বর্ণা আহমেদ
বার্গফিল্ড সেন্ট মেরি সি অফ পি প্রাইমারি স্কুল
যুক্তরাজ্যে প্রতিবন্ধী শিশু এবং বিশেষ শিক্ষাগত চাহিদাসম্পন্ন (SEN) শিক্ষার্থীরা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের সুবিধা পেয়ে থাকে। এসব সুবিধার মধ্যে রয়েছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিচর্যা পরিকল্পনার আওতাভুক্ত হওয়ার সুযোগ, প্রশিক্ষিত কর্মীদের সহায়তা, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষার্থীর প্রয়োজন অনুযায়ী অভিযোজিত পাঠদান পদ্ধতি, ইতিবাচক শিক্ষার পরিবেশ এবং পরিসংখ্যানভিত্তিক তথ্য ও প্রবণতার ব্যবহার। এসব ব্যবস্থা নিশ্চিত করে যে প্রতিবন্ধী শিশু এবং বিশেষ শিক্ষাগত চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে সফলভাবে শিক্ষালাভের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ ও সহায়তা পায়।
অন্যদিকে, বাংলাদেশজুড়ে শেখার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি শিশুদের এমন শিক্ষাব্যবস্থা থেকে কার্যত বাদ দেওয়া হচ্ছে, যার অধিকার তাদের আইনগতভাবে রয়েছে। শক্তিশালী আইনগত প্রতিশ্রুতি এবং আন্তর্জাতিক চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা, যেমন জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি), থাকা সত্ত্বেও নীতিগত অঙ্গীকার এবং শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতার মধ্যে একটি বড় ব্যবধান রয়ে গেছে। পরিসংখ্যান কেবল ধীরগতির অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরে না; বরং শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত ব্যর্থতাকে স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে আসে।
সংকটের ব্যাপ্তি
২০১৯ সালের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে অনুযায়ী, বাংলাদেশের ২ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের ৭ দশমিক ৩ শতাংশ কোনো না কোনো কার্যকরী প্রতিবন্ধিতার সঙ্গে জীবনযাপন করে। শহরাঞ্চলে এই হার ৬ দশমিক ১ শতাংশ হলেও গ্রামীণ এলাকায় তা ৭ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২১ সালের জাতীয় প্রতিবন্ধী ব্যক্তি জরিপে দেখা যায়, প্রতিবন্ধী শিশুদের মাত্র ৪০ দশমিক ৫৫ শতাংশ প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তি রয়েছে, যেখানে অপ্রতিবন্ধী শিশুদের ক্ষেত্রে এই হার ৯৮ শতাংশ।
মাধ্যমিক স্তরে পৌঁছানোর পর এই হার দ্রুত কমে ২৪ দশমিক ৩৬ শতাংশে নেমে আসে। ধারণা করা হয়, স্কুলগামী বয়সের পাঁচ লক্ষাধিক প্রতিবন্ধী শিশু কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে না। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিবন্ধী মেয়েরা আরও বেশি বঞ্চনার শিকার হয়। প্রতিবন্ধী ছেলেদের তুলনায় বিদ্যালয়ে তাদের অংশগ্রহণের হার ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পয়েন্ট পর্যন্ত কম।
বান্দরবান, হবিগঞ্জ এবং নড়াইলের মতো জেলাগুলোতে প্রতিবন্ধী শিশুদের বিদ্যালয়ের বাইরে থাকার হার ৮০ থেকে ১০০ শতাংশের মধ্যে। প্রাথমিক স্তরে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতির হার অঞ্চলভেদে ব্যাপকভাবে ভিন্ন। সিলেটে এই হার ৩৪ দশমিক ৬১ শতাংশ হলেও চট্টগ্রামে তা ৭০ দশমিক ৭৩ শতাংশ। মাধ্যমিক স্তরে সর্বোচ্চ বঞ্চনার হার দেখা গেছে বরিশালে, যেখানে এই হার ৮৮ দশমিক ৭০ শতাংশে পৌঁছেছে।
বিদ্যালয়গুলো কোথায় ব্যর্থ হচ্ছে
বৈচিত্র্যময় শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন অনুযায়ী পাঠদান পদ্ধতি, অবকাঠামো এবং মূল্যায়ন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার যে ধারণাকে ‘যুক্তিসঙ্গত সমন্বয়’ বলা হয়, বাংলাদেশের অধিকাংশ বিদ্যালয়ে তার প্রায় কোনো অস্তিত্ব নেই। গ্রামীণ এলাকার ৫ শতাংশেরও কম বিদ্যালয় ন্যূনতম প্রবেশগম্যতার মানদণ্ড পূরণ করে। অধিকাংশ বিদ্যালয়ে র্যাম্প, ব্যবহার উপযোগী শৌচাগার, প্রশস্ত দরজা, স্পর্শনির্ভর নির্দেশনা ব্যবস্থা কিংবা ব্রেইল শিক্ষাসামগ্রীর ব্যবস্থা নেই।
ফলে সাধারণত ৫০ জন বা তারও বেশি শিক্ষার্থী নিয়ে গঠিত অতিরিক্ত ভিড়ের শ্রেণিকক্ষগুলো শিক্ষকদের জন্য পৃথক শিক্ষার্থীর চাহিদা অনুযায়ী পাঠদানকে কঠিন করে তোলে। অতিরিক্ত শিক্ষার্থীসংখ্যার কারণে শেখার পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সে বিষয়ে বহু গবেষণা রয়েছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাওয়ায় শিক্ষকরা প্রত্যেক শিক্ষার্থীর প্রতি ব্যক্তিগত মনোযোগ দিতে এবং কার্যকরভাবে শ্রেণিকক্ষ পরিচালনা করতে পারছেন না।
বাংলাদেশের শিক্ষকদের ওপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, ২০ শতাংশেরও কম শিক্ষক প্রতিবন্ধিতা-অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাদান পদ্ধতির ওপর প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, জাতীয় শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রশিক্ষণ কাঠামোতে এখনো অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা বিষয়ক মডিউল যুক্ত করা হয়নি।
প্রতিবন্ধিতা সম্পর্কে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য নানা প্রতিবন্ধকতা এবং নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করতে পারে। ফলাফলও অনুমেয়। শিক্ষকরা প্রতিবন্ধিতাকে শিক্ষণপদ্ধতি পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা হিসেবে না দেখে ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা হিসেবে বিবেচনা করেন। অটিজম, এডিএইচডি, বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধিতা বা ডিসলেক্সিয়ায় আক্রান্ত শিক্ষার্থীরা হয় বিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পায় না, নয়তো শ্রেণিকক্ষের প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হয়, যতক্ষণ না তারা একসময় ঝরে পড়ে।
২০২৪ সালের একটি গবেষণায় অনুমান করা হয়েছে যে বাংলাদেশের প্রায় ১ দশমিক ৭ শতাংশ শিশুর অটিজম থাকতে পারে। অথচ সরকারি নথিতে সারা দেশে নিবন্ধিত অটিজমের সংখ্যা ৮০ হাজারেরও কম, যা সম্ভাব্য সংখ্যার এক-তৃতীয়াংশেরও নিচে। এই চিত্র দীর্ঘদিনের সনাক্তকরণ ঘাটতির প্রতিফলন।
দুঃখজনকভাবে, সরকার বর্তমানে মাত্র ১১টি অটিজম বিদ্যালয়, ৭টি শ্রবণপ্রতিবন্ধী বিদ্যালয়, ৫টি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বিদ্যালয় এবং বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য মাত্র ১টি কেন্দ্র পরিচালনা করে। দেশের ২৪টি জেলায় কোনো বিশেষায়িত বিদ্যালয়ই নেই। বাস্তবে পরিস্থিতি আরও সীমিত, কারণ অধিকাংশ বিশেষ বিদ্যালয় শহরকেন্দ্রিক এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষার্থীদের অল্প অংশকে সেবা দিতে সক্ষম।
অন্যদিকে ইংল্যান্ডে প্রায় ১,০৫০টি বিশেষায়িত বিদ্যালয় রয়েছে, যেখানে সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত এবং বেসরকারি উভয় ধরনের প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে কাজ করছে। লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অব ডিসএবিলিটি স্টাডিজ এবং ডিসএবিলিটি রাইটস ইউকের যৌথ পদ্ধতিগত পর্যালোচনায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শিক্ষাজীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পর্যালোচিত গবেষণাগুলোতে শিক্ষাক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা যেসব বাধার মুখোমুখি হন, সেগুলোর বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষার অভিজ্ঞতা উন্নত করার লক্ষ্যে গৃহীত যুক্তিসঙ্গত সমন্বয় এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসূচির বিভিন্ন উদাহরণও সেখানে উপস্থাপন করা হয়েছে।
সামাজিক কলঙ্ক ও অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা
সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি এখনো একটি বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে। অনেক সমাজে প্রতিবন্ধিতাকে ঈশ্বরের শাস্তি বা পূর্বজন্মের কর্মফলের ফল হিসেবে দেখা হয়, যার কারণে লজ্জা ও সামাজিক ভয়ের কারণে অনেক পরিবার প্রতিবন্ধী শিশুদের বিষয়টি গোপন রাখে। প্রায় ৭৩ শতাংশ অভিভাবক তাদের প্রতিবন্ধী সন্তানকে একা বিদ্যালয়ে যাতায়াতের অনুমতি দেন না। দারিদ্র্য এই বঞ্চনাকে আরও গভীর করে তোলে। প্রতিবন্ধী ভাতা সাধারণত মাসে ১ হাজার ২০০ টাকার নিচে হওয়ায় যাতায়াত, সহায়ক সরঞ্জাম বা ব্যক্তিগত শিক্ষকের অতিরিক্ত খরচ বহন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, সুবিধা পাওয়ার যোগ্য পরিবারগুলোর মধ্যে মাত্র ২০ শতাংশ বিদ্যমান সুযোগ ও অধিকার সম্পর্কে জানে। পাশাপাশি ১৫ শতাংশেরও কম পরিবার প্রতিবন্ধীভিত্তিক ভাতা পাওয়ার সুযোগ গ্রহণ করতে পেরেছে। একই সময়ে সবচেয়ে দরিদ্র পরিবারের জন্য প্রাথমিক ভাতার সঙ্গে অতিরিক্ত ২০ শতাংশ প্রতিবন্ধী ভাতা যুক্ত করার ব্যবস্থা থাকলেও, যোগ্য প্রতিবন্ধী মেয়েদের মাত্র প্রায় ১০ শতাংশ সেই সুবিধা পায়। যখন পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য সীমিত থাকে, তখন অনেক পরিবার অপ্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়, কারণ তারা সেটিকে আর্থিকভাবে অধিক নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করে।
প্রয়োজনীয় নীতিগত সংস্কার
বাংলাদেশকে জরুরি ভিত্তিতে পাঁচটি স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে একটি সংস্কার কৌশল গ্রহণ করতে হবে। প্রথমত, সব শিক্ষক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাদান পদ্ধতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। পৃথক শিক্ষার্থীর প্রয়োজন অনুযায়ী পাঠদান, সবার জন্য উপযোগী শিক্ষার নকশা এবং শ্রেণিকক্ষে প্রয়োজনীয় সমন্বয় বিষয়ে বাধ্যতামূলক তিন মাসের একটি পাঠ্যক্রমের প্রতিটি শিক্ষা স্নাতক কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং জাতীয় শিক্ষক স্বীকৃতি ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বাধ্যতামূলক নিরীক্ষার মাধ্যমে বিদ্যালয়ের অবকাঠামোগত প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করতে হবে। নতুন নির্মিত বা সংস্কার করা কোনো বিদ্যালয়কে সরকারি অর্থায়ন দেওয়া উচিত নয়, যদি না সেখানে র্যাম্প, ব্যবহার উপযোগী শৌচাগার এবং সহায়ক প্রযুক্তিসহ সবার জন্য উপযোগী অবকাঠামোর মানদণ্ড পূরণ করা হয়। বর্তমানে গ্রামীণ বিদ্যালয়ের ৫ শতাংশেরও কম এই মানদণ্ড পূরণ করে। আগামী দুই বছরের মধ্যে নতুন নির্মাণের ক্ষেত্রে এই হার ১০০ শতাংশে উন্নীত করতে হবে।
তৃতীয়ত, বর্তমান দুর্বল ভাতা ব্যবস্থার পরিবর্তে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীবান্ধব শর্তসাপেক্ষ নগদ সহায়তা কর্মসূচি চালু করা উচিত। ব্রাজিল ও মেক্সিকোর সফল মডেল থেকে শিক্ষা নিয়ে আর্থিক সহায়তাকে ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে, বায়োমেট্রিক উপস্থিতির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে এবং প্রাথমিক ভাতার সঙ্গে ২০ শতাংশ প্রতিবন্ধী সহায়তা যোগ করতে হবে। বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে গ্রামীণ ও নারী শিক্ষার্থীদের ওপর।
চতুর্থত, শিক্ষা ব্যবস্থাপনা তথ্য ব্যবস্থাকে উন্নত করতে হবে, যাতে প্রতিবন্ধিতার ধরন, লিঙ্গ এবং অবস্থানভিত্তিক তথ্য আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করা যায়। নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া কার্যকর পরিকল্পনা করা সম্ভব নয়। বর্তমান ব্যবস্থা বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হয় এবং স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণ বিভাগের তথ্যভান্ডারের সঙ্গে সমন্বিত নয়।
পঞ্চমত, গণমাধ্যম, বিদ্যালয়ভিত্তিক অন্তর্ভুক্তিমূলক ক্লাব এবং ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদের সম্পৃক্ত করে একটি জাতীয় সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে, যাতে সামাজিক কলঙ্ক দূর করা যায়। কেনিয়া দেখিয়েছে যে সহপাঠী পরামর্শমূলক কর্মসূচি এবং শিশুদের নেতৃত্বে পরিচালিত অন্তর্ভুক্তিমূলক ক্লাব বৈষম্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে। বাংলাদেশের শক্তিশালী সামাজিক সংগঠন ও মাদ্রাসা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এই মডেল ৬৪টি জেলায় বিস্তৃত করা সম্ভব।
যুক্তরাজ্যের বিদ্যালয়ে বিশেষ শিক্ষাগত চাহিদাসম্পন্ন (SEN) শিক্ষার্থীদের জন্য নীতিগত সংস্কার ২০২৬ সালের স্কুল শ্বেতপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে ব্যক্তিকেন্দ্রিক সহায়তা পরিকল্পনা, তিন স্তরের সহায়তা কাঠামো, আইনগত পরিবর্তন এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিচর্যা পরিকল্পনার (EHCP) আরও কার্যকর ব্যবহারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশের পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করলে এই ব্যবস্থা বাস্তবায়ন হয়তো অনেক দূরের সম্ভাবনা মনে হতে পারে। তবে যুক্তরাজ্যের সংস্কারের মূল দর্শন ও নীতিগত ভিত্তি বাংলাদেশের জন্য একটি শক্তিশালী দিকনির্দেশনা হতে পারে।
বঞ্চনা থেকে অন্তর্ভুক্তির পথে
বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান সংখ্যক শিক্ষার্থীকে সেবা দেওয়া বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এই ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন (RPDA) ২০১৩ অনুযায়ী যুক্তিসঙ্গত সমন্বয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এই বিধানের কার্যকারিতা খুবই সীমিত। সরকারকে বাধ্যতামূলক করতে হবে যে, নিবন্ধিত সব বেসরকারি বিদ্যালয় লাইসেন্স নবায়নের শর্ত হিসেবে প্রতি বছর অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা পরিকল্পনা জমা দেবে। এসব পরিকল্পনায় শেখার ক্ষেত্রে সমস্যার মুখোমুখি শিক্ষার্থীদের ভর্তি নিশ্চিত করার নির্দিষ্ট লক্ষ্য এবং পাঠদানে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের প্রমাণ থাকতে হবে।
এছাড়াও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার জন্য নির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ না থাকা বোঝায় যে অন্তর্ভুক্তিকে একটি মৌলিক দায়িত্বের পরিবর্তে অতিরিক্ত বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি। আলাদা অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা বাজেট প্রতিষ্ঠা একটি দেশের আইনগত ও আন্তর্জাতিক চুক্তিগত দায়বদ্ধতা বাস্তবায়নের সবচেয়ে পরিমাপযোগ্য প্রমাণ হতে পারে।
শেখার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি শিশুদের প্রতি বাংলাদেশের প্রকৃত অঙ্গীকার কেবল নীতি প্রণয়ন বা আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুমোদনের মাধ্যমে পরিমাপ করা যাবে না। মনে রাখতে হবে, ৬০ শতাংশ প্রতিবন্ধী শিশু কখনো শ্রেণিকক্ষে প্রবেশই করতে পারে না। নিষ্ক্রিয়তার প্রতিটি বছর এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে দেয়। সংস্কার কেবল অর্থ বরাদ্দের বিষয় নয়। মূল প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্র কি এই শিশুদের সমান শিক্ষার অধিকারসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে?
যুক্তরাজ্যের সমতা আইন, ২০১০ নিশ্চিত করে যে বিদ্যালয়গুলো প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করতে পারবে না এবং তাদের শিক্ষা গ্রহণ ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে যুক্তিসঙ্গত সমন্বয় করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত সহায়তা প্রদান, শিক্ষাসামগ্রী পরিবর্তন, প্রশিক্ষিত সহায়তাকারী কর্মী এবং বিদ্যালয়ের পরিবেশকে সবার জন্য ব্যবহার উপযোগী করে তোলা। তাই বাংলাদেশ সরকারের উচিত সংস্কারের এই যাত্রা শুরু করার আগে একটি শক্তিশালী ও আধুনিক সমতা আইন প্রণয়নের দিকে গুরুত্ব দেওয়া।
অন্তর্ভুক্তির ধারণা কোনো রাজনৈতিক এজেন্ডা থেকে আসে না। বরং এই বিষয়টি একটি সামাজিক রূপান্তর হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। যখন সামাজিক পরিবর্তন স্বতঃস্ফূর্তভাবে আসে না, অথবা পরস্পরবিরোধী মত, অস্পষ্ট ধারণা কিংবা প্রচলিত কুসংস্কারের সঙ্গে সমন্বয় করা কঠিন হয়ে পড়ে, তখন আইনগত সংস্কার অপরিহার্য হয়ে ওঠে।
