ফারাহ জেহির
সম্পাদক, অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
ম্লান হয়ে আসা এক সাংস্কৃতিক স্পন্দন
একসময় বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক জীবনের প্রধান স্পন্দন ছিল নাট্যমঞ্চ। ঢাকার নীলক্ষেতের ছোট ছোট পরীক্ষাধর্মী মঞ্চ থেকে শুরু করে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির ঐতিহ্যবাহী প্রেক্ষাগৃহ, জীবন্ত অভিনয়ের মধ্য দিয়েই সমাজ নিজের বিবেককে যাচাই করত, সংকট নিয়ে বিতর্ক করত এবং শেষ পর্যন্ত নিজের পরিচয়কে নতুনভাবে উপলব্ধি করত।
সেই সময় পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি, তবে তার স্পন্দন এখন অনেকটাই ক্ষীণ। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সামাজিকভাবে সচেতন ও শিল্পভাবনায় উচ্চাভিলাষী আন্দোলন হিসেবে স্বীকৃত বাংলাদেশের নাট্যচর্চা আজ টিকে থাকার লড়াইয়ে নেমেছে। অ্যালগরিদমনির্ভর বিনোদনের বিস্তার, প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতার সংকোচন এবং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত অবহেলা একসঙ্গে মিলে নাট্যশিল্পের অস্তিত্বকেই চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
স্বাধীনতা-পরবর্তী শেকড় ও রাজনৈতিক চেতনা
বাংলাদেশের আধুনিক নাট্যআন্দোলনের জন্ম মূলত বাণিজ্যিক উদ্যোগ হিসেবে নয়; বরং রাজনৈতিক ও সামাজিক চেতনার এক শক্তিশালী প্রকাশ হিসেবে। স্বাধীনতার পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ দশকগুলোতে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়, ঢাকা থিয়েটার এবং আরণ্যক নাট্যদলের মতো অগ্রণী সংগঠনগুলো মঞ্চকে ব্যবহার করেছে স্বৈরশাসনের সমালোচনা, সামাজিক বৈষম্যের বিশ্লেষণ এবং মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত অসাম্প্রদায়িক বাঙালি পরিচয়ের উদযাপনের জন্য।
সৈয়দ শামসুল হকের মতো নাট্যকার এবং আতাউর রহমানের মতো দূরদর্শী নির্দেশকরা নাট্যমঞ্চে এক উচ্চমানের বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তার সংযোজন ঘটান। ফলে বাংলাদেশের নাটক কেবল জনপ্রিয় বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং নিজস্ব মর্যাদাপূর্ণ শিল্পধারায় পরিণত হয়েছে। সত্তর ও আশির দশকের গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলন ঢাকা ছাড়াও বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে নিবেদিতপ্রাণ নাট্যকর্মীদের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে। তাদের বিশ্বাস ছিল, নাটক শুধু শিল্পচর্চা নয়; নাগরিক দায়িত্বও বটে।
লোকজ নাট্যধারার স্বাভাবিক প্রবাহ
শহুরে রাজনৈতিক নাট্যচর্চার পাশাপাশি গ্রামীণ বাংলার গভীরে প্রবাহিত হয়েছে লোকজ পরিবেশনার শক্তিশালী ধারা। শতাব্দীপ্রাচীন যাত্রাপালা, যেখানে গান, অভিনয় এবং সামষ্টিক গল্প বলার ঐতিহ্য একত্রিত হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে গ্রামীণ জনপদে হাজারো দর্শককে উন্মুক্ত মঞ্চের সামনে টেনে এনেছে। একইভাবে বাউল পরিবেশনা, পালাগান এবং চরাঞ্চল ও হাওর অঞ্চলের স্বতন্ত্র আখ্যানভিত্তিক শিল্পধারাগুলোও জীবন্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে বিকশিত হয়েছে। এসব শিল্পধারার জন্য আধুনিক মঞ্চ বা কেন্দ্রীয় অর্থায়নের প্রয়োজন হয়নি। মানুষের জীবন ও সংস্কৃতির ভেতরেই তারা নিজেদের জায়গা তৈরি করেছে।
নগর নাট্যচর্চার কাঠামোগত সংকট
বর্তমানে শহর ও গ্রামের উভয় ধারাই কঠিন চাপে রয়েছে। শহুরে গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলন বহুমাত্রিক সংকটে আক্রান্ত। নাট্যভবনের অবকাঠামোগত অবনতি, টেকসই অর্থায়নের অভাব এবং তরুণ শিল্পীদের চলচ্চিত্র, টেলিভিশন ও ডিজিটাল কনটেন্টের দিকে ঝুঁকে পড়া এই সংকটকে আরও তীব্র করেছে।
যেসব দল একসময় প্রতি সপ্তাহে মঞ্চায়ন করত, তাদের অনেকেই এখন বছরে একটি বা দুটি প্রযোজনার ব্যয় নির্বাহ করতেও সংগ্রাম করছে। টিকিট বিক্রির আয় ক্রমবর্ধমান পরিচালন ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে পারছে না। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে করপোরেট পৃষ্ঠপোষকতাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। অন্যদিকে ঢাকার অনেক নাট্যমঞ্চ হয় বাণিজ্যিক কাজে রূপান্তরিত হচ্ছে, নয়তো অবহেলায় ধীরে ধীরে অচল হয়ে পড়ছে।
গ্রামীণ শিল্পকলার অস্তিত্ব সংকট
লোকজ নাট্যধারার সংকট আরও গভীর। যাত্রাদলগুলো, যারা একসময় গ্রামীণ সংস্কৃতির প্রাণ ছিল, তাদের অনেকেই কার্যত বিলুপ্ত হয়ে গেছে। প্রধান কারণ স্যাটেলাইট টেলিভিশন এবং মোবাইলভিত্তিক স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মের দ্রুত বিস্তার, যা দর্শকদের মনোযোগ নিজেদের দিকে নিয়ে গেছে। ফলে অভিজ্ঞ শিল্পীদের কাছ থেকে নতুন প্রজন্মের কাছে অভিনয় ও পরিবেশনার জ্ঞান হস্তান্তরের যে মৌখিক ধারাবাহিকতা ছিল, তা ভেঙে পড়ছে। জটিল মঞ্চায়ন কৌশল, বিশেষ কণ্ঠপ্রক্ষেপণ পদ্ধতি এবং ঐতিহ্যবাহী চরিত্র নির্মাণের রীতিগুলো এখন প্রবীণ শিল্পীদের স্মৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
জীবন্ত অভিনয়ের অনন্য মূল্য
নাট্যমঞ্চকে রক্ষার আহ্বান কেবল অতীত স্মৃতির প্রতি আবেগ নয়। জীবন্ত অভিনয়ের এমন এক মানবিক ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক মূল্য রয়েছে, যা কোনো পর্দা কখনোই পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করতে পারে না। মঞ্চে দর্শক ও শিল্পী একই বাস্তব স্থানে অবস্থান করেন। এই ঘনিষ্ঠতা মনোযোগ, অনুভূতি এবং সহমর্মিতার এমন এক অভিজ্ঞতা সৃষ্টি করে, যা ডিজিটাল মাধ্যমে সম্ভব নয়। রাজনৈতিক জটিলতা ও সামাজিক বৈষম্যে চিহ্নিত একটি সমাজে ক্ষমতার মুখোমুখি প্রশ্ন তোলা এবং বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মধ্যে সংলাপ তৈরির ক্ষেত্রে নাটকের ভূমিকা এখনো অপরিহার্য।
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও নীতিগত সমাধান
এই অবক্ষয় রোধে জরুরি ভিত্তিতে কাঠামোগত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রথম পদক্ষেপ হতে পারে একটি জাতীয় নাট্য তহবিল গঠন, যা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তভাবে পরিচালিত হবে এবং সম্প্রচার ও স্ট্রিমিং খাত থেকে নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক করের মাধ্যমে অর্থায়িত হবে। এমন তহবিল নাট্যদলগুলোর জন্য একটি স্থিতিশীল আর্থিক ভিত্তি তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও রাজশাহীর মতো প্রধান শহরগুলোর সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় প্রশাসনের ওপর অন্তত একটি মানসম্পন্ন ভর্তুকিপ্রাপ্ত নাট্যমঞ্চ পরিচালনার আইনগত দায়িত্ব থাকা উচিত।
শিক্ষাক্ষেত্রে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার পাঠ্যক্রমে নাট্যশিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন, যাতে নতুন প্রজন্ম জীবন্ত অভিনয়ের শক্তি ও সংবেদনশীলতা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে। গ্রামীণ শিল্পকলার ক্ষেত্রে নথিভুক্তকরণ প্রকল্প, গুরু-শিষ্যভিত্তিক অনুদান এবং উপজেলা পর্যায়ে স্থানীয় সাংস্কৃতিক উৎসব আয়োজনের মাধ্যমে এই অ-বাণিজ্যিক শিল্পধারাগুলোর ক্ষয় রোধ করা সম্ভব।
তৃণমূল উদ্যোগ ও ডিজিটাল অভিযোজন
মঞ্চের আলো জ্বালিয়ে রাখতে দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়; নাগরিক সমাজকেও এগিয়ে আসতে হবে। স্বাধীন ও কমিউনিটিভিত্তিক নাট্যোৎসব আয়োজনের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার বাইরে নতুন সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরি করা যেতে পারে। দর্শকরাও কেবল ভোক্তা হয়ে না থেকে ক্রাউডফান্ডিংয়ের মাধ্যমে স্থানীয় প্রযোজনাগুলোকে সরাসরি সহায়তা করতে পারেন।
একই সঙ্গে ডিজিটাল মাধ্যমকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখার পরিবর্তে নাট্যকর্মীদের সৃজনশীলভাবে ব্যবহার করতে হবে। সংক্ষিপ্ত ভিডিও, মহড়ার অন্তরালের গল্প এবং মঞ্চ প্রস্তুতির নানা দিক তুলে ধরে তরুণ প্রজন্মকে নাটকের প্রতি আগ্রহী করা সম্ভব। নিজস্ব পর্দার অ্যালগরিদম নির্ধারিত আরামের বদলে যদি আমরা সচেতনভাবে অডিটোরিয়ামের জীবন্ত অভিজ্ঞতাকে বেছে নিই, তাহলে সক্রিয় দর্শক সংস্কৃতিকে পুনর্গঠন করা সম্ভব হবে।
নৈতিক কল্পনাশক্তির সুরক্ষা
শেষ পর্যন্ত যে সমাজ নিজের নাট্যচর্চাকে বিলীন হতে দেয়, সেই সমাজ তার নৈতিক কল্পনাশক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হারায়। অন্য মানুষের সত্যকে সরাসরি অনুভব করার এবং তা সম্মিলিতভাবে উপলব্ধি করার ক্ষমতা ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ তার স্বাধীনতা অর্জন করেছে সাংস্কৃতিক চেতনার শক্তিকে ভিত্তি করে। যে মঞ্চ সেই চেতনাকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহন করে এনেছে, তার প্রাপ্য নীরব অবলুপ্তি নয়; বরং এক নতুন পুনর্জাগরণ। নাট্যমঞ্চের আলো নিভে যাওয়ার আগেই সেই পুনর্জাগরণের উদ্যোগ নেওয়াই এখন সময়ের দাবি।
