নাঈমা অনামিকা
অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে শিক্ষা খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। স্বাধীনতার পর যে দেশটি ব্যাপক নিরক্ষরতা, সীমিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং নিম্ন বিদ্যালয়ভিত্তিক অংশগ্রহণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছিল, আজ সেই দেশ প্রাথমিক শিক্ষায় প্রায় সর্বজনীন ভর্তির হার এবং ক্রমবর্ধমান সাক্ষরতার একটি উদাহরণ হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ের এই সাফল্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা, সাক্ষরতার ক্ষেত্রে গভীর আঞ্চলিক বৈষম্য।
জাতীয় গড় সাক্ষরতার হার বাংলাদেশের শিক্ষাগত অগ্রগতির একটি ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরলেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চল, জনগোষ্ঠী এবং সামাজিক শ্রেণির মধ্যে বিদ্যমান ব্যবধানকে আড়াল করে। ফলে প্রশ্ন উঠে, বাংলাদেশের শিক্ষা উন্নয়ন কি সত্যিই অন্তর্ভুক্তিমূলক, নাকি কিছু অঞ্চল দ্রুত এগিয়ে গেলেও অন্য অঞ্চলগুলো এখনও পিছিয়ে রয়েছে? এই বিষয়ে বিস্তারিত জানতে হলে কিছু বিষয় আলোচনা জরুরী। পরিষ্কার একটি ধারনা প্রদানের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোকপাত আবশ্যক।
জাতীয় সাফল্য এবং আঞ্চলিক বাস্তবতার পার্থক্য
বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার বৃদ্ধির পেছনে সরকারি বিনিয়োগ, উপবৃত্তি কর্মসূচি, নারীশিক্ষা উন্নয়ন, বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ এবং এনজিওভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু এই সাফল্য দেশের সব অঞ্চলে সমানভাবে প্রতিফলিত হয়নি। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের মতো অর্থনৈতিকভাবে সক্রিয় অঞ্চলে শিক্ষার সুযোগ, বিদ্যালয়ের ঘনত্ব, প্রযুক্তিগত সুবিধা এবং অভিভাবকদের সচেতনতা তুলনামূলকভাবে বেশি। ফলে এসব অঞ্চলে সাক্ষরতার হারও বেশি।
অন্যদিকে রংপুর, ময়মনসিংহ, উপকূলীয় বরিশাল, চরাঞ্চল ও হাওর অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে শিক্ষা অর্জনের পথে ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা একটি বড় বাস্তবতা। বর্ষাকালে বিদ্যালয়ে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ে, অনেক শিক্ষার্থী মৌসুমি শ্রমে যুক্ত হয় এবং বিদ্যালয়ের কার্যক্রম দীর্ঘ সময় ব্যাহত হয়। ফলে এসব অঞ্চলে শিক্ষাগত অর্জন নগরাঞ্চলের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে থাকে। এই বাস্তবতা প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনও ভৌগোলিক বৈষম্যের প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি।
বৈষম্যের প্রকৃত কারণ: দারিদ্র্য, ভাষা ও অবকাঠামো
- আঞ্চলিক সাক্ষরতার বৈষম্যের অন্যতম প্রধান কারণ অর্থনৈতিক বৈষম্য। দরিদ্র পরিবারগুলোতে শিক্ষা এখনও অনেক ক্ষেত্রে একটি ব্যয় হিসেবে বিবেচিত হয়, বিনিয়োগ হিসেবে নয়। ফলে শিশুদের বিদ্যালয়ে পাঠানোর পরিবর্তে পারিবারিক আয়ে যুক্ত করার প্রবণতা দেখা যায়। উত্তরাঞ্চলের দরিদ্র জেলাগুলোতে এই প্রবণতা বিশেষভাবে দৃশ্যমান। কন্যাশিশুর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল। বাল্যবিবাহ, গৃহস্থালি কাজ এবং সামাজিক রক্ষণশীলতা অনেক পরিবারকে মেয়েদের শিক্ষার পরিবর্তে দ্রুত বিয়ের দিকে উৎসাহিত করে।
- ভাষাগত বৈষম্যও একটি বড় সমস্যা। পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য বাংলা ভাষাভিত্তিক শিক্ষা কার্যত দ্বিতীয় ভাষায় শিক্ষা গ্রহণের সমতুল্য। শিক্ষাবিজ্ঞানের গবেষণা বলছে, মাতৃভাষার পরিবর্তে অপরিচিত ভাষায় শিক্ষার সূচনা করলে শিশুদের শেখার গতি কমে যায় এবং ঝরে পড়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
- অন্যদিকে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা শিক্ষার গুণগত মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। দুর্গম অঞ্চলে বিদ্যালয়ের সংখ্যা কম, শিক্ষক সংকট দীর্ঘস্থায়ী এবং অনেক ক্ষেত্রে শ্রেণিকক্ষ, বিদ্যুৎ ও প্রযুক্তিগত সুবিধার অভাব রয়েছে। ফলে একই জাতীয় শিক্ষানীতি থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার বাস্তব অভিজ্ঞতা অঞ্চলভেদে ভিন্ন হয়ে যায়।
উন্নয়নের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
সাক্ষরতার বৈষম্য কেবল শিক্ষা খাতের সমস্যা নয়; এটি সামগ্রিক উন্নয়নের জন্যও একটি বড় বাধা। যেসব অঞ্চলে সাক্ষরতার হার কম, সেখানে দারিদ্র্যের হার সাধারণত বেশি থাকে। কারণ কম শিক্ষিত জনগোষ্ঠী দক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ কম পায় এবং নিম্ন আয়ের পেশায় সীমাবদ্ধ থাকে। এর ফলে দারিদ্র্য ও নিরক্ষরতার একটি চক্র তৈরি হয়, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলতে থাকে। স্বাস্থ্য খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, শিক্ষিত মায়েরা সন্তানদের স্বাস্থ্য, পুষ্টি এবং টিকাদান সম্পর্কে বেশি সচেতন হন। ফলে নিম্ন সাক্ষরতার অঞ্চলগুলোতে শিশুমৃত্যু, অপুষ্টি এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে। এছাড়া নাগরিক অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা, সরকারি সেবা গ্রহণ এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণও শিক্ষার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। যখন একটি জনগোষ্ঠী পর্যাপ্ত সাক্ষর জ্ঞানসম্পন্ন নয়, তখন তারা রাষ্ট্রের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকেও তুলনামূলকভাবে বঞ্চিত থাকে।
নীতিগত সীমাবদ্ধতা
বাংলাদেশের শিক্ষা নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা হলো অনেক ক্ষেত্রে সব অঞ্চলের জন্য একই ধরনের সমাধান প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু বাস্তবে সব অঞ্চলের সমস্যা এক নয়। ঢাকার একটি বিদ্যালয় এবং কুড়িগ্রামের একটি চরাঞ্চলীয় বিদ্যালয়ের চাহিদা একই হতে পারে না। তবুও বাজেট বরাদ্দ, শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে প্রায়শই একই কাঠামো অনুসরণ করা হয়। ফলে যেসব অঞ্চল ইতোমধ্যে এগিয়ে আছে, তারা আরও এগিয়ে যায়; আর পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলো একই জায়গায় আটকে থাকে। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য সমান বণ্টনের পরিবর্তে ন্যায়ভিত্তিক পদ্ধতি গ্রহণ করা জরুরী যেখানে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলোকে অতিরিক্ত সহায়তা দেওয়া হবে।
উপরের আলোচনার পরে সঙ্গত কারণেই খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দাঁড়ায় – এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের করণীয় কি অথবা সৃষ্ট সমস্যা সমাধানের পথ কি?
শুরুর কার্যক্রম হিসেবে আঞ্চলিক সাক্ষরতার বৈষম্য কমাতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
প্রথমত, পিছিয়ে থাকা অঞ্চলগুলোর জন্য বিশেষ শিক্ষা তহবিল গঠন করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, আদিবাসী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য মাতৃভাষাভিত্তিক বহুভাষিক শিক্ষা সম্প্রসারণ করতে হবে।
তৃতীয়ত, দুর্গম এলাকায় শিক্ষক নিয়োগ ও ধরে রাখার জন্য বিশেষ প্রণোদনা চালু করতে হবে।
চতুর্থত, চর, হাওর এবং উপকূলীয় এলাকায় কমিউনিটি-ভিত্তিক প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষা ও পুনঃসাক্ষরতা কর্মসূচি জোরদার করতে হবে।
পঞ্চমত, ডিজিটাল বৈষম্য কমানোর জন্য গ্রামীণ ইন্টারনেট অবকাঠামো এবং ডিজিটাল সাক্ষরতা কর্মসূচিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
সবশেষে, উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে নীতিনির্ধারণ বাস্তব পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে করা যায়।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের শিক্ষা খাতের সাফল্য নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু জাতীয় সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি পেলেই শিক্ষাগত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয় না। দেশের প্রত্যন্ত চরাঞ্চল, হাওর, উপকূলীয় অঞ্চল এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকাগুলোর বাস্তবতা বিবেচনায় নিলে স্পষ্ট হয় যে আঞ্চলিক বৈষম্য এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সাক্ষরতা কেবল পড়তে ও লিখতে শেখার বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক সুযোগ, সামাজিক ক্ষমতায়ন এবং নাগরিক অংশগ্রহণের ভিত্তি। তাই আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন ও মানবসম্পদ বিকাশের জন্য অপরিহার্য। জাতীয় গড়ের সাফল্যের বাইরে গিয়ে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর দিকে নজর দেওয়া এবং বিশেষ কর্মসূচী বাস্তবায়নই হতে পারে বাংলাদেশের আগামী শিক্ষানীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার।
