নাঈমা অনামিকা
কমিশনিং সম্পাদক, অনিকেত বুলেটিন
বাংলাদেশের দ্রুত নগরায়ণ দেশের সামাজিক কাঠামো, পারিবারিক সম্পর্ক এবং তরুণ প্রজন্মের জীবনধারায় গভীর পরিবর্তন এনে দিয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও রাজশাহীর মতো মহানগরগুলোতে বেড়ে ওঠা কিশোর-কিশোরীরা এক জটিল বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছে। একদিকে বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব সুযোগ, অন্যদিকে পারিবারিক প্রত্যাশা, শিক্ষাগত চাপ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সংকট তাদের জীবনকে ক্রমশ কঠিন করে তুলছে। ফলে একটি সুস্থ, দায়িত্বশীল ও মানবিক কিশোর সংস্কৃতি গড়ে তোলা আজ বাংলাদেশের নগর সমাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।
ভবিষত প্রজন্ম হিসেবে এই কিশোর সমাজের জীবনযাত্রা এবং তাদের সামগ্রীক উন্নয়ন দেশের সার্বিক উন্নয়নের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই সঙ্গত কারণেই সাম্প্রতিক জটিল সমস্যা হিসেবে এই বিষয়টির একটি বিশ্লেষণ ধর্মী আলোচনা উপস্থাপনের চেষ্টা করছি।
ডিজিটাল যুগের সুযোগ ও সংকট
বর্তমান প্রজন্মের কিশোররা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় প্রযুক্তির সঙ্গে বেশি সংযুক্ত। স্মার্টফোন ও সহজলভ্য ইন্টারনেট তাদের সামনে বিশ্বকে উন্মুক্ত করে দিয়েছে। কিন্তু এই ডিজিটাল সংযোগের ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি রয়েছে গুরুতর নেতিবাচক প্রভাব।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের সাফল্য, বিলাসী জীবনযাপন কিংবা আদর্শিক চিত্র দেখে অনেক কিশোর নিজের জীবনকে তুলনামূলকভাবে ব্যর্থ মনে করতে শুরু করে। এর ফলে আত্মবিশ্বাসহীনতা, হতাশা এবং উদ্বেগ বৃদ্ধি পায়। বিশেষজ্ঞরা একে “তুলনামূলক মানসিকতা” (Comparison Syndrome) এবং “ইম্পোস্টার সিনড্রোম” হিসেবে চিহ্নিত করেন।
একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে কাটানোর কারণে খেলাধুলা, সামাজিক মেলামেশা এবং বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। ঢাকা শহরের যানজট, নিরাপত্তা সংকট এবং উন্মুক্ত খেলার মাঠের অভাব এই সমস্যাকে আরও তীব্র করেছে। ফলে স্মার্টফোন যেমন তথ্যের উন্মুক্ত আকাশ, তেমনি অনেক ক্ষেত্রে তা এক ধরনের মানসিক বন্দিশালায় পরিণত হচ্ছে।
শিক্ষাগত চাপ ও আনন্দহীন শৈশব
বাংলাদেশের নগর শিক্ষাব্যবস্থা এখনও প্রধানত পরীক্ষাকেন্দ্রিক। অধিকাংশ পরিবারে শিক্ষার মূল লক্ষ্য হিসেবে ভালো ফলাফল এবং পেশাগত সাফল্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই সংস্কৃতিতে কিশোরদের মানসিক বিকাশ, সৃজনশীলতা এবং ব্যক্তিগত আগ্রহ প্রায়ই উপেক্ষিত থাকে।
অভিভাবকদের উচ্চ প্রত্যাশা, কোচিং নির্ভর শিক্ষা এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার চাপ অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে মানসিক অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। যারা কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন করতে পারে না, তারা নিজেদের অযোগ্য মনে করতে শুরু করে। ধীরে ধীরে এই অনুভূতি আত্মসম্মানবোধকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং দীর্ঘমেয়াদে বিষণ্নতা বা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলাফলভিত্তিক এই শিক্ষাব্যবস্থা এমন এক প্রজন্ম তৈরি করছে, যারা পরীক্ষায় সফল হলেও নিজেদের আবেগ, স্বপ্ন কিংবা আনন্দের প্রকৃত উৎস সম্পর্কে সচেতন নয়।
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক সচেতনতার অভাব
বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য এখনও একটি অবহেলিত বিষয়। কিশোরদের মধ্যে উদ্বেগ, হতাশা বা আত্মহত্যাপ্রবণ চিন্তা দেখা দিলেও অনেক ক্ষেত্রে তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয় না। বরং এসব সমস্যাকে দুর্বলতা, অবাধ্যতা কিংবা ধর্মীয় অনুশীলনের ঘাটতি হিসেবে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা দেখা যায়। বিশেষ করে কিশোরীদের মানসিক সমস্যাকে অনেক সময় পারিবারিক বা সামাজিকভাবে গুরুত্বহীন বলে বিবেচনা করা হয়। ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা বা পরামর্শ না পাওয়ায় সমস্যা আরও জটিল আকার ধারণ করে।
অন্যদিকে দেশে শিশু ও কিশোর মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং প্রশিক্ষিত কাউন্সেলরের সংখ্যাও অত্যন্ত সীমিত। ফলে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও চাহিদার মধ্যে একটি বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে, যা বর্তমানে জনস্বাস্থ্যগত উদ্বেগের কারণ।
নগর জীবনের বিচ্ছিন্নতা ও সামাজিক বন্ধনের অবক্ষয়
একসময় বাংলাদেশের সমাজে যৌথ পরিবার এবং প্রতিবেশীকেন্দ্রিক সামাজিক সম্পর্ক কিশোরদের মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। কিন্তু নগর জীবনের ব্যস্ততা ও পারমাণবিক পরিবারের প্রসারের ফলে সেই সামাজিক বন্ধন ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে।
মহানগরের অনেক কিশোর এমন পরিবেশে বেড়ে উঠছে যেখানে প্রতিবেশীদের সঙ্গে পরিচয় সীমিত এবং আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ অনিয়মিত। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত পার্ক, খেলার মাঠ ও কমিউনিটি সেন্টারের অভাবে তাদের সামাজিক বিকাশের সুযোগও সংকুচিত হচ্ছে। এই বিচ্ছিন্নতা অনেক কিশোরকে ভার্চুয়াল জগতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল করে তুলছে এবং কিছু ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
উত্তরণের সম্ভাব্য পথ
মহানগরীর কিশোর সংস্কৃতিকে ইতিবাচক ও দায়িত্বশীল পথে পরিচালিত করতে হলে কেবল নৈতিক উপদেশ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তন।
প্রথমত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সামাজিক ও আবেগীয় শিক্ষা (Social and Emotional Learning) অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা নিজেদের অনুভূতি বুঝতে ও নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে। দ্বিতীয়ত, শহর পরিকল্পনায় কিশোরবান্ধব পার্ক, খেলার মাঠ, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং যুব উন্নয়ন কেন্দ্র স্থাপনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
তৃতীয়ত, পরিবারকে এমন পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে যেখানে সন্তানরা ভয় বা সংকোচ ছাড়াই নিজেদের মানসিক সমস্যার কথা বলতে পারে। চতুর্থত, প্রতিটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কমিউনিটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর নিয়োগের মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়ানো জরুরী।
উপসংহার
বাংলাদেশের মহানগরীগুলোর কিশোররা দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব, কর্মশক্তি এবং সামাজিক পরিবর্তনের প্রধান বাহক। কিন্তু তাদের মানসিক সুস্থতা, সামাজিক বিকাশ এবং মানবিক মূল্যবোধ নিশ্চিত না করে একটি উন্নত নগর সমাজ গঠন সম্ভব নয়। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার, মানবিক শিক্ষাব্যবস্থা, শক্তিশালী পারিবারিক বন্ধন এবং সহজলভ্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে পারলে মহানগরীর কিশোর সংস্কৃতি আরও দায়িত্বশীল, সৃজনশীল ও কল্যাণমুখী হয়ে উঠতে পারে। আর সেই পথেই নির্মিত হবে একটি সুস্থ, সহনশীল ও প্রগতিশীল বাংলাদেশ।
