সুমাইয়া হাসি
অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
চলতি বছরের ২৯ আগস্ট বাংলাদেশ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের মৃত্যুর ৫০ বছর পূর্তি পালন করবে। অর্ধশতাব্দী কম সময় নয়। এতটা সময় পেরিয়ে গেলে আবেগ ও শ্রদ্ধার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধের জায়গা থেকেও মূল্যায়ন করা যায়, জাতীয় কবিকে আমরা কতটা যথাযথ মর্যাদা দিতে পেরেছি।
দ্য অনিকেত বুলেটিনে তানজীনা ফেরদৌসের সাম্প্রতিক এক নিবন্ধে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে, নজরুল আজও কেন প্রাসঙ্গিক। নিবন্ধটিতে দেখানো হয়েছে, তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘বিদ্রোহী’ কীভাবে কোনো সিংহাসন কিংবা নিপীড়নের প্রতীক কোনো শক্তির কাছে মাথা নত করতে অস্বীকার করেছিল। ‘সাম্যবাদী’ ও ‘মানুষ’ কবিতায় তিনি জাতপাত ও শ্রেণিবৈষম্যের বিরুদ্ধে যে শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন, বাংলা সাহিত্যে তার নজির খুব বেশি নেই।
‘মানুষ’ কবিতায় নজরুলের সেই বক্তব্যও নিবন্ধে উঠে এসেছে, যেখানে তিনি মন্দির বা মসজিদের পরিবর্তে মানুষের কাছে পৌঁছানোকে প্রকৃত তীর্থযাত্রার সঙ্গে তুলনা করেছেন। ‘নারী’ কবিতায় তিনি ঘোষণা করেছিলেন, ইতিহাসের কোনো মহান অর্জনই নারীর সমান অংশগ্রহণ ছাড়া সম্ভব হয়নি।
নজরুল কে ছিলেন, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এই মূল্যবোধগুলোই যথেষ্ট। তবে তাঁর মৃত্যুর ৫০ বছর পূর্তিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন সামনে আসে: যে রাষ্ট্র তাঁকে জাতীয় কবির মর্যাদা দিয়েছে, সেই রাষ্ট্র কি তাঁর সাম্য ও ন্যায়ের আদর্শের প্রতি যথাযথ দায়িত্ব পালন করেছে?
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আছে, প্রাতিষ্ঠানিক যত্ন কতটা?
আনুষ্ঠানিক বিবেচনায় বাংলাদেশের অবস্থান অবশ্য যথেষ্ট সম্মানজনক। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে কলকাতা থেকে নজরুলকে ঢাকায় আনা হয়। ১৯৭৬ সালে তিনি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব লাভ করেন। তাঁর নিজের কবিতায় করা ইচ্ছা অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়। পরে সেখানে নির্মিত হয় তাঁর সমাধিসৌধ।
১৯৮৫ সালে সরকারি অধ্যাদেশের মাধ্যমে নজরুলের নামে একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটির নাম হয় জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউট। নজরুলের সাহিত্য নিয়ে গবেষণা, তাঁর সম্পূর্ণ রচনা প্রকাশ, নজরুলসংগীতের শিল্পীদের প্রশিক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তাঁর সাহিত্য ও স্মৃতি সংরক্ষণ করা প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম দায়িত্ব। কাগজে কলমে তাই নজরুলকে স্মরণ ও সংরক্ষণের জন্য রাষ্ট্রীয় কাঠামো রয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র আরও অসম।
প্রতিষ্ঠান আছে, পরিসর ও সক্ষমতা কতটা?
বর্তমানে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউট ধানমন্ডির একটি ছয়তলা ভবন থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সাবেক কর্মকর্তা ও গবেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বের তুলনায় এই অবকাঠামো যথেষ্ট নয়। প্রধান সড়ক থেকে কিছুটা আড়ালে আবাসিক এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় সাধারণ দর্শনার্থীদের অনেকের পক্ষেই প্রতিষ্ঠানটি খুঁজে পাওয়া সহজ নয়।
বড় অনুষ্ঠান আয়োজনের ক্ষেত্রেও প্রতিষ্ঠানটিকে প্রায়ই বাইরে মিলনায়তন ভাড়া করতে হয়। অর্থাৎ যে প্রতিষ্ঠানটি জাতীয় কবির সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার সংরক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে, তার নিজের আয়োজনে বড় অনুষ্ঠান করার মতো পর্যাপ্ত অবকাঠামোও নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নজরুল গবেষণা কেন্দ্রের অবস্থাও খুব আশাব্যঞ্জক নয়। ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কেন্দ্রের বর্তমান পরিচালকের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠার পর থেকে উল্লেখযোগ্য গবেষণার পরিমাণ খুবই কম। কলা ভবনের ভেতরে কেন্দ্রটির কার্যালয় এমনভাবে অবস্থিত যে সেখানে পৌঁছাতেও দর্শনার্থীদের যথেষ্ট খোঁজখবর করতে হয়।
নজরুলের পূর্ণাঙ্গ জীবনী রচনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন একাধিক গবেষক। তাঁদের মধ্যে আতাউর রহমান ও আবদুল মান্নান সৈয়দসহ কয়েকজন জীবনীকার কাজ শেষ করার আগেই মারা যান। ফলে নজরুলের জীবন, দর্শন ও সামগ্রিক সাহিত্যকর্ম নিয়ে এখনও একটি পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভরযোগ্য জীবনী এবং গবেষণাভিত্তিক সমন্বিত রেকর্ডের অভাব রয়েছে।
জাতীয় কবির স্বীকৃতিও এলো প্রায় পাঁচ দশক পরে
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো, বহু দশক ধরে জনপরিসরে নজরুলকে জাতীয় কবি হিসেবে পরিচিত করা হলেও রাষ্ট্রীয় গেজেটের মাধ্যমে তাঁর জাতীয় কবির মর্যাদা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পায় ২০২৪ সালে। অর্থাৎ মৃত্যুর প্রায় অর্ধশতাব্দী পর। বাংলার বাইরে নজরুলের সাহিত্য পৌঁছে দেওয়ার জন্য তাঁর নির্বাচিত রচনার ইংরেজি অনুবাদও প্রকাশিত হয়েছে চলতি বছর। তাঁর মৃত্যুর ৪৫ বছর পর এমন উদ্যোগ নেওয়া হলো।
এই বাস্তবতাগুলো প্রশ্ন তোলে, জাতীয় কবির সাহিত্য ও দর্শনকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কতটা অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বরং নজরুলের উত্তরাধিকারকে টিকিয়ে রাখার বড় অংশের দায়িত্ব দীর্ঘদিন ধরে পালন করেছেন তাঁর পরিবার, নিবেদিতপ্রাণ গবেষক, শিল্পী এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন। পুরোনো নজরুল একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠানও দীর্ঘদিন ধরে এই দায়িত্ব পালন করে এসেছে।
পরিবর্তনের উদ্যোগ কি যথেষ্ট?
তবে পরিস্থিতি বদলানোর কিছু লক্ষণ এখন দেখা যাচ্ছে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউটের বর্তমান নির্বাহী পরিচালক প্রকাশ্যেই বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে নজরুলকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। চলতি বছরের সরকারি উদ্যোগে নজরুল বর্ষ পালন, নতুন বই প্রকাশ এবং নজরুলের সাংবাদিকতা নিয়ে ডিপ্লোমা কোর্স চালুর প্রস্তাব থেকে বোঝা যায়, দেরিতে হলেও নজরুলকে নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নতুন করে ভাবার চেষ্টা শুরু হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাই সতর্ক করেছেন, একটি স্মরণবর্ষ দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের বিকল্প হতে পারে না। নজরুলকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও গবেষণার জন্য প্রয়োজন নিয়মিত অর্থায়ন, পর্যাপ্ত অবকাঠামো, একটি পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভরযোগ্য জীবনী এবং এমন গবেষণা কার্যক্রম, যা শুধু জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী ঘিরে কয়েকটি সেমিনারে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
নজরুল কি আগেই আমাদের সতর্ক করে যাননি?
নজরুল নিজেই যেন এই পরিস্থিতির পূর্বাভাস দিয়ে গিয়েছিলেন। ১৯৪২ সালে কলকাতায় দেওয়া তাঁর শেষ জনসম্মুখের ভাষণে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পর তাঁকে ঘিরে বড় বড় সভা হবে, তাঁকে দেশপ্রেমিক, শহীদ ও বিদ্রোহী হিসেবে প্রশংসা করে কবিতা লেখা হবে। কিন্তু তাঁর আদর্শকে বোঝার এবং বাস্তব জীবনে ধারণ করার কঠিন কাজটি হয়তো উপেক্ষিতই থেকে যাবে। নজরুলের মৃত্যুর ৫০ বছর পর দাঁড়িয়ে সেই আশঙ্কা অস্বস্তিকরভাবে প্রাসঙ্গিক মনে হয়।
ভালোবাসার চেয়ে দায়িত্ব বড়
কাজী নজরুল ইসলামকে সত্যিকার অর্থে সম্মান জানানো মানে শুধু আরেকটি স্মৃতিফলক উন্মোচন করা নয়। তাঁর গান নিয়ে আরেকটি আনুষ্ঠানিক সন্ধ্যা আয়োজন করাও যথেষ্ট নয়। তাঁকে সম্মান জানানোর অর্থ হলো, তাঁর সাহিত্য ও দর্শনকে ধারণ করার জন্য যে প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে, তাকে প্রয়োজনীয় অর্থ ও অবকাঠামো দেওয়া। যে পূর্ণাঙ্গ জীবনী রচনার কাজ তিন প্রজন্মের গবেষকদের অসমাপ্ত রেখে যেতে হয়েছে, তা সম্পন্ন করা। গবেষণা কেন্দ্রগুলোকে প্রয়োজনীয় জনবল ও পরিসর দেওয়া।
সবচেয়ে বড় কথা, সাম্য, ন্যায় ও মানবিক মর্যাদার যে দাবি নজরুল তাঁর সাহিত্যজুড়ে উচ্চারণ করেছেন, তাকে শুধু বক্তৃতা ও অনুষ্ঠানের অলংকার না বানিয়ে রাষ্ট্রীয় নীতি ও সামাজিক বাস্তবতায় প্রতিফলিত করা। পঞ্চাশ বছর পর বাংলাদেশের সামনে তাই প্রশ্নটি শুধু নজরুলকে আমরা কতটা ভালোবাসি, তা নয়। প্রশ্ন হলো, তাঁর আদর্শের প্রতি আমরা কতটা দায়িত্বশীল।
বাংলাদেশ নজরুলকে জাতীয় কবির মর্যাদা দিয়েছে। এখন প্রয়োজন সেই মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বও পালন করা। নজরুলের প্রতি রাষ্ট্রের ঋণ শুধু শ্রদ্ধার নয়, দায়িত্বেরও। আর সেই দায়িত্ব পালনে গত পাঁচ দশকে যে ঘাটতি রয়ে গেছে, তা আরেকটি স্মরণসভা দিয়ে পূরণ হবে না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার, গবেষণায় বিনিয়োগ এবং তাঁর সাম্যের দর্শনকে বাস্তব জীবনে প্রতিষ্ঠার আন্তরিক উদ্যোগ।
তথ্যসূত্র
