বা উত্তর আমেরিকার ভোক্তারাও আজ অঞ্চলভিত্তিক এই কারুশিল্পগুলোকে নাম ধরে চিনতে পারেন। এই স্বীকৃতি স্বতঃস্ফূর্তভাবে তৈরি হয়নি; দীর্ঘমেয়াদি ও পরিকল্পিত নীতিগত বিনিয়োগের ফল।
কোথায় পিছিয়ে বাংলাদেশ
বাংলাদেশ এখনো কুমিল্লার হস্তশিল্পকে কেন্দ্র করে সমমানের কোনো কাঠামো গড়ে তুলতে পারেনি। বিজয়পুরের মৃৎশিল্প বা চান্দিনার খাদি আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত জিআই ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি, যেমনটি ভারত বা ইউরোপের বহু কারুশিল্পের ক্ষেত্রে দেখা যায়।
রপ্তানি কার্যক্রম থাকলেও তা প্রধানত সমবায় বা অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত কোনো কৌশল এখনও গড়ে ওঠেনি, যা এসব শিল্পকে সাংস্কৃতিক পর্যটন, নকশা সহযোগিতা কিংবা ঐতিহ্যভিত্তিক সাংস্কৃতিক কূটনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে পারে। নীতিনির্ধারণেও এসব শিল্পকে মূলত স্থানীয় জীবিকার অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে; জাতীয় সাংস্কৃতিক সম্পদ হিসেবে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডে পরিণত করার প্রচেষ্টা এখনও সীমিত।
ইউনেস্কোর নীতিমালার আলোকে মূল্যায়ন
অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ বিষয়ে ইউনেস্কোর দৃষ্টিভঙ্গি চারটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব দেয়: সম্প্রদায়ের সক্রিয় অংশগ্রহণ, ঐতিহ্যের নথিভুক্তকরণ, নতুন প্রজন্মের কাছে জ্ঞান হস্তান্তর এবং আন্তর্জাতিক দৃশ্যমানতা।
এই মানদণ্ডে বিচার করলে কুমিল্লার হস্তশিল্প সম্প্রদায়ভিত্তিক সংরক্ষণ ও উত্তরাধিকার হস্তান্তরের ক্ষেত্রে যথেষ্ট শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। বিশেষ করে পাল সম্প্রদায়ের মতো পরিবারগুলোর মধ্যে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এই ঐতিহ্য বহমান রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক দৃশ্যমানতার ক্ষেত্রে বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। ইউনেস্কোর স্বীকৃতি অর্জনের উদ্যোগ, আন্তর্জাতিক তালিকাভুক্তি এবং সেই স্বীকৃতিকে কেন্দ্র করে কার্যকর ব্র্যান্ড নির্মাণ এখনও পর্যাপ্তভাবে বিকশিত হয়নি।
উপসংহার
কুমিল্লার হস্তশিল্পের সবচেয়ে বড় সংকট ইতিহাস বা স্বকীয়তার অভাব নয়; সংকট হলো এমন নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অভাব, যা ঐতিহ্যকে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডে রূপ দিতে পারে। ইউরোপ ও ভারতের অভিজ্ঞতা দেখায়, আইনগত সুরক্ষা, ধারাবাহিক সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং আন্তর্জাতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয়ই একটি আঞ্চলিক কারুশিল্পকে বিশ্বপরিচিত সাংস্কৃতিক পরিচয়ে উন্নীত করে।
বাংলাদেশ যদি এই ব্যবধান দূর করতে চায়, তবে কুমিল্লার পোড়ামাটির শিল্প, মৃৎশিল্প এবং খাদিকে শুধু রপ্তানিপণ্য হিসেবে নয়, জাতীয় সাংস্কৃতিক সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। সেই স্বীকৃতির ভিত্তিতেই গড়ে উঠতে পারে একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড, যা দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং সৃজনশীল ঐতিহ্যকে বিশ্বমঞ্চে নতুন মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করবে।
তথ্যসূত্র
The Oniket Bulletin. Comilla’s Handicrafts: Weaving Modernity into a Canvas of Tradition. https://bulletin.oniket.org/art-literature-history-national-heritage/comillas-handicrafts-weaving-modernity-into-a-canvas-of-tradition/editor/
