
ইয়ালিন্দু জয়বীরা
সাউথওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি অব ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইকোনমিকস, শ্রীলঙ্কা
দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশ দুটি দেশ, যাদের ভৌগোলিক অবস্থানের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সাদৃশ্য রয়েছে। উভয় দেশই ভারত মহাসাগরের পূর্বাঞ্চলীয় জলসীমার দিকে অবস্থিত এবং বঙ্গোপসাগর দুই দেশের সামুদ্রিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক
১৯৭২ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার অংশীদারত্ব মূলত বাণিজ্য, নৌপরিবহন ব্যবস্থা এবং সীমিত জনগণভিত্তিক যোগাযোগের ওপর গড়ে উঠেছে। ১৯৭৯ সালের জুন মাসে ঢাকায় শ্রীলঙ্কার হাইকমিশন চালু হয়। এর পর ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় যৌথ অর্থনৈতিক সহযোগিতা কমিশন।
দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নিতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১৯৭৭ সালের সাধারণ বাণিজ্য চুক্তি, ১৯৭৯ সালের অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহযোগিতা চুক্তি এবং ১৯৯২ সালের দ্বৈত কর পরিহার চুক্তি।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হয়েছে। আট বছর বিরতির পর ২০২৫ সালে কলম্বোতে চতুর্থ পররাষ্ট্র দপ্তর পরামর্শ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বর্তমানে শ্রীলঙ্কার রপ্তানি গন্তব্যের তালিকায় বাংলাদেশ ১২তম অবস্থানে রয়েছে। ২০২৪ সালে শ্রীলঙ্কা থেকে বাংলাদেশে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ২৪১ দশমিক ৫৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং বাংলাদেশ থেকে আমদানির পরিমাণ ছিল ৮৩ দশমিক ৭৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।
রাজনৈতিক সহযোগিতা থেকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে
বাংলাদেশে বর্তমানে ব্যাংকিং, আর্থিক সেবা, বস্ত্র, পোশাক, বিদ্যুৎ, আতিথেয়তা, লজিস্টিকস, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং পর্যটনসহ বিভিন্ন খাতে শ্রীলঙ্কার প্রায় ৮০টি বিনিয়োগ প্রকল্প কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে শ্রীলঙ্কার বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
অন্যদিকে শ্রীলঙ্কাতেও বাংলাদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। ওষুধ শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, বস্ত্র উৎপাদন, নির্মাণ এবং পর্যটন খাতে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে বাত্তিকালোয়ার এরাভুর অঞ্চলে কৌশলগত বস্ত্র উৎপাদন বিনিয়োগ অঞ্চল বাংলাদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় ক্ষেত্র হতে পারে।
নমনীয় নীতির মাধ্যমে টেকসই নীল অর্থনীতির বিকাশ
বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা ইতোমধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশ হিসেবে উভয় দেশের সামনে সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনা উন্মুক্ত রয়েছে।
নীল অর্থনীতি বলতে সমুদ্রসম্পদকে টেকসইভাবে ব্যবহার করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং পরিবেশ সংরক্ষণের সমন্বিত উদ্যোগকে বোঝায়। বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা যদি সমুদ্রসম্পদ, নৌপরিবহন, মৎস্য, পর্যটন এবং সামুদ্রিক প্রযুক্তিতে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করে, তাহলে দুই দেশের অর্থনীতিতে নতুন গতি তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার মধ্যে সামুদ্রিক যোগাযোগ উন্নয়ন
দুই দেশের ভৌগোলিক অবস্থান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভারত মহাসাগরের পূর্বাঞ্চলে তাদের অবস্থান আন্তর্জাতিক সমুদ্রবাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সামুদ্রিক পরিবহন তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়বহুল হওয়ায় এই খাতে সহযোগিতার সুযোগ ব্যাপক।
শ্রীলঙ্কা দীর্ঘদিন ধরে গভীর সমুদ্রবন্দর উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক ট্রান্সশিপমেন্ট ও সামুদ্রিক সেবা কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে রয়েছে বৃহৎ জনসংখ্যা, দ্রুত সম্প্রসারিত উৎপাদন ও রপ্তানি খাত এবং উপকূলীয় অঞ্চলে লক্ষাধিক মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত মৎস্য খাত।
বর্তমানে বাংলাদেশের অনেক পণ্য তৃতীয় দেশের ট্রান্সশিপমেন্ট কেন্দ্র ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছায়, যার ফলে অতিরিক্ত সময় ও ব্যয় যুক্ত হয়। কলম্বো ও চট্টগ্রাম বন্দরের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা হলে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের পরিবহন ব্যয় কমবে এবং শ্রীলঙ্কার বন্দরগুলোও নতুন পণ্য পরিবহনের সুযোগ পাবে।
শ্রীলঙ্কার ত্রিনকোমালি বন্দর প্রাকৃতিক গভীর সমুদ্রবন্দর হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। অন্যদিকে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দর ও অন্যান্য আঞ্চলিক বন্দরগুলোর সঙ্গে এর সমন্বিত ব্যবহার দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা বাড়াতে পারে। হাম্বানটোটাও একইভাবে আঞ্চলিক সামুদ্রিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে। ভারত মহাসাগরের এই ভৌগোলিক সংযোগকে কাজে লাগিয়ে অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য ও পরিবহনব্যবস্থা আরও সহজ ও কার্যকর করা সম্ভব।
বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা পর্যটন বলয়: অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন দ্বার
বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার স্থলভাগ এবং সমুদ্রাঞ্চলকে কেন্দ্র করে একটি টেকসই পর্যটনভিত্তিক অর্থনৈতিক বলয় গড়ে তোলা সম্ভব। শ্রীলঙ্কার পূর্বাঞ্চলীয় সমুদ্র, বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূল এবং উত্তর-পূর্ব ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল একটি বিস্তৃত সামুদ্রিক পরিবেশ তৈরি করেছে।
এই অঞ্চলের অগভীর সমুদ্র এলাকায় প্রবালপ্রাচীর সৃষ্টি এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের বিকাশের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে পরিবেশবান্ধব পর্যটন, সামুদ্রিক গবেষণা এবং উপকূলভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ করা সম্ভব। বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা যৌথভাবে একটি “বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা পর্যটন বলয়” গড়ে তুলতে পারে। শ্রীলঙ্কার পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত ত্রিনকোমালি বন্দর তিমি পর্যবেক্ষণ পর্যটনের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত।
একই সঙ্গে বাংলাদেশের কক্সবাজার ও সুন্দরবনের মতো সম্ভাবনাময় পর্যটন অঞ্চল আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও কার্যকরভাবে তুলে ধরা যেতে পারে। শ্রীলঙ্কার তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ভ্রমণের আগ্রহ বাড়ছে। দুই দেশের পর্যটন সংযোগ শক্তিশালী হলে উভয় দেশের নাগরিকদের মধ্যে ভ্রমণ ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ও বৃদ্ধি পাবে।
মৎস্য খাতের উন্নয়নে যৌথ উদ্যোগ
বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে সামুদ্রিক অর্থনৈতিক অঞ্চল ভাগাভাগি করতে হলেও শ্রীলঙ্কা একটি দ্বীপরাষ্ট্র হিসেবে তুলনামূলকভাবে বৃহৎ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বা ইইজেডের অধিকারী।
বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৬৬ হাজার বর্গকিলোমিটার। অন্যদিকে ভারত মহাসাগরে শ্রীলঙ্কার বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রায় ৫ লাখ ৩২ হাজার ৬১৯ বর্গকিলোমিটার। অর্থাৎ শ্রীলঙ্কার সামুদ্রিক অর্থনৈতিক অঞ্চল বাংলাদেশের তুলনায় প্রায় ৩ দশমিক ১ গুণ বড়।
শ্রীলঙ্কার রয়েছে বিপুল সামুদ্রিক সম্পদ, কিন্তু পর্যাপ্ত প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবলের ঘাটতি রয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ তুলনামূলক সীমিত হলেও মৎস্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণে দেশটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে।
বাংলাদেশ চাষকৃত মাছ ও চিংড়ি উৎপাদনে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ হলেও উপকূলের বাইরে গভীর সমুদ্রের মৎস্যসম্পদ এখনো যথেষ্ট ব্যবহার করতে পারেনি। ২০২৫ সালে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে গভীর সমুদ্র মৎস্য আহরণ, প্রাণিসম্পদ এবং পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞতা বিনিময়ের বিষয়ে দুই দেশ সম্মত হয়েছে।
যৌথ গবেষণা, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং টেকসই গভীর সমুদ্র মৎস্য আহরণ ব্যবস্থার মাধ্যমে দুই দেশ নিজেদের নিয়ন্ত্রিত সামুদ্রিক সম্পদ আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারে। পাশাপাশি গভীর সমুদ্রে মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ, ক্যানজাত মাছ উৎপাদন এবং রপ্তানিমুখী শিল্প গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
উপসংহার
ভারত মহাসাগরের একই ভৌগোলিক অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ার কারণে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার সামনে যৌথ নীল অর্থনীতি গড়ে তোলার একটি কৌশলগত সুযোগ রয়েছে। বন্দর যোগাযোগ, পর্যটন এবং মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনায় পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়াতে পারলে দুই দেশ টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন পথ তৈরি করতে পারে। দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যগত অংশীদারত্বকে সমুদ্রভিত্তিক আধুনিক অর্থনৈতিক জোটে রূপান্তর করা গেলে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা উভয়েই লাভবান হতে পারে।
