নাঈমা অনামিকা
কমিশনিং সম্পাদক, অনিকেত বুলেটিন
বাংলাদেশের মহানগরীগুলোর অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনে পথহকার এক অনিবার্য বাস্তবতা। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী কিংবা সিলেট, প্রতিটি নগরেই পথহকাররা নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তারা স্বল্পমূল্যে খাদ্য, পোশাক, গৃহস্থালি সামগ্রী ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহের মাধ্যমে নগর অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। অথচ রাষ্ট্রীয় নীতিমালা ও নগর ব্যবস্থাপনার দৃষ্টিতে এই জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ, অনিরাপদ এবং অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে।
ফলে প্রশ্ন উঠেছে, পথহকাররা কি নগর ব্যবস্থাপনার জন্য সমস্যা, নাকি তাদের ঘিরে বিদ্যমান সংকট আসলে নীতিগত ব্যর্থতারই বহিঃপ্রকাশ? আর তাই বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে আমি বিষয়টিকে বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে সুস্পষ্ট রুপদান করতে চাই।
অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির শক্তিশালী ভিত্তি
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অনানুষ্ঠানিক খাতের গুরুত্ব দীর্ঘদিন ধরেই স্বীকৃত। মোট শ্রমশক্তির একটি বড় অংশ এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। পথহকাররা সেই বৃহৎ অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। ঢাকায় কয়েক লাখ পথহকার প্রতিদিন লাখো মানুষের কাছে কম খরচে পণ্য ও সেবা পৌঁছে দিচ্ছেন। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির বহু মানুষ তাদের দৈনন্দিন চাহিদা পূরণে ফুটপাতের বাজারের ওপর নির্ভরশীল। একই সঙ্গে শহরে আগত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য পথহকারি এমন একটি পেশা, যেখানে অল্প মূলধন নিয়ে দ্রুত আয়ের সুযোগ তৈরি হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষিখাতে অনিশ্চয়তা এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থানের সংকট নগরমুখী মানুষের সংখ্যা বাড়িয়ে তুলেছে। এদের একটি বড় অংশ শেষ পর্যন্ত পথহকারি বা অন্যান্য অনানুষ্ঠানিক পেশায় যুক্ত হচ্ছে। ফলে পথহকারি কেবল একটি ব্যবসা নয়; এটি নগর দরিদ্রদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তার অনানুষ্ঠানিক বিকল্প হিসেবেও কাজ করছে।
নগর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংঘাত
পথহকারদের গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও নগর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক বরাবরই সংঘাতপূর্ণ। ফুটপাত ও জনসাধারণের স্থান পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত রাখার প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, নগর পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতা এবং জনসংখ্যার চাপের কারণে পথহকাররা এসব স্থান দখল করে ব্যবসা পরিচালনা করতে বাধ্য হন।
প্রশাসন প্রায়ই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে ফুটপাত দখলমুক্ত করার চেষ্টা করে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই অভিযান স্থায়ী ফলাফল বয়ে আনে না। কারণ উচ্ছেদের পর হকারদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান বা নির্ধারিত ব্যবসা এলাকা নিশ্চিত করা হয় না। ফলে জীবিকার প্রয়োজনে তারা পুনরায় একই স্থানে ফিরে আসেন। এই পরিস্থিতি স্পষ্টভাবে দেখায় যে, উচ্ছেদমূলক নীতি সমস্যার মূল কারণকে সমাধান করতে ব্যর্থ। বরং এটি প্রশাসন ও হকারদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতকে আরও জটিল করে তোলে।
রাজনৈতিক অর্থনীতি ও ক্ষমতার কাঠামো
পথহকার সমস্যার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর রাজনৈতিক অর্থনীতি। বিভিন্ন গবেষণা ও পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় রাজনৈতিক গোষ্ঠী, প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং অসাধু প্রশাসনিক চক্র পথহকারদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ বা চাঁদা আদায় করে থাকে। এই নিয়ম বহির্ভূত অর্থ সংগ্রহের বিনিময়ে হকারদের ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হয়। ফলে পথহকারদের আইনি অনিশ্চয়তা একটি বিশেষ স্বার্থগোষ্ঠীর জন্য অর্থনৈতিক সুবিধা সৃষ্টি করে। এ কারণে অনেক সময় পথহকারদের আনুষ্ঠানিক নিবন্ধন বা বৈধতার উদ্যোগ প্রত্যাশিত গতিতে এগোয় না। অর্থাৎ পথহকারদের ঘিরে গড়ে ওঠা সংকট কেবল নগর ব্যবস্থাপনার সমস্যা নয়; এটি ক্ষমতা, রাজনীতি এবং অর্থনৈতিক স্বার্থের একটি জটিল সমীকরণের অংশ।
নারী পথহকারদের বিশেষ চ্যালেঞ্জ
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নারী পথহকারদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও তাদের বাস্তবতা পুরুষদের তুলনায় অধিক কঠিন। সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, নিরাপত্তাহীনতা, হয়রানি এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে নারী হকারদের সংগ্রাম আরও বহুমাত্রিক। তবুও পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব পালনের জন্য অনেক নারী এই পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। ফলে পথহকারি এখন শুধু পুরুষকেন্দ্রিক পেশা নয়; এটি নগর অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও পরিণত হয়েছে।
নীতিগত পরিবর্তনের সম্ভাবনা
সাম্প্রতিক সময়ে পথহকার ব্যবস্থাপনায় কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ লক্ষ করা যাচ্ছে। ডিজিটাল নিবন্ধন, পরিচয়পত্র প্রদান এবং নির্ধারিত ভেন্ডিং জোন তৈরির উদ্যোগ নগর ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর করতে পারে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় প্রতীয়মান হয়, পথহকারদের উচ্ছেদ নয় বরং সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নগর অর্থনীতির একটি সংগঠিত অংশে পরিণত করা সম্ভব। ভারতের স্ট্রিট ভেন্ডর আইন কিংবা সিঙ্গাপুরের পরিকল্পিত হকার সেন্টারগুলো তার সফল উদাহরণ। বাংলাদেশেও যদি নিবন্ধনভিত্তিক ব্যবস্থাপনা, নির্দিষ্ট ভেন্ডিং জোন, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ, সামাজিক সুরক্ষা এবং স্বচ্ছ তদারকি ব্যবস্থা চালু করা যায়, তাহলে পথহকার ও পথচারী, উভয়ের স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব হবে।
উপসংহার
মহানগরীর পথহকাররা বাংলাদেশের নগর অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এর মাধ্যমে একদিকে লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে কোটি মানুষের কাছে সাশ্রয়ী পণ্য ও সেবা পৌঁছে যাচ্ছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে আইনি স্বীকৃতির অভাব, অনিয়মিত উচ্ছেদ, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং পরিকল্পনার ঘাটতির কারণে এই খাতটি অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
তাই বাস্তবতা হলো, পথহকারদের উচ্ছেদ করে নয়, বরং নগর অর্থনীতির একটি বৈধ ও পরিকল্পিত অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েই সমস্যার টেকসই সমাধান সম্ভব। সময়ের দাবি হলো মানবিক, অংশগ্রহণমূলক ও বাস্তবভিত্তিক নীতিমালার মাধ্যমে পথহকারদের অধিকার এবং নগর শৃঙ্খলার মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা। তবেই পথ অর্থনীতি নগর উন্নয়নের প্রতিবন্ধক নয়, বরং সহায়ক শক্তিতে পরিণত হতে পারবে।
