নাঈমা অনামিকা
কমিশনিং সম্পাদক, অনিকেত বুলেটিন
নীতিগত প্রস্তুতিতে ভারতের এগিয়ে থাকা
ভারতের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আসার আগেই শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়নের একটি নীতিগত ভিত্তি তৈরি হয়েছিল। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০ শিক্ষার্থীদের সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা এবং ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিল। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের মাধ্যমে স্কুল পর্যায়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কিত শিক্ষা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জাতীয় পর্যায়েও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে কাগজে কলমে নীতিগত প্রস্তুতি থাকলেই বাস্তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গ্রহণ নিশ্চিত হয় না। ভারতের বড় শহরের নামী বেসরকারি স্কুল ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে তুলনামূলকভাবে এগিয়ে থাকলেও অনেক সরকারি ও গ্রামীণ বিদ্যালয়ে এখনও নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট, প্রয়োজনীয় ডিভাইস এবং প্রশিক্ষিত শিক্ষক পর্যাপ্ত নয়। ফলে ভারতেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শিক্ষায় একটি নতুন ডিজিটাল বৈষম্য তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ: মুখস্থনির্ভর শিক্ষা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ আরও ভয়াবহ। বিভিন্ন তথ্যসূত্র এবং বিশেষজ্ঞদের প্রকাশিত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখনও উল্লেখযোগ্যভাবে মুখস্থনির্ভরতার ওপর নির্ভরশীল।
এ ধরনের শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীর মূল্যায়ন অনেক সময় তার চিন্তা, অনুসন্ধান ও যুক্তি প্রদর্শনের পরিবর্তে চূড়ান্ত উত্তর বা লিখিত ফলাফলের ওপর নির্ভর করে। ফলে জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহজেই শিক্ষার্থীর হয়ে পুরো নির্ধারিত কাজ বা লেখার কাজ তৈরি করে দিতে পারে। এখানে সমস্যাটি শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে নকল করা নয়। আরও বড় সমস্যা হলো, শিক্ষার্থী নিজে চিন্তা করার প্রক্রিয়াটি এড়িয়ে যাচ্ছে কি না। তাই বাংলাদেশের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতির প্রথম কাজ হওয়া উচিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিষিদ্ধ করা নয়; বরং শিক্ষার্থীর চিন্তা, গবেষণা, বিশ্লেষণ ও সৃজনশীলতাকে মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা।
শিক্ষক: দুই দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে শিক্ষায় সফলভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ করতে হবে শিক্ষকদের ওপর। বাংলাদেশে অনেক শিক্ষক ইতোমধ্যেই অতিরিক্ত কর্মভার, সীমিত বেতন এবং ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষাদানের অতিরিক্ত চাপের মধ্যে কাজ করেন। ফলে নতুন প্রযুক্তি শেখার জন্য প্রয়োজনীয় সময় ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রণোদনা অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত।
ভারতে শিক্ষক প্রশিক্ষণের পরিধি তুলনামূলকভাবে বড় হলেও একই ধরনের সমস্যা রয়েছে। বিশেষ করে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং পেশাগত দক্ষতার সীমাবদ্ধতার কারণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নতুন শিক্ষাদান পদ্ধতি গ্রহণের ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছেন।
শিক্ষকদের শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভিন্ন সরঞ্জাম ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দিলেই হবে না। তাদের শেখাতে হবে কখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করা উচিত, কখন নয় এবং কীভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে তৈরি তথ্য যাচাই করতে হয়।
মূল্যায়ন পদ্ধতিতে মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন
জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতাটি মূল্যায়ন পদ্ধতির ক্ষেত্রে প্রকাশ করেছে। যদি শিক্ষার্থীকে শুধু এক হাজার শব্দের একটি নির্ধারিত কাজ জমা দিতে বলা হয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কয়েক সেকেন্ডেই তা তৈরি করতে পারে। কিন্তু যদি মূল্যায়নে থাকে:
• গবেষণার প্রাথমিক ধারণা
• খসড়া ও সংশোধন
• ব্যক্তিগত উপলব্ধি
• মৌখিক উপস্থাপনা
• মৌখিক পরীক্ষা বা মৌখিক ব্যাখ্যা
• শ্রেণিকক্ষের আলোচনা
তাহলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষার্থীর হয়ে পুরো শেখার প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে পারবে না।
ভারত ও বাংলাদেশ উভয় দেশের জন্য তাই শুধু চূড়ান্ত ফলভিত্তিক মূল্যায়ন থেকে শেখার প্রক্রিয়াভিত্তিক মূল্যায়নে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের সুস্পষ্ট নীতিমালা
উচ্চশিক্ষায় সমস্যাটি আরও জটিল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের অনুমোদিত ও অননুমোদিত ক্ষেত্র নিয়ে স্পষ্ট নীতিমালা না থাকলে একই ধরনের কাজের জন্য একজন শিক্ষার্থী শাস্তি পেতে পারেন, অন্য প্রতিষ্ঠানে সেটিই গ্রহণযোগ্য হতে পারে।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিষয়ভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতি গড়ে তোলা জরুরি। যেমন:
• গবেষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় সাহিত্য অনুসন্ধান কতটুকু গ্রহণযোগ্য
• প্রোগ্রাম তৈরিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি সংকেত বা নির্দেশনা ব্যবহারের নিয়ম কী
• অনুবাদ বা ভাষা সংশোধনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার কতটুকু অনুমোদিত
• গবেষণাপত্র বা অভিসন্দর্ভে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের তথ্য কীভাবে প্রকাশ করতে হবে
• কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি লেখার দায় কার
ভারতের ক্ষেত্রেও জাতীয় পর্যায়ের নির্দেশনার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় ও বিষয়ভিত্তিক বাস্তবায়ন প্রয়োজন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিষিদ্ধ নয়, দায়িত্বশীলভাবে গ্রহণ
শিক্ষাক্ষেত্রে জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন হওয়া উচিত নিষেধাজ্ঞা থেকে দায়িত্বশীল ব্যবহারের দিকে যাওয়া। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কেবল নকলের মাধ্যম হিসেবে দেখলে শিক্ষার্থীরা গোপনে তা ব্যবহার করবে। বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ে জ্ঞান ও দক্ষতা শিক্ষার অংশ হলে শিক্ষার্থীরা জানতে পারবে:
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কী করতে পারে, কী করতে পারে না এবং কখন মানুষের নিজস্ব চিন্তা অপরিহার্য।
এ ক্ষেত্রে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ে জ্ঞান ও দক্ষতার পাঠ্যক্রম চালু করা যেতে পারে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা, স্বত্বাধিকার, ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য এবং শিক্ষাগত সততার বিষয়গুলোও বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
ভারত ও বাংলাদেশের জন্য অভিন্ন নীতিগত করণীয়
দুই দেশের বাস্তবতা থেকে কয়েকটি অভিন্ন নীতিগত অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা যায়:
• কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ে জ্ঞান ও দক্ষতাকে জাতীয় শিক্ষাক্রমের অংশ করতে হবে।
• শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত এবং বেতনসহ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক পেশাগত উন্নয়ন কর্মসূচি চালু করতে হবে।
• মূল্যায়ন পদ্ধতিতে মৌখিক পরীক্ষা, খসড়া, প্রকল্প এবং শ্রেণিকক্ষভিত্তিক মূল্যায়ন বাড়াতে হবে।
• বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিষয়ভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের নীতি তৈরি করতে হবে।
• গ্রামীণ ও সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল অবকাঠামোর বৈষম্য কমাতে হবে।
• প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সরকারকে যৌথভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উপযোগী পাঠ্যক্রম তৈরি করতে হবে।
• শিক্ষার্থীদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার শেখানোর পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতাও তৈরি করতে হবে।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, ভারত ও বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় জেনারেটিভ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আগমন মূলত একটি প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়; বরং একজন শিক্ষার্থীর দক্ষতা কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, সেই মৌলিক প্রশ্নগুলো সামনে নিয়ে এসেছে। ভারতের তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী নীতিগত কাঠামো দেশটিকে কিছুটা এগিয়ে রাখলেও বাস্তব প্রয়োগে ডিজিটাল বৈষম্য, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি রয়ে গেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ আরও গভীর। মুখস্থনির্ভর শিক্ষাকাঠামো এবং শিক্ষক প্রস্তুতির সীমাবদ্ধতা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে শিক্ষার সহায়ক প্রযুক্তির বদলে সহজ পথ হিসেবে ব্যবহারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
তবে দুই দেশের জন্যই মূল শিক্ষা একই: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে শিক্ষাব্যবস্থা থেকে দূরে রাখা সম্ভব নয়, আবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর শিক্ষাব্যবস্থাকে ছেড়েও দেওয়া যায় না। প্রয়োজন এমন একটি নীতিগত কাঠামো, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিক্ষার্থীর চিন্তার বিকল্প নয়, বরং চিন্তাকে আরও গভীর, সৃজনশীল ও কার্যকর করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
