ফারাহ জেহির
নির্বাহী সম্পাদক, অনিকেত বুলেটিন
শিক্ষা একটি মেরিট গুড, অর্থাৎ সমাজের সামগ্রিক কল্যাণের জন্য অপরিহার্য সেবা। পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য যা-ই হোক, প্রতিটি শিশু শিক্ষা পাক, সমাজ তা চায়। বিদ্যালয় ফি নিলেও সেই লক্ষ্যপূরণে ভূমিকা রাখবে, এটাই প্রত্যাশিত। ঢাকার নামী ইংরেজি মাধ্যম প্রতিষ্ঠান থেকে জেলা শহরের ছোট কিন্ডারগার্টেন পর্যন্ত বাংলাদেশের বেসরকারি বিদ্যালয়গুলো এখন দেশের শিশুদের একটি বড় ও ক্রমবর্ধমান অংশকে শিক্ষা দিচ্ছে।
প্রশ্ন হলো, তারা কি দেশের সেবা করে নিজেদের জায়গা অর্জন করেছে, নাকি অভিভাবকদের বাধ্য হয়ে ঢুকতে হওয়া একটি বাজারে মুনাফা সর্বোচ্চ করার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এ প্রশ্নের উত্তর সরাসরি টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট ৪ (এসডিজি ৪) বাস্তবায়নে বাংলাদেশের অঙ্গীকারের সঙ্গে যুক্ত, যা সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার কথা বলে।
বেসরকারি বিদ্যালয়ের অবদান
আলোচনার ন্যায্য সূচনা এই স্বীকৃতি দিয়ে যে বেসরকারি বিদ্যালয় বাস্তব শূন্যতা পূরণ করেছে। সরকারি শ্রেণিকক্ষ যেখানে উপচে পড়া ভিড়ে ঠাসা এবং মান অসম, সেখানে বহু অভিভাবক বেসরকারি বিকল্পের দিকে ঝুঁকেছেন, আর বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান ভালো ফল ও শৃঙ্খলাবদ্ধ পাঠদানের মাধ্যমে নিজেদের প্রমাণ করেছে। বিতর্ক ক্লাব, বিজ্ঞানমেলা ও ত্রাণ সংগ্রহ কর্মসূচি, যার অনেকটাই শিক্ষার্থীরা নিজেরাই আয়োজন করে, এমন নাগরিক অভ্যাস গড়ে তোলে যা কেবল পরীক্ষার মাধ্যমে তৈরি হয় না। কিছু বিদ্যালয় সীমিত আয়ের পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তি বা ফি মওকুফের সুযোগও রেখেছে।
তবে বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোর নিজস্ব উদ্যোগে পরিচালিত নিয়মিত সামাজিক দায়বদ্ধতার নথিভুক্ত রেকর্ড অত্যন্ত ক্ষীণ। শিক্ষা সংক্রান্ত সবচেয়ে দৃশ্যমান কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) আসে ব্যাংক ও কর্পোরেট ফাউন্ডেশনগুলোর কাছ থেকে, যারা বৃত্তি দেয়, যার অনেকটা গ্রামীণ ও নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট। বিদ্যালয়গুলো সমাজের সঙ্গে সাধারণত অনানুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হয়, কখনো কোনো শিক্ষক বা প্রাক্তন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত উদ্যোগে, বাজেট ও পরিমাপযোগ্য ফলাফলসহ প্রকাশিত কোনো কর্মসূচির মাধ্যমে নয়। স্বচ্ছতার এই ঘাটতির কারণে খাতটি বাণিজ্য নয়, আদর্শের তাগিদে কাজ করে, এমন দাবি করা কঠিন হয়ে পড়ে। নীতিগত হস্তক্ষেপের দাবি রাখে এমন একাধিক ফাঁকের মধ্যে এটাই প্রথম।
বিপক্ষের যুক্তি: পণ্য হিসেবে শিক্ষা
বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়ে মাসিক টিউশন ফি আট হাজার থেকে ত্রিশ হাজার টাকা পর্যন্ত, এর ওপর রয়েছে সেশন চার্জ ও বিবিধ খরচ। অভিভাবকেরা জানিয়েছেন, অভিযোগ নিয়ে যাওয়ার মতো কোনো সর্বজনীন কর্তৃপক্ষ নেই। এসব বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী প্রাইভেট কোচিংয়ের ওপরও নির্ভরশীল, যা ইঙ্গিত দেয় যে উচ্চ ফি সব সময় আনুপাতিক হারে শ্রেণিকক্ষের শিক্ষা নিশ্চিত করে না। শিক্ষা বিষয়ক পর্যবেক্ষকেরা সতর্ক করেছেন, কিছু প্রতিষ্ঠান শিক্ষাকে পণ্য হিসেবে দেখছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ভর্তি নীতিমালায় ফির সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করেছে। ২০২৬-২০২৭ শিক্ষাবর্ষের একাদশ শ্রেণি ও আলিম পর্যায়ের নীতিমালায় ভর্তি ও সেশন চার্জের সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, সব খরচ নোটিশ বোর্ড ও ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য ফি মওকুফে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে হাইকোর্ট পুনর্ভর্তি ফি নিষিদ্ধ করেছে এবং মন্ত্রণালয় স্বচ্ছতা বিষয়ক নির্দেশিকা জারি করেছে। তবে ওই মামলার আবেদনকারী উল্লেখ করেছেন, অনুরূপ নিষেধাজ্ঞা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালায় আগে থেকেই ছিল এবং হাজার হাজার প্রতিষ্ঠান তা প্রকাশ্যে লঙ্ঘন করছে। দুর্বলতা আসলে প্রয়োগে। এটাই দ্বিতীয় ফাঁক: সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে, কিন্তু সেই সীমা মানা হচ্ছে কি না তা তদারকির এবং লঙ্ঘনের শাস্তি দেওয়ার কোনো নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা নেই।
নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য ও অসংগতি
২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতে অভিন্ন মূল পাঠ্যবিষয়ের কল্পনা করা হয়েছিল, যেখানে বাংলা, গণিত, বিজ্ঞান ও বাংলাদেশ স্টাডিজ সব ধারায় পড়ানো হবে এবং ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয় তদারকির জন্য একটি স্বাধীন সংস্থা থাকবে। এসব সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি, মূলত এ কারণে যে দেশে একটি সমন্বিত শিক্ষা আইন পাস হয়নি, যা সুপারিশগুলোকে আইনি শক্তি দিতে পারত। ফলে বহু বেসরকারি বিদ্যালয় নিবন্ধনের শর্ত পূরণ করলেও বাস্তবে তদারকি থাকে শিথিল।
সবার জন্য অভিন্ন জাতীয় ভিত্তির লক্ষ্য এমন ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খায় না, যেখানে বিত্তবান পরিবার আলাদা একটি পাঠ্যক্রম কিনে নিতে পারে। এটাই তৃতীয় এবং সবচেয়ে কাঠামোগত ফাঁক, কারণ আইনি ভিত্তিহীন নীতি শুভেচ্ছার ওপর নির্ভর করে। দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা শিক্ষা আইন পাস হলে ইংরেজি মাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলো একটি অভিন্ন নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর আওতায় আসত এবং নিয়ম লঙ্ঘিত হলে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয় ও আদালত একটি স্পষ্ট ভিত্তি পেত।
শহর ও গ্রামে নৈতিক প্রভাব
এই মূল্যায়ন জাতীয় জরিপের তথ্যের ওপর নয়, নীতিগত পর্যবেক্ষণের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। শহরে অভিজাত বেসরকারি শিক্ষা আত্মবিশ্বাস, বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা গড়ে তুলতে পারে, আবার সামাজিক দূরত্বও বাড়াতে পারে, কারণ যে শিশুরা ভিন্ন পটভূমির সমবয়সীদের সঙ্গে খুব কমই মেশে, তারা শিক্ষাকে আগলে রাখার ব্যক্তিগত সম্পদ হিসেবে দেখতে শিখতে পারে। গ্রামাঞ্চলে স্বল্প ফির কিন্ডারগার্টেন ও সম্প্রদায়ের সহায়তায় চলা বিদ্যালয় এমন জায়গায় শিশুদের শিক্ষার আওতায় আনে, যেখানে সরকারি প্রতিষ্ঠান দূরে। কিন্তু মান অসম, আর যেসব পরিবার সঞ্চয় ভেঙে ফি দেয়, তারা এমন ফল কিনছে যা যাচাই করা কঠিন। ঝুঁকিটা হলো শহর ও গ্রামের তরুণদের মধ্যে ব্যবধান বেড়ে যাওয়া। এই প্রবণতা এসডিজি ১০-এর পরিপন্থী, যা অসমতা কমানোর কথা বলে, এবং লক্ষ্যমাত্রা ৪.৫-এরও বিরোধী, যা আয় ও অবস্থানভেদে শিক্ষায় বৈষম্য দূর করার আহ্বান জানায়।
নীতি ও টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের প্রয়োগ
ভর্তি নীতিমালার ফির সীমা ও প্রকাশের বাধ্যবাধকতা একাদশ শ্রেণি ও আলিম পর্যায় থেকে বেসরকারি শিক্ষার সব স্তরে সম্প্রসারিত হওয়া উচিত। ২০২৬ সালে জারি করা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নির্দেশিকা শিক্ষা আইনের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন, যার সঙ্গে থাকবে মন্ত্রণালয়ের কাছে বার্ষিক আর্থিক বিবরণী জমা দেওয়ার বিধান। একটি সর্বজনীন নিবন্ধনের মাধ্যমে কর্পোরেট ও ব্যাংকের অর্থায়নে চলা বৃত্তি কার্যক্রম বিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে, যাতে সহায়তা গ্রামীণ ও নারী শিক্ষার্থীদের কাছেই পৌঁছায়, যাদের জন্য তা উদ্দিষ্ট।
এসডিজি ৪ সমতাভিত্তিক প্রবেশাধিকার ও মানসম্মত শিখনের প্রধান মানদণ্ড দেয়। এসডিজি ১০ সমতার পরীক্ষা নিয়ে আসে, অর্থাৎ শিক্ষা শহুরে বিত্তবান ও গ্রামীণ দরিদ্রের মধ্যকার দূরত্ব কমাচ্ছে, না বাড়াচ্ছে। এসডিজি ১৬-এর লক্ষ্যমাত্রা ১৬.৬ কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠানের যে মানদণ্ড ঠিক করে, তা নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বিদ্যালয়, উভয়ের জন্যই প্রযোজ্য। এসডিজি ১৭ অংশীদারত্বের ভিত্তিতে মন্ত্রণালয়, বিদ্যালয়ের মালিক, কর্পোরেট দাতা ও অভিভাবকদের একটি যৌথ ব্যবস্থার পক্ষে যুক্তি দেয়।
উপসংহার
একটি সমন্বিত শিক্ষা আইন, একটি স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং বৃত্তি ও সামাজিক কর্মসূচি নিয়ে বার্ষিক প্রতিবেদন শুভেচ্ছাকে জবাবদিহিমূলক চর্চায় রূপ দিতে পারে। বেসরকারি বিদ্যালয়গুলো কেবল মুনাফা সর্বোচ্চকারী প্রতিষ্ঠান নয়, কিন্তু যে খাত লক্ষ লক্ষ শিশুকে শিক্ষা দিচ্ছে, তার ওপর একটি জনদায়িত্ব বর্তায়, যা সে এখনো আনুষ্ঠানিক রূপ দেয়নি। পরীক্ষা হলো, খাতটির উদ্বৃত্ত শিক্ষার উদ্দেশ্যে, প্রতিটি শিশুর জন্য, প্রতিটি জেলায় দৃশ্যমানভাবে পুনর্বিনিয়োগ হচ্ছে কি না।
