মিও ওকালিন্ডে
মালয়া বিশ্ববিদ্যালয়
সাম্প্রতিক দশকগুলোর উন্নয়নবিষয়ক গবেষণায় বাংলাদেশ ও ইথিওপিয়াকে প্রায়ই পাশাপাশি আলোচনায় আনা হয়। উভয় দেশই দীর্ঘ সময়ের ধারাবাহিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে দারিদ্র্য কমাতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বহিরাগত অভিঘাত ও কাঠামোগত দুর্বলতার চাপে সেই অগ্রগতির গতি কমেছে, কোথাও কোথাও আবার পেছনের দিকে ফিরেছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক বিভিন্ন মূল্যায়নের ভিত্তিতে এই বিশ্লেষণে দুই দেশের কৃষি প্রবৃদ্ধি ও সুশাসনের মান কীভাবে দারিদ্র্যের গতিপথ এবং গ্রামীণ উন্নয়নের ফলাফলকে প্রভাবিত করেছে, তা তুলনা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ: ধীর হয়ে আসা সাফল্যের গল্প
২০১০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশের দারিদ্র্য হ্রাসের সাফল্য বৈশ্বিক উন্নয়নের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য অর্জনগুলোর একটি। বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ দারিদ্র্য ও সমতা মূল্যায়ন অনুযায়ী, ওই সময়ে চরম দারিদ্র্যের হার প্রায় ১২.২ শতাংশ থেকে কমে ৫.৬ শতাংশে নেমে আসে। একই সময়ে মধ্যম মাত্রার দারিদ্র্যের হার প্রায় ৩৭.১ শতাংশ থেকে কমে ১৮.৭ শতাংশে দাঁড়ায়। সামগ্রিকভাবে প্রায় আড়াই কোটি মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসে। এই অগ্রগতির বড় অংশ এসেছে গ্রামীণ এলাকা থেকে। কৃষি উৎপাদনের পুনরুদ্ধারও সেখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে শহরের তুলনায় গ্রামীণ এলাকায় দারিদ্র্য দ্রুত হ্রাস পেয়েছে।
তবে বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, সেই অগ্রগতির গতি এখন উল্টো দিকে ঘুরেছে। ২০২২ সালে ১৮.৭ শতাংশ থাকা জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০২৫ সালের মধ্যে ২১ শতাংশের বেশি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ দরিদ্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের মতে, কর্মসংস্থান সৃষ্টির দুর্বলতা, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি এবং এমন একটি শ্রমবাজার, যেখানে সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী নতুন কর্মসংস্থানের প্রায় ৬৩ শতাংশই উচ্চ উৎপাদনশীল খাতের পরিবর্তে নিম্ন আয়ের কৃষিকাজে কেন্দ্রীভূত হয়েছে, এই বিপরীতমুখী প্রবণতার প্রধান কারণ।
একই সঙ্গে প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ, অর্থাৎ দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ, একটি মাত্র অভিঘাতের কারণে আবার দারিদ্র্যে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। অসুস্থতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা পণ্যের আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধির মতো ঘটনা তাদের জীবন ও আয়ের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
অর্থনৈতিক চাপের সঙ্গে সুশাসনের দুর্বলতাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। দুর্নীতির বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান এখনো দুর্বল। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০১৬ সালের পর মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধিকে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর কল্যাণে রূপ দেওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা দুর্বল হয়েছে। আয় বৃদ্ধির সুবিধা ক্রমেই দরিদ্রতম জনগোষ্ঠীর তুলনায় অপেক্ষাকৃত সচ্ছল পরিবারগুলোর দিকে বেশি গেছে।
কৃষি এখনো দেশের মোট দেশজ উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। তবে নতুন শ্রমশক্তিকে উৎপাদনশীলভাবে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে কৃষির সক্ষমতা সীমায় পৌঁছাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। ফলে উচ্চ মজুরির শিল্প ও সেবা খাতে কর্মসংস্থান বাড়িয়ে অর্থনীতিতে বহুমুখীকরণ আনা এখন বাংলাদেশের জন্য আরও জরুরি হয়ে উঠছে।
ইথিওপিয়া: আরও তীব্র পশ্চাদপসরণ
ইথিওপিয়ার অভিজ্ঞতা আরও তীব্র ও নাটকীয় পশ্চাদপসরণের চিত্র তুলে ধরে। ২০০০ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে দেশটিকে আফ্রিকার উন্নয়নের একটি সফল উদাহরণ হিসেবে প্রায়ই তুলে ধরা হতো। শক্তিশালী কৃষি প্রবৃদ্ধি এবং অবকাঠামোতে ব্যাপক বিনিয়োগের ফলে ওই সময়ে দারিদ্র্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছিল।
কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই অগ্রগতি দ্রুত ক্ষয় হয়েছে। দৈনিক তিন মার্কিন ডলারের দারিদ্র্যসীমা অনুযায়ী বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০১৬ সালে ইথিওপিয়ায় দারিদ্র্যের হার ছিল প্রায় ৩৩ শতাংশ, যা ২০২১ সালে বেড়ে ৩৯ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০২৫ সালে এই হার ৪৩ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
এই পশ্চাদপসরণের পেছনে প্রধানত সংঘাত, জলবায়ুজনিত অভিঘাত এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার সমন্বিত প্রভাব রয়েছে। তিগ্রাই সংঘাতের কারণে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং মানবিক সহায়তা ও পুনর্গঠন বাবদ আনুমানিক ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রয়োজন তৈরি হয়েছে। বারবার দেখা দেওয়া খরায় গ্রামীণ মানুষের জীবিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখনো প্রায় দেড় কোটি ইথিওপীয় খাদ্য সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।
ইথিওপিয়ার মোট জনসংখ্যার প্রায় তিন-চতুর্থাংশ গ্রামীণ এলাকায় বসবাস করে এবং শ্রমশক্তির প্রায় ৭০ শতাংশ এখনো কৃষির ওপর নির্ভরশীল। ফলে সংঘাত, জলবায়ু বিপর্যয় ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার অভিঘাত গ্রামীণ পরিবারগুলোর ওপর অসমভাবে বেশি পড়েছে। বিশ্বব্যাংক এই প্রবণতাকে ইথিওপিয়ার দারিদ্র্যের গ্রামীণ চরিত্র আরও তীব্র হওয়া হিসেবে বর্ণনা করেছে।
মানবসম্পদের ঘাটতিও গ্রামীণ উন্নয়নের সম্ভাবনাকে সীমিত করছে। ২০২১ সালের হিসাবে, গ্রামীণ এলাকার প্রায় ৮৬ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করতে পারেননি। প্রায় অর্ধেক গ্রামীণ পরিবারে অন্তত একজন খর্বাকৃতির শিশুর উপস্থিতি ছিল। বিদ্যুৎ ও পয়ঃনিষ্কাশনের মতো মৌলিক অবকাঠামো ব্যবহারের সুযোগও দেশের সবচেয়ে ধনী এক-পঞ্চমাংশ মানুষের মধ্যে সবচেয়ে দরিদ্র এক-পঞ্চমাংশের তুলনায় তিন থেকে চার গুণ বেশি ছিল।
সুশাসনের দুর্বলতাও পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। ২০২৩ সালে ইথিওপিয়া তার সার্বভৌম ঋণের দায় পরিশোধে ব্যর্থ হয়। এরপর ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের যৌথ মূল্যায়নে দেশটির বৈদেশিক ঋণকে টেকসই নয় বলে ঘোষণা করা হয়। এর ফলে গ্রামীণ বিনিয়োগ ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে ব্যয় করার জন্য সরকারের আর্থিক সক্ষমতা আরও সংকুচিত হয়েছে।
কৃষি প্রবৃদ্ধি ও সুশাসনের তুলনা
দুই দেশের অভিজ্ঞতাই দেখায়, কৃষিনির্ভর প্রবৃদ্ধি উন্নয়নের প্রাথমিক পর্যায়ে দারিদ্র্য দ্রুত কমাতে পারে। তবে এর সঙ্গে অর্থনীতির কাঠামোগত রূপান্তর না ঘটলে সেই অর্জন কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন থেকে যায়।
২০১৬ সালের পর বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনের পুনরুদ্ধার গ্রামীণ দারিদ্র্যকে শহুরে দারিদ্র্যের তুলনায় দ্রুত কমাতে সহায়তা করেছিল। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণ বলছে, এর ফলে সৃষ্ট কর্মসংস্থানের বড় অংশই ছিল নিম্ন উৎপাদনশীল প্রকৃতির। ফলে শুধু কৃষির সম্প্রসারণের ওপর নির্ভর করে দারিদ্র্য হ্রাসের আরও অগ্রগতি অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
ইথিওপিয়ার ক্ষেত্রেও আগের কৃষি প্রবৃদ্ধির পর্যায় পর্যাপ্ত উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি কিংবা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারেনি। বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, দেশটির শ্রমবাজারে প্রতি বছর প্রায় ১৮ লাখ নতুন চাকরিপ্রার্থী প্রবেশ করে। কৃষি ও অন্যান্য খাত এই বিপুল সংখ্যক নতুন শ্রমশক্তিকে যথেষ্ট উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান দিতে না পারায় বহিরাগত অভিঘাত দেখা দিলে অর্থনীতি আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।
সুশাসনের ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। দুর্নীতি প্রতিরোধে দুর্বল অবস্থান এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ তুলনামূলক সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে পেরেছে এবং সার্বভৌম ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার মুখে পড়েনি। ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারের মাধ্যমে দারিদ্র্য বৃদ্ধির প্রবণতা মোকাবিলায় বাংলাদেশের হাতে তুলনামূলকভাবে বেশি নীতিগত সুযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে ইথিওপিয়ায় অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও আনুষ্ঠানিক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার সঙ্গে সুশাসনের সংকট যুক্ত হয়েছে। এর ফলে গ্রামীণ দারিদ্র্য যখন আরও তীব্র হচ্ছে, ঠিক তখনই গ্রামীণ বিনিয়োগ ও সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় করার জন্য সরকারের আর্থিক সক্ষমতা সংকুচিত হয়েছে।
উপসংহার
বিশ্বব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ও ইথিওপিয়ার তুলনামূলক চিত্র থেকে দুটি দেশের এমন একটি উন্নয়ন অভিজ্ঞতা সামনে আসে, যেখানে প্রাথমিক সাফল্য প্রত্যাশার তুলনায় কম টেকসই হয়েছে।
বাংলাদেশের বর্তমান ধীরগতি মূলত এমন একটি পরিণত অর্থনীতির সংকটকে তুলে ধরে, যা এখনো নিম্ন উৎপাদনশীল কৃষিনির্ভর কর্মসংস্থান থেকে বেরিয়ে আসতে এবং ক্রমবর্ধমান বৈষম্য মোকাবিলা করতে সংগ্রাম করছে। অন্যদিকে ইথিওপিয়ার পশ্চাদপসরণ আরও তীব্র। সেখানে সংঘাত, জলবায়ু ঝুঁকি ও আর্থিক সংকটের সঙ্গে দুর্বল গ্রামীণ মানবসম্পদের সমস্যাও যুক্ত হয়েছে।
দুই দেশের ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদে গ্রামীণ দারিদ্র্য কমানোর সাফল্য শুধু কৃষি প্রবৃদ্ধির ওপর নির্ভর করবে না। বরং বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো, মানবসম্পদে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থানের বহুমুখীকরণ এবং ভবিষ্যৎ অভিঘাত মোকাবিলায় রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর মতো সুশাসনভিত্তিক সংস্কার আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
কৃষি দারিদ্র্য কমানোর একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে, কিন্তু একে একমাত্র সমাধান হিসেবে দেখলে উন্নয়নের পরবর্তী ধাপে পৌঁছানো কঠিন। টেকসই গ্রামীণ উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান, দক্ষ মানবসম্পদ, কার্যকর প্রতিষ্ঠান এবং এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো, যা সংকটের সময়ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দিতে পারে।
