অঙ্কিত মুখার্জি
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়
বাংলাদেশের তরুণদের জন্য আন্তর্জাতিক মানসম্মত ও একীভূত প্রশিক্ষণ এবং সনদব্যবস্থা চালুর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক নির্দেশনা এমন একটি খাতে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের বিচ্ছিন্নতা ও সমন্বয়হীনতা রয়েছে।
জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের তৃতীয় সভায় সভাপতিত্ব করার সময় সরকারপ্রধান দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন কৌশলকে বছরের পর বছর যে সমস্যাটি নীরবে দুর্বল করে আসছে, তার দিকে দৃষ্টি দিয়েছেন। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে অসংখ্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চলছে, কিন্তু সেগুলোর মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয় নেই। ফলে এসব কর্মসূচির সনদের মূল্য দেশের ভেতরেও সীমিত, বিদেশেও অনেক ক্ষেত্রে স্বীকৃতি মেলে না।
একটি অভিন্ন কাঠামোর আওতায় এসব উদ্যোগকে আনা, একই পাঠ্যক্রম তৈরি করা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সনদের পারস্পরিক স্বীকৃতির ব্যবস্থা করার সিদ্ধান্ত তাই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে। সমস্যাটি কোথায়, তার স্পষ্ট চিহ্নিতকরণ এবং বাস্তবসম্মত সমাধানের দিকনির্দেশ, দুই দিক থেকেই সিদ্ধান্তটির গুরুত্ব রয়েছে।
যে সমস্যার সমাধান করতে পারে এই উদ্যোগ
বাংলাদেশের দক্ষতা উন্নয়নের চিত্র দীর্ঘদিন ধরে একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থার চেয়ে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের সমষ্টির মতো। শিক্ষা, শ্রম ও কর্মসংস্থান, প্রবাসী কল্যাণ এবং শিল্পসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ পরিচালিত হয়ে আসছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে নিজস্ব পাঠ্যক্রম, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান।
ধরা যাক, একটি মন্ত্রণালয়ের অধীনে পোশাক খাতে প্রশিক্ষণ নেওয়া একজন শিক্ষার্থী যে সনদ পেলেন, অন্য একটি মানদণ্ডে প্রার্থী মূল্যায়ন করা কোনো দেশীয় প্রতিষ্ঠানের কাছে সেই সনদের তেমন মূল্য নাও থাকতে পারে। মালয়েশিয়া, কাতার বা সৌদি আরবের কোনো নিয়োগদাতা যখন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী কর্মী খুঁজবেন, তখন স্বীকৃতির এই ঘাটতি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠতে পারে। দেশের ভেতরে ও বাইরে প্রশিক্ষণ সনদের স্বীকৃতি না পাওয়ার সমস্যাটি মূলত এখানেই। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে একটি অভিন্ন পাঠ্যক্রম ও সনদ কাঠামো তৈরি করা সেই সমস্যার সরাসরি এবং যুক্তিসংগত সমাধান হতে পারে।
বাস্তবায়নেই আসবে বড় পরীক্ষা
সমস্যাটি সঠিকভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে বলেই বাস্তবায়ন সহজ হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বহু বছর ধরে আলাদা আলাদাভাবে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনা করা মন্ত্রণালয়গুলোর নিজস্ব কাঠামো, বাজেট এবং প্রশাসনিক স্বার্থ গড়ে উঠেছে। পাঁচ বা ছয়টি মন্ত্রণালয়কে একটি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে হলে একটি কমিটির স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগের বাইরে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন হবে। তা না হলে পরিকল্পনাটি নীতিপত্রেই আটকে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
দেশের ভেতরের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নিয়োগদাতাদের গ্রহণযোগ্যতাও গুরুত্বপূর্ণ। একটি অভিন্ন সনদের মূল্য নির্ভর করবে সেটি কোথায় এবং কতটা স্বীকৃতি পাচ্ছে তার ওপর। তাই শ্রমিক গ্রহণকারী দেশ ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রদানকারী সংস্থাগুলোর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ করতে হবে। প্রশিক্ষণ দেওয়ার সক্ষমতার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। ঢাকার বাইরে অনেক প্রশিক্ষণকেন্দ্রে আধুনিক সরঞ্জাম ও দক্ষ প্রশিক্ষকের ঘাটতি রয়েছে। ফলে নতুন কাঠামো বাস্তবায়নের পরও যদি প্রশিক্ষণের মানে এই বৈষম্য থেকে যায়, তাহলে দক্ষতার ব্যবধান কমার বদলে আরও বাড়তে পারে।
আরেকটি দুর্বলতা শ্রমবাজারের তথ্য ও ভবিষ্যৎ চাহিদা নির্ধারণে। কোন খাতে কত কর্মী প্রয়োজন, আগামী কয়েক বছরে কোন ধরনের দক্ষতার চাহিদা বাড়বে, এসব বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকলে একীভূত কাঠামোও বর্তমান চাহিদার বদলে অতীতের চাকরির বাজারের জন্য কর্মী তৈরি করতে পারে।
এসব সীমাবদ্ধতা কাটাতে আরও যে সংস্কার প্রয়োজন
প্রশাসনিক বিচ্ছিন্নতা দূর করতে শুধু পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। এর জন্য আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক একটি সমন্বয় ব্যবস্থা প্রয়োজন হতে পারে। আন্তমন্ত্রণালয় একটি পরিষদ গঠন করা যেতে পারে, যার হাতে একীভূত কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রশিক্ষণ বাজেট বরাদ্দের ক্ষমতা থাকবে। তাহলে প্রতিটি মন্ত্রণালয় নিজেদের মতো করে অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার বদলে একটি অভিন্ন পরিকল্পনার অধীনে কাজ করবে।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য সরকারকে প্রধান শ্রমবাজারগুলোতে আনুষ্ঠানিক পারস্পরিক সনদ স্বীকৃতি চুক্তির উদ্যোগ নিতে হবে। দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী ও নৌপরিবহনকর্মী বিদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে ফিলিপাইন যে ধরনের ব্যবস্থা সফলভাবে ব্যবহার করেছে, সেখান থেকেও শিক্ষা নেওয়া যেতে পারে। সনদব্যবস্থার সংস্কারের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ অবকাঠামোয় বিনিয়োগও জরুরি, বিশেষ করে বড় শহরের বাইরে। সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে শিল্পখাতের অভিজ্ঞতা, আধুনিক সরঞ্জাম এবং কারিগরি জ্ঞান প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে আনা যেতে পারে।
একটি কার্যকর শ্রমবাজার তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। বেসরকারি খাতের নিয়োগদাতা সংগঠন এবং জনশক্তি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্বে এমন ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে। এতে প্রশিক্ষণের পাঠ্যক্রম বাস্তব শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে নিয়মিতভাবে সামঞ্জস্য করা সম্ভব হবে এবং একবার তৈরি হওয়ার পর সেটি স্থবির হয়ে পড়বে না।
দীর্ঘমেয়াদি ভাবনার জায়গা
দীর্ঘ সময়ের দৃষ্টিতে দেখলে এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের একটি প্রয়োজনীয় ধারার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাণিজ্যিক সুবিধার কিছু অংশ হারানোর সম্ভাবনাও তৈরি হবে। তখন শুধু কম খরচের শ্রমশক্তি দিয়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা ক্রমেই কঠিন হবে। কর্মীদের দক্ষতার মান আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি নির্ভরযোগ্য সনদব্যবস্থা দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে পারে। প্রবাসী কর্মীদের পাঠানো অর্থ ইতোমধ্যে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। প্রশিক্ষণের যোগ্যতা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হলে কর্মীরা বিদেশে শুধু স্বল্পদক্ষ কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে তুলনামূলক ভালো বেতন ও দায়িত্বের কাজের সুযোগ পেতে পারেন।
দীর্ঘমেয়াদে এর ফলে বাংলাদেশের শ্রমশক্তি বিদেশে পাঠানোর ধরনেও পরিবর্তন আসতে পারে। নির্দিষ্ট কিছু খাতে ফিলিপাইন ও ভারত যেভাবে উচ্চমূল্যের দক্ষতার দিকে এগিয়েছে, বাংলাদেশও তেমনভাবে শ্রমবাজারের উচ্চতর স্তরে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
উপসংহার
প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক নির্দেশনা বাংলাদেশের তরুণদের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে এগিয়ে যাওয়ার পথে দুটি বড় বাধা, প্রশিক্ষণব্যবস্থার বিচ্ছিন্নতা এবং সনদের সীমিত স্বীকৃতি, যথাযথভাবে চিহ্নিত করেছে। একই পাঠ্যক্রম ও পারস্পরিক সনদ স্বীকৃতির মাধ্যমে একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরির যে দিকনির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়নযোগ্য বলেই মনে হয়।
এর মাধ্যমে দক্ষতার সঙ্গে চাকরির চাহিদার আরও ভালো মিল, বিদেশে সনদের স্বীকৃতি বৃদ্ধি এবং প্রশিক্ষণব্যবস্থায় সমন্বয় তৈরি করা সম্ভব হতে পারে। তবে এই উদ্যোগের পূর্ণ সুফল পেতে হলে আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের জন্য বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক সনদ স্বীকৃতির আনুষ্ঠানিক চুক্তি, শহরের বাইরের প্রশিক্ষণ অবকাঠামোয় লক্ষ্যভিত্তিক বিনিয়োগ এবং আধুনিক শ্রমবাজার তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার মতো পদক্ষেপও নিতে হবে।
এসব সংস্কার পাশাপাশি এগোতে পারলে একীভূত প্রশিক্ষণ ও সনদ কাঠামো বাংলাদেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন কৌশলে সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত পরিবর্তনে পরিণত হতে পারে।
