ফারদীন কবির
জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, ভারত
দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে ডিজিটাল সংযোগ যত গভীর হচ্ছে, একই সঙ্গে এই অঞ্চলের দুটি বৃহৎ দেশে তরুণদের ঘিরে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতাও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের তরুণ ও নারীদের মাদক সমস্যা নিয়ে দ্য অনিকেট বুলেটিন-এ প্রকাশিত সাম্প্রতিক একটি অনুসন্ধান এই বিশ্লেষণের প্রধান ভিত্তি। প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, বাংলাদেশে মাদকাসক্তি আর প্রান্তিক কোনো সমস্যা নয়; বরং তা ধীরে ধীরে জনস্বাস্থ্য ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটি গুরুতর সংকটে পরিণত হয়েছে। সমবয়সীদের চাপ, পারিবারিক অস্থিরতা, শিক্ষাজীবনে ব্যর্থতা ও বেকারত্বের পাশাপাশি অপরাধপ্রবণ জীবনযাপনকে আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করা অনিয়ন্ত্রিত অনলাইন বিনোদনধর্মী বিষয়বস্তু এই সংকটকে আরও তীব্র করছে।
ভারতের উত্তরাঞ্চল, বিশেষ করে পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও উত্তর প্রদেশের পরিস্থিতির সঙ্গে বাংলাদেশের ঢাকা ও চট্টগ্রামের নগর বাস্তবতার তুলনা করলে দেখা যায়, তরুণদের মানসিক ও সামাজিক বিপর্যয়ের পেছনে কাজ করা উপাদানগুলো সীমান্তের দুই পাশেই আশ্চর্যজনকভাবে কাছাকাছি। ইন্টারনেটের বিস্তার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব, কর্মসংস্থানের সংকট এবং পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা তরুণদের ঝুঁকির মাত্রা বাড়িয়ে তুলছে।
ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: সংকট ত্বরান্বিত করার মাধ্যম
বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে দ্য অনিকেট বুলেটিন-এর প্রতিবেদনে অনলাইন বিনোদনধর্মী প্ল্যাটফর্মগুলোর নিয়ন্ত্রণে একটি বড় ধরনের প্রশাসনিক ঘাটতির কথা বলা হয়েছে। দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন অনলাইন সম্প্রচার সেবায় সহজলভ্য অপরাধভিত্তিক ধারাবাহিক ও রোমাঞ্চধর্মী বিষয়বস্তু তরুণ দর্শকদের এমন সব গল্পের সংস্পর্শে আনছে, যেখানে মাদক গ্রহণ ও অপরাধজগতের ক্ষমতাকে অনেক সময় আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করা হয়। গণমাধ্যম সচেতনতার শিক্ষা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকা এবং অভিভাবকদের ডিজিটাল কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ সীমিত হওয়ায় এই প্রভাব অনেকাংশেই নিয়ন্ত্রণহীন থেকে যাচ্ছে।
পাঞ্জাবেও কাছাকাছি চিত্র দেখা যায়। গ্রাম ও আধা শহরাঞ্চলের তরুণদের মধ্যে স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক ব্যবহার জনস্বাস্থ্য গবেষকদের কাছে উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। মাদক সংস্কৃতিকে স্বাভাবিক হিসেবে উপস্থাপন করা গান ও স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিওসহ নানা ধরনের বিষয়বস্তুর সঙ্গে তরুণদের সম্পৃক্ততা নিয়ে সেখানে বারবার প্রশ্ন উঠেছে।
হরিয়ানা ও উত্তর প্রদেশেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যায়। ইন্টারনেট ব্যবহারের বিস্তার অনেক ক্ষেত্রে ডিজিটাল সচেতনতা ও অভিভাবকীয় নজরদারির চেয়ে দ্রুত এগিয়েছে। ফলে বিভিন্ন স্বয়ংক্রিয় সুপারিশ ব্যবস্থার মাধ্যমে বারবার প্রচারিত এমন বিষয়বস্তুর জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে, যেখানে অপরাধজগতের জীবনধারাকে আকর্ষণীয় করে দেখানো হয়। বাংলাদেশের গবেষকেরা যে নিয়ন্ত্রণহীনতার কথা উল্লেখ করেছেন, তার সঙ্গে এই বাস্তবতার যথেষ্ট মিল রয়েছে।
বেকারত্ব: অভিন্ন একটি মূল কারণ
দুই দেশের পরিস্থিতিতেই বেকারত্বকে সংকটের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে দেখা যায়। বাংলাদেশের তরুণদের মাদকাসক্তির অন্যতম কারণ হিসেবে বেকারত্বের পাশাপাশি শিক্ষাজীবনে ব্যর্থতা ও পারিবারিক অস্থিরতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাঞ্জাবে তরুণদের বেকারত্বকে দীর্ঘদিন ধরে রাজ্যটির বহুল আলোচিত কৃত্রিম মাদক ও আফিমজাত মাদকের সংকটের একটি কাঠামোগত কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশেষ করে স্থায়ী কর্মসংস্থান না থাকা তরুণ পুরুষদের একটি অংশ এমন অনানুষ্ঠানিক সামাজিক পরিমণ্ডলে জড়িয়ে পড়ে, যেখানে মাদকের সহজলভ্যতা বেশি।
হরিয়ানাতেও কাছাকাছি পরিস্থিতি রয়েছে। বিশেষ করে দিল্লির আশপাশের জেলাগুলোতে শিক্ষিত কিন্তু পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান না পাওয়া তরুণদের মধ্যে অবসর সময়ের অপব্যবহার ও সামাজিক মর্যাদা হারানোর অনুভূতির সঙ্গে মাদকনির্ভরতার সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
ভারতের সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য উত্তর প্রদেশে বেকার তরুণদের সংখ্যা বিপুল। একই সঙ্গে পরামর্শসেবা ও পেশাগত পুনর্বাসনের সুযোগও সীমিত। বাংলাদেশের পরিস্থিতিতে যে চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধার ঘাটতির কথা উঠে এসেছে, তার সঙ্গে উত্তর প্রদেশের বাস্তবতারও মিল রয়েছে। সেখানেও বিদ্যমান সুবিধাগুলো প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল এবং প্রধানত শহরকেন্দ্রিক।
পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা ও সামাজিক সহায়তার ক্ষয়
বাংলাদেশের বিশ্লেষণে মাদকাসক্তিকে সামাজিক জীবনের মৌলিক কাঠামোকে দুর্বল করে দেওয়া একটি সমস্যা হিসেবে দেখা হয়েছে। মাদকাসক্তির কারণে পরিবারে আর্থিক বিপর্যয় ও প্রজন্মান্তরে মানসিক আঘাত তৈরি হয়। মাদকাসক্ত বাবা বা মায়ের সন্তানদের মধ্যেও পরবর্তী জীবনে মাদক ব্যবহারের প্রবণতা তুলনামূলক বেশি দেখা যেতে পারে।
পাঞ্জাব ও হরিয়ানাতেও পারিবারিক বিচ্ছিন্নতার অনুরূপ চিত্র রয়েছে। কর্মসংস্থানের জন্য কর্মক্ষম বয়সী অনেক মানুষ বিদেশে অথবা ভারতের অন্য রাজ্যে চলে যাওয়ায় বহু পরিবারে কিশোরদের ওপর নজরদারির সক্ষমতা কমে গেছে। বিশেষ করে নারী বা বয়স্ক দাদা দাদির নেতৃত্বে পরিচালিত পরিবারগুলোতে এই সীমাবদ্ধতা আরও স্পষ্ট হতে পারে।
ঢাকা ও চট্টগ্রামেও পারিবারিক কাঠামো দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। নগরমুখী অভিবাসনের ফলে অনেক তরুণ বৃহত্তর পারিবারিক পরিমণ্ডল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ঘনবসতিপূর্ণ ও অপরিচিত নগর পরিবেশে বসবাস করছে। সেখানে পরিবারের তত্ত্বাবধানের পরিবর্তে অনেক সময় সমবয়সীদের অনানুষ্ঠানিক গোষ্ঠীই তাদের সামাজিক পরিমণ্ডলের প্রধান অংশ হয়ে উঠছে।
মানব উন্নয়ন সূচক কী বলছে
উন্নয়নের পরিসংখ্যান সীমান্তের দুই পাশে কেন একই ধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে, তা বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট দেয়। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির ২০২৫ সালের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ভারতের মানব উন্নয়ন সূচকের মান বেড়ে ০.৬৮৫ হয়েছে। ১৯৩টি দেশের মধ্যে দেশটির অবস্থান ১৩০তম। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও মানব উন্নয়ন সূচকের মান ০.৬৮৫। ফলে দুই দেশের অবস্থান এখন একই, যেখানে ২০২১ সালের র্যাংকিংয়ে দুই দেশের মধ্যে যে ব্যবধান ছিল, তা কার্যত ঘুচে গেছে।
বিশেষভাবে লক্ষণীয় হলো, ভারতের মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন বাংলাদেশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হলেও দুই দেশের মানব উন্নয়ন সূচক প্রায় সমান। এর মধ্য দিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে আসে: শুধু আয় বৃদ্ধি মানুষের সামগ্রিক উন্নয়ন নিশ্চিত করে না।
দুই দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের এই সাদৃশ্য, অর্থনৈতিক কাঠামোর পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও, ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে কেন ইন্টারনেটনির্ভর সামাজিক প্রভাব, বেকারত্বজনিত চাপ এবং পারিবারিক বিচ্ছিন্নতার কারণে তরুণদের ঝুঁকিও দুই দেশে কাছাকাছি।
দুই দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এখনো তরুণদের মানসিক সুস্থতা, শিক্ষার মান এবং পারিবারিক সহায়তার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোকে পর্যাপ্তভাবে শক্তিশালী করতে পারেনি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বৈষম্য সমন্বিত মানব উন্নয়ন সূচকের ব্যবধানও বেড়েছে। ২০২১ সালে প্রচলিত মানব উন্নয়ন সূচকের তুলনায় ব্যবধান ছিল ২৩ শতাংশ, যা দুই বছর পর বেড়ে ৩০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ মানব উন্নয়নের ক্ষেত্রে বৈষম্য জাতীয় পর্যায়ের অর্জনকে ক্রমেই ক্ষয় করছে। পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও উত্তর প্রদেশের বিভিন্ন জেলার অসম উন্নয়নের মধ্যেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যায়।
অভিন্ন আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জ
শেষ পর্যন্ত দ্য অনিকেট বুলেটিন-এ বাংলাদেশের মাদক সমস্যা নিয়ে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা কোনো বিচ্ছিন্ন জাতীয় সংকট নয়। বরং দ্রুত ডিজিটাল সংযোগ, কর্মসংস্থান সৃষ্টির সীমিত সক্ষমতা এবং দুর্বল হয়ে পড়া পারিবারিক কাঠামো যখন মাঝারি মাত্রার মানব উন্নয়নের বাস্তবতার সঙ্গে মিলিত হয়, তখন তরুণদের জন্য যে ঝুঁকি তৈরি হয়, তার একটি আঞ্চলিক প্রতিফলন দেখা যায়।
দুই দেশের নীতিনির্ধারণে নারী ও পুরুষের ভিন্ন বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে পুনর্বাসন ব্যবস্থা, স্থানীয় পর্যায়ে প্রাথমিক হস্তক্ষেপ এবং গণমাধ্যমের বিষয়বস্তু নিয়ে সমন্বিত মানদণ্ড গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে সীমান্তের দুই পাশের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়াও প্রয়োজন।
কারণ আগামী প্রজন্মকে রক্ষা করার চ্যালেঞ্জ শুধু কোনো একটি দেশের ব্যর্থতার ফল নয়। এর পেছনে রয়েছে অভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক দুর্বলতা। সেই অভিন্ন সংকট মোকাবিলায় ভারত ও বাংলাদেশেরও প্রয়োজন হবে অভিন্ন অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আরও সমন্বিত, মানবিক এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতির পথে এগিয়ে যাওয়া।
তথ্যসূত্র
