সামিরা তাসনীম
শিক্ষক
বান্দরবানের লেমুঝিরিতে পাহাড়ি ঝরনা ও কৃষিজমিতে পৌর বর্জ্য এবং চিকিৎসাবর্জ্য ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা শুধু একটি পরিবেশগত বিপর্যয় নয়; এটি স্থানীয় শাসনব্যবস্থা, নাগরিক অধিকার, জনস্বাস্থ্য, জীবিকা ও পার্বত্য অঞ্চলের সামাজিক সম্প্রীতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় চর্চা প্রকৃতি ও ভূমির সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। ফলে পরিবেশের ওপর এমন আঘাত তাদের দৈনন্দিন জীবনকে যেমন বিপন্ন করে, তেমনি রাষ্ট্র ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে বিদ্যমান আস্থার সংকটকেও আরও গভীর করতে পারে। এই প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য হলো লেমুঝিরির ঘটনাকে বৃহত্তর পরিবেশগত ন্যায়বিচার, নাগরিক অধিকার এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক সম্প্রীতির প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করা।
জুলাইয়ের ৬ থেকে ১৩ তারিখের বন্যায় বান্দরবান-রোয়াংছড়ি সড়কের পাশে পৌরসভার অস্থায়ী বর্জ্য ফেলার স্থান থেকে বর্জ্য পাহাড়ি ঝরনায় গিয়ে পড়ে। পরে সেই বর্জ্য পানির স্রোতে ভেসে লেমুঝিরির আগা ঘোনা পাড়ার কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়ে। প্রায় ১০ একর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি কৃষকরা মাটির মধ্যে সিরিঞ্জ, ইনজেকশনের সুচ, ভাঙা কাচ ও প্লাস্টিকের সন্ধান পাচ্ছেন। ঝরনার পানি ব্যবহারের ফলে স্থানীয়দের ত্বকে চুলকানি ও নানা সমস্যা দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে পাশের একটি বৌদ্ধ বিহারের ধর্মীয় কার্যক্রমও দুর্গন্ধ ও দূষণের কারণে ব্যাহত হচ্ছে।
ঘটনাটি দেখিয়ে দেয়, দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কীভাবে পরিবেশগত সমস্যাকে দ্রুত জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও সামাজিক সম্প্রীতির সংকটে রূপ দিতে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দীর্ঘদিনের সমস্যার পরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে দায় এড়ানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা ও পরিবেশ বিপর্যয়
লেমুঝিরির সংকটের মূল কারণ শুধু অতিবৃষ্টি বা বন্যা নয়; এর পেছনে রয়েছে অনিরাপদ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। পাহাড়ের ঢালে অস্থায়ীভাবে বর্জ্য ফেলার ব্যবস্থা বর্ষাকালে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, তা এই ঘটনায় স্পষ্ট হয়েছে। বর্জ্যের সঙ্গে চিকিৎসা উপকরণ মিশে গিয়ে পানির উৎস ও কৃষিজমিকে দূষিত করেছে। প্রায় ১০ একর কৃষিজমির ক্ষতি স্থানীয় অর্থনীতির জন্যও বড় আঘাত। কৃষকদের হিসাব অনুযায়ী বছরে পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা পর্যন্ত আয় হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। জমি পুনরুদ্ধার না হলে এই ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে।
পরিবেশগত সংকট থেকে সামাজিক অবিশ্বাস
পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি, সম্পদ ও প্রশাসনিক অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিনের জটিলতা রয়েছে। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি শান্তি ও পুনর্মিলনের একটি কাঠামো তৈরি করলেও এর পূর্ণ বাস্তবায়ন এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় হিসেবেই রয়ে গেছে। এই বাস্তবতায় কোনো আদিবাসী সম্প্রদায়ের বসতি, কৃষিজমি কিংবা ধর্মীয় স্থাপনার আশপাশে দীর্ঘদিন ধরে বর্জ্য জমে থাকা শুধু স্থানীয় প্রশাসনিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখা যায় না। এর ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার প্রশ্নও তৈরি করে। বিশেষ করে কোনো বৌদ্ধ বিহারের পরিবেশ বছরের পর বছর দূষিত থাকার অভিযোগ থাকলে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে অবহেলার অনুভূতি তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
পরিবেশগত ন্যায়বিচারের অভাব তাই সামাজিক সম্প্রীতির ওপরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। যে অঞ্চলে ঐতিহাসিকভাবে রাষ্ট্র ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সম্পর্ক সংবেদনশীল, সেখানে নাগরিক সেবা প্রদানে বৈষম্য বা অবহেলার ধারণা আরও বড় সামাজিক বিভাজনের জন্ম দিতে পারে।
নাগরিক অধিকার ও জনস্বাস্থ্যের প্রশ্ন
পরিষ্কার পানি, নিরাপদ পরিবেশ, স্বাস্থ্যকর জীবন ও জীবিকার সুযোগ, এসব কোনো বিলাসিতা নয়; নাগরিক কল্যাণের মৌলিক উপাদান। লেমুঝিরিতে পানির উৎস দূষিত হওয়ায় মানুষের দৈনন্দিন জীবন সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। চিকিৎসাবর্জ্যের উপস্থিতি সম্ভাব্য সংক্রমণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টিকে আরও গুরুতর করে তুলেছে।
কৃষিজমিতে সুচ, সিরিঞ্জ ও ভাঙা কাচ পাওয়া শুধু কৃষির জন্য সমস্যা নয়; কৃষক ও শ্রমিকদের শারীরিক নিরাপত্তার জন্যও তা বিপজ্জনক। একইভাবে, দুর্গন্ধের কারণে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হওয়া নাগরিক মর্যাদা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে।
দায় নির্ধারণ ও প্রশাসনিক সমন্বয়
এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রশাসনিক দায় নির্ধারণ। কোনো এলাকা পৌরসভার বাইরে, এই যুক্তি দিয়ে দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত নয়, বিশেষ করে যখন একটি প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য অন্য এলাকার মানুষ ও পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
পরিবেশগত দুর্যোগ প্রশাসনিক সীমানা মানে না। তাই পৌরসভা, জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োজন। দায়িত্ব কার, এই প্রশ্নের চেয়ে জরুরি হওয়া উচিত, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সুরক্ষা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে।
প্রতিকারে যা করনীয়
প্রথমত, চিকিৎসাবর্জ্যসহ সব ধরনের দূষিত বর্জ্য নিরাপদ ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে অপসারণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, অস্থায়ী ডাম্পিং সাইটটি বন্ধ করে পরিবেশসম্মত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তৃতীয়ত, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে ক্ষতিপূরণ এবং জমি পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।
চতুর্থত, পানি ও মাটির বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা করে দূষণের মাত্রা নির্ধারণ করা জরুরি। পঞ্চমত, আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। ষষ্ঠত, ভবিষ্যতে এমন ঘটনায় প্রশাসনিক দায় এড়ানোর সুযোগ বন্ধ করে একটি সমন্বিত জরুরি প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
উপসংহার
লেমুঝিরির ঘটনা একটি ঝরনা দূষিত হওয়ার চেয়ে অনেক বড় সংকেত বহন করে। এটি দেখায়, পরিবেশ রক্ষা, নাগরিক অধিকার, জনস্বাস্থ্য, জীবিকা এবং আঞ্চলিক সম্প্রীতি, সবগুলো বিষয় একই সুতোয় বাঁধা। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো সংবেদনশীল অঞ্চলে পরিবেশগত অবহেলা সামাজিক অবিশ্বাসকে আরও গভীর করতে পারে। তাই লেমুঝিরির সংকটকে বিচ্ছিন্ন একটি স্থানীয় ঘটনা হিসেবে না দেখে পরিবেশগত ন্যায়পরায়ণতা ও দায়িত্বশীল স্থানীয় শাসনের পরীক্ষাক্ষেত্র হিসেবে দেখা প্রয়োজন। দ্রুত বর্জ্য অপসারণ, ক্ষতিপূরণ ও স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসন নিশ্চিত করতে হবে। পাহাড়ের পানি ও মাটি রক্ষা করা শুধু পরিবেশ সংরক্ষণ নয়, তা মানুষের অধিকার, জীবিকা এবং পার্বত্য অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও সম্প্রীতি রক্ষারও পূর্বশর্ত।
