ডেস্ক রিপোর্ট
বাংলাদেশের প্রকৌশল গবেষণা কাঠামো টেকসই নির্মাণ এবং আধুনিক মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চাহিদার সাথে মারাত্মকভাবে অসঙ্গতিপূর্ণ রয়ে গেছে। ২০৪১ সালের মধ্যে দেশটি স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে উন্নত দেশের মর্যাদা অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করলেও, প্রকৌশল উদ্ভাবনের নীতিগত কাঠামোটি খণ্ডিত, অর্থায়নের সংকটে জর্জরিত এবং অত্যন্ত দুর্বলভাবে বাস্তবায়িত। আবাসন ও নির্মাণ খাত একাই জিডিপিতে ৮ শতাংশ অবদান রাখে এবং ২৪ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে, অথচ এই খাতটি চলছে নামমাত্র গবেষণা নজরদারি, প্রাচীন নির্মাণসামগ্রীর মানদণ্ড এবং কার্বন নির্গমনের কোনো জবাবদিহিতা ছাড়াই। একটি বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন থেকে স্পষ্ট হয় যে, এই খাতের পদ্ধতিগত ব্যর্থতাগুলো দূর করতে জরুরি সংস্কার প্রয়োজন।
নীতিগত খণ্ডবিখণ্ডতা এবং প্রয়োগের ব্যর্থতা
স্থাপত্য ও নির্মাণ পরিবেশ নিয়ন্ত্রণের জন্য বাংলাদেশের কাগজে-কলমে বেশ কিছু বিস্তারিত আইনি কাঠামো রয়েছে। যেমন ২০২০ সালের ‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড’ (বিএনবিসি)-এ স্থায়িত্ব, সহনশীলতা, শক্তি দক্ষতা এবং সবার জন্য প্রবেশগম্যতার বিষয়গুলোকে মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ২০২১ সালে হালনাগাদকৃত ‘ন্যাশনালি ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশনস’ (এনডিসি)-এ ইট উৎপাদন এবং গৃহস্থালি যন্ত্রপাতির নির্গমন হ্রাসের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।
২০২৩ থেকে ২০৫০ সালের ‘ন্যাশনাল অ্যাডাপটেশন প্ল্যান’ বা জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনায় জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ২০২৩ সালের ‘ইন্টিগ্রেটেড এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার মাস্টার প্ল্যান’-এ ২০৭০ সালের মধ্যে শূন্য-নির্গমন অর্থনীতির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আপাতদৃষ্টে এই নীতিগত কাঠামো অত্যন্ত শক্তিশালী মনে হলেও, বাস্তবে এর প্রয়োগ পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।
এই খাতের প্রধান দুর্বলতা হলো আইনের দুর্বল প্রয়োগ। ভবন ও নির্মাণ খাতের সাথে যুক্ত সরকারের ১৩টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় নেই বললেই চলে। নীতিনির্ধারকদের কৌশলগত স্তরে যেমন সমান্তরাল সমন্বয়ের অভাব রয়েছে, তেমনি পরিকল্পনাবিদ ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়নকারীদের মধ্যে উল্লম্ব বা সরাসরি সমন্বয়হীনতা স্পষ্ট। দেশে বর্তমানে কোনো ‘জাতীয় নগর নীতি’ নেই এবং সামগ্রিক ভূমি এলাকার মাত্র ১০ শতাংশ অঞ্চল স্থানিক পরিকল্পনার আওতাভুক্ত। এনডিসি-তে নির্মাণ খাতকে ধারাবাহিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি এবং এর কোনো হালনাগাদ বাস্তবায়ন পরিকল্পনাও নেই। সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া থেকে গবেষক এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলোকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে নীতিগুলো কেবল কাগজে-কলমেই রয়ে গেছে, বাস্তবে রূপ নিচ্ছে না।
গবেষণার দৈন্য ও উদ্ভাবনী স্থবিরতা
বাংলাদেশ গবেষণা ও উন্নয়নে (আরঅ্যান্ডডি) জিডিপির মাত্র ০.২ শতাংশ বরাদ্দ দেয়, যেখানে চীন ২.২ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়া ৪.৩ শতাংশ ব্যয় করে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য মোট বরাদ্দ জিডিপির মাত্র ০.৩ শতাংশ, যার মধ্যে গবেষণা খাতের অর্থায়নকে নগণ্য বললেও চলে। গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্সে ১৩১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১১৬তম, যা বৈশ্বিক মানদণ্ডে সর্বনিন্ম ১১ শতাংশের মধ্যে পড়ে। উচ্চশিক্ষায় মোট ভর্তিকৃত শিক্ষার্থীর মাত্র ১১.২ শতাংশ বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (স্টেম) বিষয়ে পড়াশোনা করছে। শিল্প খাতে দক্ষ জনবলের ক্ষেত্রে ৩০ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে। এই পরিসংখ্যানগুলো এমন একটি দেশের চিত্র তুলে ধরবে, যা যে সংকট বুঝতে বিনিয়োগ করতে অস্বীকৃতি জানায়, সেই সংকট থেকে প্রকৌশলগত উপায়ে উত্তরণ ঘটাতে অক্ষম।
হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এইচবিআরআই) নির্মাণ খাতের উদ্ভাবনের প্রধান গবেষণা সংস্থা হলেও জাতীয় রূপান্তর নিশ্চিত করার মতো পর্যাপ্ত সক্ষমতা এর নেই। কম কার্বন নির্গমনকারী সামগ্রী নিয়ে গবেষণা মূলত পোড়ামাটির ইটের বিকল্প তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। অন্যদিকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রয়োগ এবং ব্যাপক টেকসই বিকল্প অনুসন্ধানের ক্ষেত্রটি স্থবির হয়ে পড়েছে।
ইট ছাড়া অন্য কোনো নির্মাণসামগ্রীর কার্বন ফুটপ্রিন্ট বা নির্গমনের পরিমাণ প্রকাশের ব্যাপারে কোনো বাধ্যতামূলক সরকারি নিয়ম নেই। দক্ষ শ্রমিকদের বিদেশে চলে যাওয়া বা আমদানিকৃত প্রযুক্তির অন্ধ অনুকরণের কারণে দেশীয় ঐতিহ্যবাহী নির্মাণ জ্ঞান দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। নির্মাণ খাতের বর্জ্যের মাত্র ২ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্ব্যবহার বা রিসাইক্লিং প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। প্রকৌশল সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ, যাচাই এবং প্রচারের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোটি বর্তমানে কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলেছে।
উপকরণের ওপর নির্ভরশীলতা এবং পরিবেশগত মূল্য
ইটভাটা শিল্প প্রতি বছর ৮৭ লাখ ৫০ হাজার টন গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন করে, যার জন্য ২২ লাখ টন কয়লা এবং ১৯ লাখ টন জ্বালানি কাঠ পোড়ানো হয়। প্রায় ৭,০০০ ইটভাটা প্রতি বছর ১শ ২৭ কোটি ঘনফুটেরও বেশি উর্বর উপরিভাগের মাটি গ্রাস করছে, যা দেশের মোট ভূমি ক্ষয়ের ১৭ শতাংশের জন্য দায়ী। সরকার ২০১৯ সালে ইট থেকে ব্লকে রূপান্তরের নীতি প্রবর্তন করে, যার আওতায় ২০২৫ সালের মধ্যে সরকারি নির্মাণে শতভাগ ব্লক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল।
তবে এই ক্ষেত্রে অগ্রগতি অত্যন্ত হতাশাজনক। অননুমোদিত বা অ-পোড়ানো ইটের ব্যবহার সংক্রান্ত জেলা পর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ কেবল ২০২২ সালে শুরু হয়েছে। ঠিকাদারদের একটি বড় অংশ এখনো এই নীতি সম্পর্কে পুরোপুরি অজ্ঞাত। ব্লক নির্মাণের জন্য দক্ষ শ্রমিকের তীব্র সংকট রয়েছে। আর্থিক সহায়তার অভাব এবং উচ্চ নিবন্ধন বা শংসাপত্র খরচের কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলো এই বাজারে প্রবেশ করতে পারছে না, ফলে সীমিত ব্লকের বাজারটি কেবল বড় কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।
নির্মাণসামগ্রী থেকে নির্গত কার্বনের (এমবডিড কার্বন) পরিমাণ ২০২০ সালের ১২.৭ বিলিয়ন টন থেকে বেড়ে ২০৫০ সালের মধ্যে ৪৬.৭ বিলিয়ন টনে পৌঁছাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। একই সময়ে ভবনে ব্যবহৃত জ্বালানি থেকে নির্গত কার্বনের (অপারেশনাল কার্বন) পরিমাণ ২৯.৮ মিলিয়ন টন থেকে বেড়ে ১০৯.৮ মিলিয়ন টনে দাঁড়াবে। দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাত্র ৩.০৪ শতাংশ আসে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। নির্মাণ খাতের সরবরাহ শৃঙ্খল মূলত সিমেন্ট, কংক্রিট, ইট এবং ধাতুর মতো উচ্চ কার্বনযুক্ত উপকরণের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। অন্যদিকে বাঁশ, কাদা এবং পাটের মতো স্থানীয় উপাদান ব্যবহার করে তৈরি টেকসই বিকল্পগুলো বাণিজ্যিকভাবে অবহেলিত রয়ে গেছে।
সংস্কারের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা
- প্রথমত, ২০২৫ সালের মধ্যে গবেষণা খাতের অর্থায়ন জিডিপির ০.২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে অন্তত ১ শতাংশ করতে হবে, যেখানে কম কার্বনযুক্ত নির্মাণসামগ্রী এবং মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের উদ্ভাবনের জন্য সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ থাকবে। স্পষ্ট খাতভিত্তিক অগ্রাধিকার এবং প্রতিযোগিতামূলক অনুদান প্রদান ব্যবস্থার মাধ্যমে একটি জাতীয় গবেষণা ও উন্নয়ন কৌশল প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি।
- দ্বিতীয়ত, বিদ্যমান বিল্ডিং কোড বাস্তবায়নের জন্য স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে যোগ্য জনবল নিয়োগ, কঠোর শাস্তির বিধান এবং নির্মাণ খাতে কার্বন নির্গমন তদারকির জন্য একটি শক্তিশালী মনিটরিং, রিপোর্টিং ও ভেরিফিকেশন (এমআরভি) ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
- তৃতীয়ত, শিল্প খাত ও একাডেমিয়ার মধ্যে সমন্বয়কে সাময়িকের পরিবর্তে একটি স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। প্রকৌশল ও স্থাপত্যবিদ্যার বিশ্ববিদ্যালয় পাঠ্যসূচিতে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা, টেকসই সামগ্রী বিজ্ঞান এবং লাইফ সাইকেল অ্যাসেসমেন্ট বা জীবনচক্র মূল্যায়ন পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত করা আবশ্যক। দক্ষ জনবলের ঘাটতি মেটাতে এবং বিকল্প নির্মাণ কৌশলে পারদর্শী কর্মী তৈরি করতে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ কাঠামোর পরিধি বাড়াতে হবে।
- চতুর্থত, আর্থিক খাতকে নতুনভাবে সাজাতে হবে। গ্রিন বন্ড, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (পিপিপি), ব্লক উৎপাদনে আগ্রহী ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য স্বল্প সুদে ঋণ, উচ্চ কার্বনযুক্ত সামগ্রীর ওপর কার্বন ট্যাক্স আরোপ এবং টেকসই নির্মাণ যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক ছাড়ের মতো পদক্ষেপগুলো একই সাথে গ্রহণ করা প্রয়োজন। আর্থিক প্রণোদনা ছাড়া কেবল সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করার বর্তমান নীতি যে ব্যর্থ হয়েছে, তা প্রমাণিত।
- পঞ্চমত, একটি সমন্বিত তথ্য অবকাঠামো প্রতিষ্ঠা করতে হবে। নির্মাণসামগ্রীর কার্বন নির্গমন, দেশীয় ঐতিহ্যবাহী নির্মাণ পদ্ধতি কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সরবরাহ শৃঙ্খলের ঝুঁকি সংক্রান্ত কোনো কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ দেশে নেই। তথ্যভিত্তিক নীতিনির্ধারণের জন্য উপকরণ সংগ্রহ, ভবনের সহনশীলতা এবং জলবায়ু ঝুঁকি সংক্রান্ত রিয়েল-টাইম বা তাৎক্ষণিক তথ্য সম্বলিত একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা অপরিহার্য।
বিকল্পহীন পথ
টেকসই নির্মাণ প্রকৌশলে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি ভিত্তি, জনসংখ্যার সুবিধা এবং স্থানীয় কাঁচামাল, সবই বাংলাদেশের রয়েছে। যার অভাব রয়েছে তা হলো গবেষণায় অর্থায়নের প্রাতিষ্ঠানিক সদিচ্ছা, আইন প্রয়োগের দৃঢ়তা, শিল্প ও একাডেমিয়ার মধ্যকার দূরত্ব দূর করা এবং প্রকৌশল উদ্ভাবনকে অবহেলা না করে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা। এই সংস্কারগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা না হলে, জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ বৃদ্ধির সাথে সাথে কাগজের নীতি ও বাস্তবের নির্মাণ চিত্রের মধ্যকার ব্যবধান কেবলই বাড়তে থাকবে।
