নাঈমা অনামিকা
অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
দেশজুড়ে টিকাদান কর্মসূচি চলমান থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিওএইচও)-এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিলের মধ্যে ১৯ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন এবং প্রায় তিন হাজার নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে ১৬৬টি সন্দেহভাজন মৃত্যুর ঘটনাও সামনে এসেছে, যার অধিকাংশই শিশু। আক্রান্তদের ৯০ শতাংশের বেশি এক থেকে ১৪ বছর বয়সী, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর সতর্কবার্তা।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, পরিস্থিতির অবনতির পেছনে শুধু ভাইরাসের সংক্রমণশক্তিই নয়, বরং স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতাও বড় ভূমিকা রাখছে। ডব্লিওএইচও-এর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বর্তমান প্রাদুর্ভাব বাংলাদেশের হাম নির্মূলের পথে অর্জিত অগ্রগতিকে পিছিয়ে দিচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। অথচ এই রোগ সম্পূর্ণরূপে প্রতিরোধযোগ্য, যদি কার্যকর টিকাদান নিশ্চিত করা যায়।
নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সমন্বয়হীনতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। জাতীয় টিকাদান কারিগরি উপদেষ্টা গোষ্ঠী ও জাতীয় যাচাইকরণ কমিটির যৌথ সভায় বিশেষজ্ঞরা দ্রুত একটি বহুপক্ষীয় কমিটি গঠনের সুপারিশ করলেও তা বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এমনকি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়ে এই সুপারিশ সম্পর্কে অবগতির ঘাটতির অভিযোগও উঠেছে। অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (DGHS) নীরবতা এবং টিকাদান কর্মসূচির কোনো মুখপাত্র না থাকা তথ্যপ্রবাহে অস্বচ্ছতা তৈরি করছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠেছে মৃত্যুর পরিসংখ্যান নিয়ে। শুধুমাত্র যেসব ক্ষেত্রে ল্যাবরেটরি পরীক্ষা সম্ভব হয়েছে, সেগুলোই ‘নিশ্চিত’ মৃত্যু হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। ফলে পরীক্ষার কিটের ঘাটতির কারণে অনেক মৃত্যুই আনুষ্ঠানিক হিসাবের বাইরে থেকে যাচ্ছে। এতে প্রকৃত পরিস্থিতি আড়াল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা নীতিনির্ধারণে ভুল বার্তা দিতে পারে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, এই প্রাদুর্ভাব অনেকাংশেই প্রতিরোধযোগ্য ছিল। নিয়মিত টিকাদান কাভারেজে ঘাটতি, জনসচেতনতার অভাব এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা মিলেই পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু গণটিকাদান নয়, পাশাপাশি রোগ শনাক্তকরণ, তথ্যস্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও জরুরি।
একটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়! যে কোন দেশে বা রাষ্ট্রে যদি কোন সঙ্কট বা পরিস্থিতির ভয়াবহতার কেন্দ্রবিন্দু হয় শিশুরা, তবে সেক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ ব্যবস্থাপনা, কর্মসূচী এবং সতর্কতা গৃহীত হবে, সাধারণ জনগণের প্রত্যাশা এমনই হয়ে থাকে। পরিস্থিতির পক্ষে আশানুরূপ উদ্যোগ এবং কর্মসূচী দৃশ্যমান না হলে জনমনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া জন্ম নেবে এটা অত্যন্ত স্বাভাবিক।
তাই বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া অপরিহার্য। বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ অনুযায়ী বহুপক্ষীয় কমিটি গঠন, পর্যাপ্ত টেস্টিং কিট সরবরাহ এবং স্বাস্থ্যখাতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে এই সংকট আরও গভীর হতে পারে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া সময়ের দাবি।
