নাঈমা অনামিকা
কমিশনিং সম্পাদক, অনিকেত বুলেটিন
বাংলাদেশের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের প্রশ্নপত্রের মান ও কাঠিন্যের পার্থক্য নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সরকার “এক দেশ, এক প্রশ্নপত্র” নীতি চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যার আওতায় দেশের সব সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। নীতিটির মূল লক্ষ্য হলো মূল্যায়নে সমতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। তবে এই উদ্যোগ যেমন নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করতে পারে, তেমনি কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জও সামনে নিয়ে আসতে পারে।
নিঃসন্দেহে বর্তমান সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে এই নীতির ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় দিক নিয়েই জনসাধারণের একটি স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। এই উপলব্ধি থেকে আমি “এক দেশ, এক প্রশ্নপত্র” নীতির একটি বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
নীতিটির ইতিবাচক দিক
অভিন্ন প্রশ্নপত্রের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো দেশের সব শিক্ষার্থী একই মানদণ্ডে মূল্যায়িত হবে। বোর্ডভেদে প্রশ্নপত্রের জটিল বা সহজ হওয়ার কারণে যে বৈষম্য তৈরি হতো, তা অনেকাংশে দূর হবে। ফলে একজন শিক্ষার্থীর ফলাফল তার প্রকৃত মেধা ও প্রস্তুতির প্রতিফলন হিসেবে আরও গ্রহণযোগ্যতা পাবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন বোর্ডের শিক্ষার্থীরা যখন একই বিশ্ববিদ্যালয় বা চাকরির প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে, তখন ফলাফলের তুলনামূলক গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে এবং প্রতিযোগিতা আরও ন্যায়সঙ্গত হবে।
অভিন্ন প্রশ্নপত্র শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি জাতীয় মানদণ্ড প্রতিষ্ঠায়ও সহায়ক হতে পারে, যার মাধ্যমে শিক্ষাক্রম, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং শিক্ষার গুণগত মান পর্যবেক্ষণ আরও সহজ হবে। কেন্দ্রীয়ভাবে প্রশ্নপত্র প্রণয়নের মাধ্যমে দেশের দক্ষ ও অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করা গেলে প্রশ্নপত্রের মান উন্নত হওয়ার পাশাপাশি একটি কার্যকর মান নিয়ন্ত্রণ কাঠামো গড়ে তোলাও সম্ভব হবে। পাশাপাশি বিশ্বের অনেক দেশে প্রচলিত জাতীয় পর্যায়ের অভিন্ন পরীক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশও আন্তর্জাতিকভাবে অধিক গ্রহণযোগ্য একটি মূল্যায়ন কাঠামোর দিকে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ পাবে।
নীতিটির নেতিবাচক দিক
অন্যদিকে এই নীতির সঙ্গে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিও জড়িত রয়েছে। আগে কোনো একটি শিক্ষা বোর্ডের প্রশ্নপত্রে ত্রুটি দেখা দিলে তার প্রভাব সীমিত পরিসরে থাকত, কিন্তু অভিন্ন প্রশ্নপত্রে ভুল বা মানগত সমস্যা দেখা দিলে দেশের সব শিক্ষার্থী একযোগে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। একইভাবে অতীতে বাংলাদেশে প্রশ্নফাঁসের যে অভিজ্ঞতা রয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটে অভিন্ন প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে তার প্রভাব সারা দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং পরীক্ষা বাতিল বা পুনরায় গ্রহণের মতো জটিল পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
প্রশ্নপত্রের মান নিশ্চিত করতে হলে প্রশ্নপ্রণেতা ও শিক্ষকদের ব্যাপক প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হবে, কারণ সৃজনশীল প্রশ্ন প্রণয়নে এখনও অনেক শিক্ষকের দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি একই প্রশ্নপত্র প্রয়োগ করলেই সমান সুযোগ নিশ্চিত হয় না। শহর ও গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে শিক্ষক, অবকাঠামো, প্রযুক্তি এবং শিক্ষাসহায়ক সুবিধার যে বৈষম্য বিদ্যমান, তা বহাল থাকলে অপেক্ষাকৃত সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে।
আবার একটি নির্দিষ্ট প্রশ্নপত্রকে কেন্দ্র করে কোচিং সেন্টার ও গাইডবইনির্ভর প্রস্তুতির প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যার ফলে পাঠ্যক্রমভিত্তিক শিক্ষার পরিবর্তে পরীক্ষাকেন্দ্রিক প্রস্তুতি গুরুত্ব পেতে পারে। পাশাপাশি বন্যা, ঘূর্ণিঝড় কিংবা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে দেশের কোনো অঞ্চলে পরীক্ষা স্থগিত হলে অভিন্ন প্রশ্নপত্র ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। তাই এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় শক্তিশালী বিকল্প পরিকল্পনা আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা অপরিহার্য।
সামগ্রিক মূল্যায়ন
“এক দেশ, এক প্রশ্নপত্র” নীতির মূল দর্শন হলো শিক্ষার্থীদের জন্য একটি সমতাভিত্তিক মূল্যায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলা। নীতিটির লক্ষ্য ইতিবাচক এবং দীর্ঘদিনের একটি সমস্যার সমাধানের প্রচেষ্টা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রশ্নপত্র একীভূত করার পাশাপাশি শিক্ষক প্রশিক্ষণ, প্রশ্নপত্রের মান নিয়ন্ত্রণ, প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা এবং শিক্ষাগত বৈষম্য হ্রাসে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।
উপসংহার
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় অভিন্ন প্রশ্নপত্র চালু করা একটি যুগান্তকারী সংস্কার হতে পারে। তবে এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার ওপর। যথাযথ প্রস্তুতি, দক্ষ মানবসম্পদ এবং শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামো নিশ্চিত করা গেলে মূল্যায়নে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার একটি কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে এসব পূর্বশর্ত পূরণ না হলে নীতিটি নতুন ধরনের জটিলতা ও বৈষম্যের জন্ম দিতে পারে। তাই একে শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়, বরং একটি সমন্বিত শিক্ষা সংস্কারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বাস্তবায়ন করা জরুরি।
