মেহরান সাজ্জাদ
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
প্রতি বছর ১৬ আগস্ট বাংলাদেশ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে এমন এক শিল্পীকে, যার গিটারের তারে ধরা পড়েছিল একটি প্রজন্মের অস্থিরতা, বেদনা, ভালোবাসা ও আশার গল্প। ১৯৬২ সালে চট্টগ্রামের পটিয়ায় জন্ম নেওয়া আইয়ুব বাচ্চু, যিনি সবার কাছে পরিচিত ছিলেন এবি নামে, ২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর চলে যান। কিন্তু বাংলাদেশের রক সংগীতে তার অবস্থান আজও অমলিন। তিনি শুধু গান পরিবেশন করেননি, বরং শূন্য থেকে বাংলাদেশের ব্যান্ড সংস্কৃতির ভিত গড়ে তুলেছিলেন। বাংলা রক সংগীতের সেই কিংবদন্তির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই এই লেখা।
সততা ও দক্ষতার ওপর দাঁড়ানো এক দর্শন
এবির কাছে সংগীত কখনোই শুধু চোখ ধাঁধানো পরিবেশনার বিষয় ছিল না। জিমি হেনড্রিক্স ও জো স্যাট্রিয়ানির মতো গিটারবাদকদের দ্বারা প্রভাবিত হলেও তিনি গিটারকে কেবল কারিগরি দক্ষতা প্রদর্শনের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি। তার কাছে গিটার ছিল আবেগ ও অনুভূতির সত্য প্রকাশের একটি মাধ্যম। তিনি বিশ্বাস করতেন, কারিগরি কৌশলের আগে অনুভূতির গুরুত্ব দিতে হবে। তার সবচেয়ে জটিল গিটার একক পরিবেশনাগুলোও ছিল গানের আবহ ও অনুভূতিকে তুলে ধরার জন্য, গানকে ছাপিয়ে যাওয়ার জন্য নয়।
বাংলাদেশি সংগীতশিল্পীদের আন্তর্জাতিক মানের শিল্পীদের মতোই নিজেদের বাদ্যযন্ত্রে দক্ষ হওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি বারবার বলেছেন। এমন এক সময়ে তিনি বাদ্যযন্ত্রনির্ভর সংগীতচর্চাকে গুরুত্ব দিয়েছেন, যখন একটি ব্যান্ডে গায়করাই ছিলেন মূল আকর্ষণ এবং অন্য শিল্পীরা অনেকটা আড়ালে থাকতেন।
একটি ব্যান্ডের প্রত্যেক সদস্যের শিল্পীসত্তা ও দক্ষতার সমান মূল্য রয়েছে, এবির এই বিশ্বাস ধীরে ধীরে বাংলাদেশের শ্রোতাদের ব্যান্ড সম্পর্কে ধারণাই বদলে দেয়। ব্যান্ড আর শুধু একজন গায়কের সঙ্গে কয়েকজন অজ্ঞাতনামা বাদ্যযন্ত্রশিল্পীর সমন্বয় নয়। বরং এটি হয়ে ওঠে সমান গুরুত্বপূর্ণ শিল্পীদের একটি সম্মিলিত সত্তা।
রক সংগীত ও ব্যান্ড সংস্কৃতিতে নতুন দিগন্ত
এবির সংগীতজীবনের শুরু ১৯৭৪ সালে স্পাইডার ব্যান্ডের মাধ্যমে। এরপর তিনি যুক্ত হন আর্লি বয়েজ ও ফিলিংসের সঙ্গে। ১৯৮০ সালে সোলসের সঙ্গে তার পথচলা শুরু হয়, যা এক দশক ধরে তাকে আরও পরিণত শিল্পী হিসেবে গড়ে তোলে। সোলসের সঙ্গে তিনি চারটি স্টুডিও অ্যালবামে কাজ করেন।
১৯৯১ সালে তিনি নিজের ব্যান্ড গড়ে তোলেন। শুরুতে নাম ছিল লিটল রিভার ব্যান্ড, পরে যার নাম হয় এলআরবি, অর্থাৎ লাভ রান্স ব্লাইন্ড। খুব দ্রুত এই নামটি বাংলাদেশের একটি পুরো সংগীত যুগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।
১৯৯১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত এলআরবি ১৩টি স্টুডিও অ্যালবাম, একটি লাইভ অ্যালবাম এবং দুটি সংকলন অ্যালবাম প্রকাশ করে। নিউইয়র্কের ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে পরিবেশন করা একমাত্র বাংলাদেশি রক ব্যান্ড হিসেবেও এলআরবি ইতিহাসে জায়গা করে নেয়। এই অর্জন বাংলাদেশের রক সংগীতকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে একটি নতুন পরিচয় এনে দেয়।
ব্যান্ডের কাজের পাশাপাশি এবি গড়ে তুলেছিলেন সমৃদ্ধ একক সংগীতভান্ডার। তার ১৬টি একক অ্যালবামের মধ্যে রয়েছে রক্ত গোলাপ, ময়না এবং বিপুল জনপ্রিয় কষ্ট। চলচ্চিত্রের জন্যও তিনি তৈরি করেছেন স্মরণীয় সংগীত, যার মধ্যে আম্মাজান ও সাগরিকা উল্লেখযোগ্য।
তার এই দীর্ঘ সংগীতযাত্রা শুধু বাংলাদেশের রক সংগীতের ভান্ডার সমৃদ্ধ করেনি। বরং রক সংগীতের নিজস্ব সুর, কাঠামো এবং সম্ভাবনার একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে। তার পথ অনুসরণ করে পরবর্তী সময়ে অসংখ্য ব্যান্ড বুঝতে পেরেছে, একটি ব্যান্ড নিজের পরিচয় ও সৃজনশীলতা নিয়ে কতটা দূর যেতে পারে।
বাংলাদেশের তরুণদের কণ্ঠস্বর
কৈশোরের উদ্বেগ, প্রেমের বিচ্ছেদ, স্বপ্ন এবং দ্রুত বদলে যাওয়া সমাজের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সংগ্রামে থাকা তরুণদের কাছে এবির গান ছিল কেবল বিনোদন নয়, বরং এক ধরনের সঙ্গী।
কষ্ট পেতে ভালোবাসি কিংবা চলো বদলে যাই এর মতো গানগুলো আকাঙ্ক্ষা, বেদনা ও পরিবর্তনের কথা বলেছে খুব সহজ ভাষায়। সেই ভাষা সাধারণ শ্রোতার নিজের জীবনের সঙ্গে মিশে যেতে পেরেছে। আর তার গিটারের একক পরিবেশনা তরুণ সংগীতশিল্পীদের সামনে তৈরি করেছে নতুন স্বপ্নের দিগন্ত।
বাংলাদেশের একাধিক প্রজন্মের কিশোর ও তরুণ তার অনুপ্রেরণায় প্রথমবার গিটার হাতে নিয়েছে। দেশের সংগীত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাদ্যযন্ত্রের দোকানগুলোতেও তার প্রভাবের কথা আজও শোনা যায়। তার হাত ধরে রক সংগীত অনেকের কাছে আর প্রান্তিক কোনো শখ নয়, বরং সম্মানজনক ও সম্ভাবনাময় একটি শিল্পচর্চা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।
স্বীকৃতি এসেছিল দেরিতে
উদযাপনের আড়ালে এখানে একটি অস্বস্তিকর সত্যও রয়েছে। জীবদ্দশায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সরকারি সাংস্কৃতিক সংস্থা এবং বাণিজ্যিক সংগীতজগতের বড় একটি অংশ এবির প্রভাব ও অবদানের যথাযথ স্বীকৃতি দিতে ধীর ছিল।
ঢাকার মগবাজারে নিজের উদ্যোগ ও অর্থে তিনি গড়ে তুলেছিলেন এবি কিচেন, নিজের স্টুডিও ও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান। সেই সময়ে রক সংগীতশিল্পীদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ছিল সীমিত এবং সাংস্কৃতিক পৃষ্ঠপোষকতার বড় অংশই বরাদ্দ হতো প্রচলিত ধারার সংগীত ও শিল্পচর্চায়।
মৃত্যুর কয়েক বছর পর রাষ্ট্র তাকে একুশে পদকে ভূষিত করে, যা বাংলাদেশের অন্যতম সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা। নিঃসন্দেহে এই স্বীকৃতি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তবে তা এসেছিল তার মৃত্যুর পর। জীবিত অবস্থায় যে সম্মান তিনি অনুভব করার অধিকার রাখতেন, সেই স্বীকৃতি তার কাছে পৌঁছেছিল অনেক দেরিতে। এই বিলম্ব শুধু একজন শিল্পীকে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে দেরির গল্প নয়। বাংলাদেশের সংগীতজগতে রক শিল্পীদের অবদানকে দীর্ঘদিন কীভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে, সেই প্রশ্নও সামনে আনে।
যে উত্তরাধিকার আজও বাজছে
আজও এবি কিচেন তার সংগীতের এক জীবন্ত সংরক্ষণাগার হিসেবে কাজ করছে। পুরোনো রেকর্ডিং প্রকাশ এবং নতুন প্রজন্মের শ্রোতাদের কাছে তার সংগীত পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে তার সৃষ্টিকে ধরে রাখার চেষ্টা চলছে।
এলআরবিও তার গড়ে দেওয়া উত্তরাধিকারকে সামনে রেখে সংগীতচর্চা চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের অসংখ্য সংগীতশিল্পী আজও আইয়ুব বাচ্চুকে নিজেদের সংগীতজীবনের অন্যতম প্রধান অনুপ্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করেন।
প্রতি বছর তার জন্মবার্ষিকীতে ব্যান্ড সংগীতের কিংবদন্তি শিল্পী, সাবেক সহকর্মী এবং অসংখ্য ভক্তের শ্রদ্ধাঞ্জলি আবারও মনে করিয়ে দেয় সেই সত্যকে, যা রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকার করতে অনেক সময় লেগেছিল। আইয়ুব বাচ্চু শুধু বাংলাদেশে রক সংগীত করেননি। তিনি এমন একটি মঞ্চ তৈরি করে গেছেন, যার ওপর দাঁড়িয়েই বাংলাদেশের রক সংগীত আজও তার নিজস্ব গল্প বলে চলেছে।
