নাঈমা অনামিকা
অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
২২ মে ২০২৬ প্রথম আলো একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে যার শিরোনাম ছিল,‘বাংলাদেশে ডিজিটাল অ্যাকসেসিবিলিটি: অন্তর্ভুক্তিমূলক ভবিষ্যতের অপরিহার্য শর্ত’।
দেশের সর্বস্তরের মানুষ (শারীরিক প্রতিবন্ধীসহ) ডিজিটাল অ্যাকসেসিবিলিটির অন্তর্ভূক্ত হবে, সর্বক্ষেত্রে সবাই এই সুবিধা ভোগ করবে এবং এটা তাদের মৌলিক অধিকার হিসেবে পরিগণিত হবে, এটাই প্রতিবেদনের তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি এই নীতি বাস্তবায়নে কী কী জটিলতা/ ঘাটতি বা চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হচ্ছে সেগুলোও পর্যায়ক্রমে আলোচনা করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে প্রতিবেদনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং তথ্য সম্বলিত, যেখানে ডিজিটাল অ্যাকসেসিবিলিটির বাস্তবতা, সীমাবদ্ধতা এবং চ্যালেঞ্জ সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সম্পূর্ণ প্রতিবেদনে যে যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে সেসব ক্ষেত্রে আমার নিজস্ব কিছু অভিমত বা ভাবনা রয়েছে যা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করতে চাই।
শুরুতেই প্রতিবেদনের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়গুলোকে আরেকবার ফিরে দেখতে চাই, দেশে ডিজিটাল সেবার দ্রুত সম্প্রসারণকে উন্নয়নের বড় অর্জন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে কিন্তু এই অগ্রগতির মধ্যেও প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, প্রবীণ নাগরিক এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতায় থাকা মানুষের জন্য ডিজিটাল সেবার ব্যবহারযোগ্যতা এখনো প্রশ্নবিদ্ধ। ভাস্কর ভট্টাচার্য্যের লেখাটি সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে এবং ডিজিটাল অ্যাকসেসিবিলিটিকে নাগরিক অধিকারের অংশ হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছে। একইসাথে তিনি বিষয়টির বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা ও বাস্তব চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেছেন।
এবার আমার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী আমি প্রথমেই বিষয়টির বর্তমান অবস্থান এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জগুলো ব্যাখ্যা করতে চাই।
প্রথমত: ডিজিটাল উন্নয়নের প্রচারণা ও বাস্তবতার বৈপরীত্য। দেশে “স্মার্ট বাংলাদেশ” ও ডিজিটাল রূপান্তরের প্রচার জোরালো হলেও বাস্তবে আম্রাক দেখতে পাই অধিকাংশ ডিজিটাল সেবা এখনো অন্তর্ভুক্তিমূলক নয়। দেখা যায় সরকারি ওয়েবসাইট ও অ্যাপের বড় অংশ আন্তর্জাতিক অ্যাকসেসিবিলিটি মানদণ্ড অনুসরণ করে তৈরি হয়নি। ফলে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন থাকলেও একটি বড় জনগোষ্ঠী কার্যত ডিজিটাল সেবার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
দ্বিতীয়ত: প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য এখনো অধিকাংশ ক্ষেত্রে ডিজিটাল বৈষম্য বিদ্যমান। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা স্ক্রিন রিডার ব্যবহার করে অনেক ওয়েবসাইট পরিচালনা করতে পারেন না।
অনলাইন ফরম, বাটন বা নেভিগেশন সঠিকভাবে কাজ না করায় স্বাধীনভাবে সেবা গ্রহণ ব্যাহত হয়। শ্রবণপ্রতিবন্ধীদের জন্য ভিডিওতে ক্যাপশন বা সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ না থাকায় তথ্যপ্রাপ্তি অসম হয়ে পড়ছে। অর্থাৎ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য নতুন ধরনের সামাজিক প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।
তৃতীয়ত: বাংলা ভাষাভিত্তিক প্রযুক্তির যথেষ্ট দুর্বলতা। বাংলা ইউনিকোড ও ফন্ট ব্যবহারের অসংগতি স্ক্রিন রিডারের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়। এজন্য দেখা যায় অনেক ওয়েবসাইটে বাংলা কনটেন্টই প্রযুক্তিগতভাবে মানসম্মত নয়। এর ফলে বাংলা ভাষাভিত্তিক অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রযুক্তি উন্নয়নে বড় ঘাটতি স্পষ্ট হয়।
চতুর্থত: সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ঠিকই আছে, কিন্তু বাস্তবায়ন অত্যন্ত দুর্বল। বাংলাদেশে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগ খুবই সীমিত। আবার ডিজিটাল অ্যাকসেসিবিলিটি নিয়ে বাধ্যতামূলক যে তদারকি বা মূল্যায়ন, তা ব্যবস্থাগত ভাবে এখনো দুর্বল। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে সচেতনতার অভাবও একটি বড় সমস্যা।
পঞ্চমত: “Accessibility by Design” এখনো বাস্তবতায় অনুপস্থিত। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল অ্যাকসেসিবিলিটিকে মূল নকশার অংশ হিসেবে বিবেচনা করে না। সেবা চালুর করার পর সীমিত কিছু পরিবর্তন আনার চেষ্টা করা হয়, যা টেকসই বা সম্পূর্ণ নয়। ফলশ্রুতিতে যা দাঁড়ায় তাহলো, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো শুরু থেকেই বৈষম্যমূলক কাঠামো নিয়ে তৈরি হচ্ছে।
ষষ্ঠত: প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ একেবারেই সীমিত। “Nothing About Us Without Us” নীতির কথা বলা হলেও বাস্তবে প্রযুক্তি উন্নয়নে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা খুব কম। নীতিনির্ধারণ ও প্রযুক্তি উন্নয়নে তাদের অভিজ্ঞতা ও মতামতকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয় না। ফলে বাস্তব ব্যবহারকারীর প্রয়োজন অনেক সময় উপেক্ষিত থেকে যায়।
সপ্তমত: আন্তর্জাতিক অগ্রগতির তুলনায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে ডিজিটাল অ্যাকসেসিবিলিটি আইনগত বাধ্যবাধকতা হলেও বাংলাদেশে এখনো এটি নীতিগত আলোচনার পর্যায়ে সীমিত। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রযুক্তিকে গুরুত্ব দিলেও স্থানীয় বাস্তবায়ন ধীরগতির।
এর পরেও আমি দারুণ ভাবে আশাবাদী এই বিষয়টি নিয়ে। কারণ এত চ্যালেঞ্জ, জটিলতার মধ্যেও কিছু ইতিবাচক দিক কিন্তু পরিলক্ষিত হয়। যেমন-
- a2i-এর মতো উদ্যোগ ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি নিয়ে সচেতনতা তৈরিতে ভূমিকা রাখছে।
- সরকারি পর্যায়ে অ্যাকসেসিবিলিটি নিয়ে আলোচনা বৃদ্ধি পেয়েছে।
- গ্লোবাল অ্যাকসেসিবিলিটি অ্যাওয়ারনেস ডে (GAAD) পালনের মাধ্যমে বিষয়টি জনপরিসরে গুরুত্ব পাচ্ছে।
এখন স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন আসে, এমন পরিস্থিতি নিরসনে সরকারের উদ্যোগগুলো কি হতে পারে,
- সব সরকারি ওয়েবসাইট ও অ্যাপের জন্য বাধ্যতামূলক অ্যাকসেসিবিলিটি নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
- WCAG (Web Content Accessibility Guidelines) মানদণ্ড অনুসরণ নিশ্চিত করতে হবে।
- বাংলা স্ক্রিন রিডার ও ইউনিকোড প্রযুক্তির উন্নয়ন করতে হবে।
- সরকারি কর্মকর্তা ও সফটওয়্যার ডেভেলপারদের প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক এবং সম্প্রসারণ নিশ্চিত করতে হবে।
- প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নীতিনির্ধারণ ও প্রযুক্তি পরীক্ষায় সরাসরি সম্পৃক্ত করতে হবে।
- নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহি ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
পরিশেষে বলতে চাই, বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তর তখনই অর্থবহ হবে, যখন প্রযুক্তি সমাজের প্রতিটি মানুষের জন্য সমানভাবে ব্যবহারযোগ্য হবে। বর্তমানে ডিজিটাল সেবার বিস্তার ঘটলেও অন্তর্ভুক্তিমূলক কাঠামোর ঘাটতি স্পষ্ট। তাই ডিজিটাল অ্যাকসেসিবিলিটিকে অতিরিক্ত সুবিধা নয়, বরং মৌলিক নাগরিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। অন্যথায় প্রযুক্তিগত উন্নয়ন একের পর এক নতুন বৈষম্য তৈরি করবে এবং “স্মার্ট বাংলাদেশ” ধারণা আংশিক জনগোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।
