শেখ সেলিম
অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
প্রতি বছর লাখ লাখ বাংলাদেশি কাজের উদ্দেশ্যে দেশের বাইরে পাড়ি জমান। ২০২৫ অর্থবছরে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের পরিমাণ ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছে, যা প্রায়ই অভিবাসনের অর্থনৈতিক সাফল্যের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপিত হয়। রাজনীতিবিদরা এ সাফল্য উদযাপন করেন। অর্থনীতিবিদরা গবেষণায় এর উল্লেখ করেন। উন্নয়ন সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বিষয়টি ইতিবাচকভাবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু এই বড় অঙ্কের রেমিট্যান্সের পেছনে এমন কিছু গভীর এবং প্রায়ই অপরিবর্তনীয় ব্যয় লুকিয়ে থাকে, যা একজন ব্যক্তি, একটি পরিবার, একটি সমাজ এবং একটি দেশের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়, প্রথম রেমিট্যান্স দেশে পৌঁছানোরও বহু আগে। যারা অভিবাসননীতি ও শ্রম অর্থনীতি নিয়ে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেন, তাদের কাছে প্রচলিত এই সাফল্যের গল্প কেবল অসম্পূর্ণ নয়, অনেক ক্ষেত্রেই বিভ্রান্তিকর।
ঋণনির্ভর প্রস্থান অর্থনীতি
বাংলাদেশের অধিকাংশ অভিবাসী শ্রমিকের বিদেশযাত্রা কেবল আশা দিয়ে শুরু হয় না। এর শুরু হয় ঋণ দিয়ে। ওকাপ (OKUP) এবং বিভিন্ন মাঠপর্যায়ের গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় ৭৬ শতাংশ অভিবাসী শ্রমিক বিদেশ যাওয়ার খরচ মেটাতে ঋণ গ্রহণ করেন। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে নিয়োগসংক্রান্ত ব্যয় অত্যন্ত বেশি। এর পেছনে রয়েছে দালাল, সাব এজেন্ট এবং লাইসেন্সধারী রিক্রুটিং এজেন্সির দীর্ঘ শৃঙ্খল, যেখানে প্রতিটি স্তরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়।
উপসাগরীয় কোনো দেশে যেতে একজন শ্রমিককে অনেক সময় আইনগতভাবে নির্ধারিত সর্বোচ্চ ফি’র তিন থেকে ছয় গুণ পর্যন্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়। এই অর্থের জন্য কেউ উচ্চ সুদে ঋণ নেন, কেউ জমি বন্ধক রাখেন, আবার কেউ পারিবারিক সম্পদ বন্ধক দিতে বাধ্য হন। এই ঋণকাঠামোর ফলে বিদেশে কর্মজীবনের প্রথম বছর, অনেক ক্ষেত্রে প্রথম দুই বছরের উপার্জনের বড় অংশই ঋণ পরিশোধে ব্যয় হয়ে যায়।
ফলে এই সময়কালে পরিবারের প্রকৃত আর্থিক লাভ প্রায় শূন্য কিংবা নেতিবাচক থাকে। অথচ শ্রমিক ইতোমধ্যে অভিবাসনের সমস্ত ব্যক্তিগত মূল্য পরিশোধ করেছেন। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা, মানসিক চাপ, কর্মক্ষেত্রের ঝুঁকি এবং অনিশ্চয়তার ভার তিনি বহন করেন। একই সময়ে দেশে সঞ্চিত সুদের কারণে তার আর্থিক লাভ আরও কমে যায় এবং দীর্ঘ সময়ের জন্য স্থগিত থাকে।
রেমিট্যান্স প্রেরণের ব্যয়ফাঁদ
শ্রমিক যখন উপার্জিত অর্থ দেশে পাঠাতে শুরু করেন, তখন ব্যয়ের আরেকটি স্তর সামনে আসে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স পাঠানোর গড় ব্যয় ছিল ৯ দশমিক ৪ শতাংশ। তুলনামূলকভাবে একই সময়ে বৈশ্বিক গড় ছিল ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং দক্ষিণ এশিয়ায় এই হার ছিল ২ দশমিক ৮ থেকে ৫ দশমিক ১ শতাংশের মধ্যে। এটি কোনো সামান্য অদক্ষতা নয়। শুধু ২০২৪ সালেই আঞ্চলিক গড়ের তুলনায় অতিরিক্ত রেমিট্যান্স প্রেরণ ব্যয় হিসেবে বাংলাদেশি অভিবাসীরা আনুমানিক ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বেশি পরিশোধ করেছেন। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এই অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। এসব কেবল পরিসংখ্যান নয়। এই অর্থের মধ্যে রয়েছে পরিশোধ না করা শিক্ষাব্যয়, স্থগিত চিকিৎসা, কিংবা এমন বিনিয়োগ যা কখনো বাস্তবায়িত হয়নি। এগুলো সেই শ্রমিকদের উপার্জন থেকে কেটে নেওয়া অর্থ, যারা অভিবাসন ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত মূল্য আগে থেকেই বহন করে আসছেন।
আবাসন ও নাগরিকত্ব কেনার বিনিয়োগ বিভ্রম
অভিবাসন অর্থনীতির আরেক প্রান্তে রয়েছে এমন এক শ্রেণির প্রস্থান, যাকে প্রায় সর্বত্র “বিনিয়োগ” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাত, পর্তুগাল, কানাডা, যুক্তরাজ্য কিংবা অন্যান্য দেশের তথাকথিত গোল্ডেন ভিসা কর্মসূচির মাধ্যমে আবাসিক অনুমতি বা নাগরিকত্ব অর্জনকারী সচ্ছল বাংলাদেশিদের সাধারণত বিনিয়োগকারী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। তাঁদেরকে বৈশ্বিকভাবে চলাচলকারী নাগরিক হিসেবে বর্ণনা করা হয়, যারা কৌশলগত আর্থিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
এসব কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের জন্য সাধারণত কয়েক লাখ থেকে এক মিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়।কিন্তু এই ধারণাকে প্রশ্ন করা প্রয়োজন। বিদেশে আবাসিক অনুমতি বা নাগরিকত্ব কেনা অর্থনৈতিক অর্থে প্রকৃত বিনিয়োগ নয়। এটি মূলত এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে পুঁজি এবং মানবসম্পদ স্থায়ী বা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের বাইরে স্থানান্তরিত হয়।
গোল্ডেন ভিসা কর্মসূচিতে ব্যবহৃত অর্থ বাংলাদেশের উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি করে না। এটি ঢাকায় কিংবা চট্টগ্রামে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে না। গবেষণা, শিল্পায়ন বা কৃষি উন্নয়নের জন্যও এই অর্থ ব্যবহৃত হয় না।বরং এটি একই সঙ্গে পুঁজি ও দক্ষ মানবসম্পদের বহির্গমন ঘটায়, যা একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে ব্যয়বহুল ক্ষতিগুলোর একটি।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, যে নীতিকাঠামো সাধারণ শ্রমিকদের চলাচলের ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা আরোপ করে, সেই একই কাঠামো অনেক ক্ষেত্রে পুঁজির বহির্গমনকে “বিনিয়োগ” আখ্যা দিয়ে তুলনামূলকভাবে সহনশীল দৃষ্টিতে দেখে।বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থ এমন একটি অভিবাসনব্যবস্থার মাধ্যমে রক্ষা হয় না, যেখানে দরিদ্র শ্রমিকদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ মূল্য আদায় করা হয়, অথচ ধনী পরিবারের জন্য পুঁজি স্থানান্তরের পথকে বিনিয়োগের ভাষায় বৈধতা দেওয়া হয়।
একটি প্রকৃত হিসাব
অভিবাসনের আর্থিক বাস্তবতা নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ও প্রকৃত আলোচনা শুরু করতে হলে বাংলাদেশের প্রচলিত কথোপকথন বদলাতে হবে। রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এটি নিজেই কোনো উন্নয়ন কৌশল নয়। বরং বহু ক্ষেত্রে এটি দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং কর্মসংস্থানের ঘাটতির প্রতিফলন। দেশে যে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা প্রবেশ করে, তার আড়ালে হারিয়ে যায় সেই বিপুল অর্থ, যা নিয়োগ জালিয়াতি, ঋণের সুদ, উচ্চ রেমিট্যান্স প্রেরণ ব্যয় এবং আবাসিক অনুমতি ক্রয় কর্মসূচির মাধ্যমে দক্ষ ও পুঁজিসম্পন্ন নাগরিকদের স্থায়ী প্রস্থানের কারণে দেশ থেকে বেরিয়ে যায়। বাংলাদেশের অভিবাসনের প্রকৃত মূল্য কেবল অর্থের অঙ্কে পরিমাপ করা যায় না।
এটি দৃশ্যমান হয় একটি প্রজন্মের শ্রমজীবী মানুষের সবচেয়ে উৎপাদনশীল বছরগুলোর ক্ষয়ক্ষতিতে, যাদের শ্রমশক্তি প্রকৃত বাজারমূল্যের চেয়ে কম সুবিধায় বিদেশি অর্থনীতির কাছে সমর্পিত হয়েছে। এটি আরও দৃশ্যমান ঋণের বোঝায়, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতায় এবং সেই নীরব সামাজিক বিশ্বাসে, যেখানে দেশত্যাগকেই সুযোগের একমাত্র পথ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু আরেকটি ব্যয় রয়েছে, যা নিয়ে খুব কম আলোচনা হয়।
অভিবাসনের একটি সামাজিক ও নৈতিক মূল্যও রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রবাসী সদস্যের পরিবার তার কঠোর পরিশ্রমে অর্জিত রেমিট্যান্স ভোগ করে, কিন্তু সেই উপার্জনের প্রকৃত মূল্য বা ত্যাগের অংশীদার হয় না। এসব পরিবারকে প্রায় কখনোই প্রবাসী সদস্যের ব্যয়ভার ভাগ করে নেওয়া কিংবা দেশের অর্থনীতিতে সক্রিয় অবদান রাখার জন্য উৎসাহিত করা হয় না। পরিবারের তরুণ সদস্যদের অনেকের কাছে সহজলভ্য রেমিট্যান্স কর্মপ্রচেষ্টা ও দায়িত্ববোধের পরিবর্তে নির্ভরশীলতার সংস্কৃতি তৈরি করে। প্রবাসী সদস্যের প্রতি তাদের অবদান বা দায়বদ্ধতার অনুভূতি দুর্বল হয়ে পড়ে।
এই ধরনের সামাজিক শোষণের মূল্য অনেক সময় প্রবাসী সদস্য নিজেও উপলব্ধি করতে পারেন না কিংবা তা প্রকাশ করতে চান না। বাংলাদেশের উচিত এই মাত্রার নৈতিক অবক্ষয়কে আর স্বাভাবিক হিসেবে মেনে না নেওয়া। একই সঙ্গে আমাদের এটিও উপলব্ধি করতে হবে যে, সময় দ্রুত বদলাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ধারণা ছিল, অন্য দেশের ঘাস সবসময়ই বেশি সবুজ। কিন্তু বাংলাদেশের আয় ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই ঘাসের রংও বদলাতে শুরু করেছে। সম্ভবত খুব শিগগিরই বাংলাদেশ উপলব্ধি করবে যে অন্য পাশের ঘাস আর ততটা সবুজ নেই; সেটিও ধূসর হয়ে উঠছে।
