জামিল শাহেদ
স্বতন্ত্র সাংবাদিক
২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেল, পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্তকে ঘিরে চলতি বছরের অন্যতম তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে বাংলাদেশে। ডিজেলের দাম ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা হয়েছে। কেরোসিনের দাম বেড়ে হয়েছে ১৫৫ টাকা, যা আগের দামের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি।
ফেব্রুয়ারি থেকে দায়িত্বে থাকা সরকার বলছে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ধাক্কা সামলাতে এই মূল্যবৃদ্ধি অনিবার্য হয়ে পড়েছিল। বিরোধী দলগুলোর দাবি, এর দায় সরকারের রাজনৈতিক ব্যর্থতার, যার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এই বিতর্কের পাশাপাশি জ্বালানির বাড়তি দামের প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় কতটা পড়বে এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে কী ধরনের নীতি নেওয়া যেতে পারে, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
মূল্যবৃদ্ধির পক্ষে সরকারের যুক্তি
সরকারের কর্মকর্তারা এমন কিছু পরিসংখ্যান সামনে আনছেন, যা পুরোপুরি উপেক্ষা করা কঠিন। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, চলতি বছরের মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বা বিপিসির লোকসান হয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা। মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ও অপরিশোধিত তেল সরবরাহে বিঘ্নের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেল ও পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। এর মধ্যেও দেশে জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় অপরিবর্তিত রাখা হয়েছিল।
সরকারের উপদেষ্টাদের ভাষ্য, দাম সমন্বয়ের আগে শুধু ডিজেলেই প্রতি লিটারে বিপিসির লোকসান প্রায় ৮৯ টাকা পর্যন্ত দাঁড়িয়েছিল। দৈনিক লোকসান ১০০ কোটি টাকার বেশি হয়েছে বলেও বিভিন্ন পর্যায়ে জানানো হয়েছে। সরকারের দৃষ্টিতে, মূল্যবৃদ্ধি কোনো রাজনৈতিক পছন্দের বিষয় নয়। বরং রাষ্ট্রীয় লোকসান আরও বাড়তে না দেওয়ার জন্য দীর্ঘদিন পিছিয়ে রাখা একটি আর্থিক সমন্বয় শেষ পর্যন্ত করতেই হয়েছে।
বিরোধীদের পাল্টা বক্তব্য
জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, এবি পার্টি ও বাংলাদেশ লেবার পার্টিসহ কয়েকটি ছোট দল সরকারের এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেছে। জামায়াতের নেতারা বলছেন, বারবার জ্বালানির দাম বাড়ানোর ফলে এমনিতেই সংকটে থাকা মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়ে যাচ্ছে। দলটি নতুন দাম নির্ধারণের পেছনে আমদানি ব্যয়, কর ও মুনাফার বিস্তারিত হিসাব প্রকাশের দাবি জানিয়েছে।
এনসিপির নেতাকর্মীরা চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে মিছিল করে জ্বালানির দাম অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। দলটির নেতারা প্রশ্ন তুলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম কম থাকার আগের সময়গুলোতে বিপিসি যে মুনাফা করেছে, সেই অর্থ কোথায় গেল। তাঁদের বক্তব্য, বিপিসির বর্তমান লোকসানের পেছনে শুধু বৈশ্বিক বাজারের চাপ নয়, দীর্ঘদিনের আর্থিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও ভূমিকা রাখতে পারে।
নীতির চেয়ে যে বিতর্ক বড় হয়ে উঠেছে
এই বিতর্ককে শুধু অর্থনৈতিক না রেখে রাজনৈতিক করে তুলেছে মূলত মূল্য সমন্বয়ের সময় নিয়ে প্রশ্ন। সমালোচকেরা বলছেন, ২০২৪ সালে চালু হওয়া স্বয়ংক্রিয় জ্বালানি মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা অনুযায়ী প্রতি মাসে দাম সমন্বয়ের কথা। কিন্তু প্রায় ছয় মাস সেই সমন্বয় স্থগিত রাখা হয়। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম দ্রুত পরিবর্তিত হয়েছে। এরপর সেপ্টেম্বরে একবারে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি করা হয়েছে।
দাম আটকে রেখে পরে একসঙ্গে বাড়ানোর সিদ্ধান্তই এখন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। বিরোধী দলের নেতাদের যুক্তি, আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি যতটা না সাধারণ মানুষের ওপর বর্তমান চাপ তৈরি করেছে, তার চেয়ে বেশি চাপ তৈরি হয়েছে দীর্ঘদিন সমন্বয় না করার সিদ্ধান্তে।
দৈনন্দিন জীবনে বাড়তি চাপ
সাধারণ পরিবারের কাছে রাজনৈতিক বিতর্কের চেয়ে হিসাবটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ সেচ পাম্প ডিজেলচালিত। বোরো ধান উৎপাদনে মোট উপকরণ ব্যয়ের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ থেকে এক-চতুর্থাংশ পর্যন্ত সেচে চলে যায়। ফলে ডিজেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব শুধু জ্বালানি বিক্রির জায়গাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, খাদ্যপণ্যের দামেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
ইতোমধ্যে কয়েকটি বাস রুটে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। ফলে যাত্রী ও ছোট ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ আরও বাড়ছে। অর্থনীতিবিদেরা সতর্ক করেছেন, শিল্প খাতে পরিবহন ও জেনারেটরের ব্যয় বাড়বে। এতে মুনাফা কমতে পারে, পাশাপাশি রপ্তানির প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ার আশঙ্কা ছোট ব্যবসাগুলোর ওপর, কারণ বাড়তি ব্যয় সামলানোর সক্ষমতা তাদের তুলনামূলকভাবে কম।
সামষ্টিক অর্থনীতির দিক থেকেও ঝুঁকি স্পষ্ট। উৎপাদন ও পরিবহনের ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব অন্যান্য পণ্যের দামেও পড়ে। মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ে, পরিবারের ভোগব্যয় কমে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দামের সঙ্গে লড়াই করা অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি হয়।
রাজনৈতিক বিলম্বের মূল্য
এই ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হয়তো মূল্যবৃদ্ধির পরিমাণ নয়, বরং কখন এবং কীভাবে জ্বালানির দাম পরিবর্তন করা হচ্ছে, সেই অনিশ্চয়তা। রাজনৈতিক কারণে দাম সমন্বয় পিছিয়ে রেখে পরে হঠাৎ বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি করা হলে সাধারণ মানুষ তাদের মাসিক ব্যয় পরিকল্পনা করতে পারে না। ব্যবসায়ীদের পক্ষেও আগাম খরচ নির্ধারণ বা চুক্তির মূল্য ঠিক করা কঠিন হয়ে পড়ে। ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে, এই সংখ্যার চেয়েও বড় সমস্যা তৈরি করে এমন অনিশ্চয়তা। আর সেই অনিশ্চয়তাই একটি প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সমন্বয়কে সামাজিক অস্বস্তি ও জনঅসন্তোষের কারণ করে তুলতে পারে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের করণীয়
এই অচলাবস্থা কাটানোর একটি বাস্তবসম্মত পথ রয়েছে। সরকারকে জ্বালানির মূল্য নির্ধারণের প্রতিটি ধাপের বিস্তারিত হিসাব প্রকাশের প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। আমদানি ব্যয়, পরিবহন ব্যয়, কর এবং বিতরণ পর্যায়ের মুনাফা কত, তা স্পষ্টভাবে জানানো প্রয়োজন। বিরোধী দলগুলো যে স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশের দাবি জানিয়েছে, তা বাস্তবায়ন করা হলে মূল্যবৃদ্ধির পেছনে প্রকৃত ব্যয় কতটা এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার ভূমিকা কতটা, সেই বিতর্ক অনেকটাই পরিষ্কার হবে।
রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক সময়ে দাম আটকে রেখে পরে বড় ধরনের সমন্বয় করার বদলে মাসিক স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয় ব্যবস্থা আবার কার্যকর করা যেতে পারে। এতে সাধারণ মানুষের ওপর একবারে বড় চাপ না পড়ে তুলনামূলকভাবে ধীরে পরিবর্তন আসবে এবং হঠাৎ মূল্যবৃদ্ধির অভিঘাতও কমবে।
কৃষি খাতে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দেওয়া জরুরি, কারণ সেচ ব্যবস্থায় ডিজেলের ব্যবহার অনেক বেশি। একই সঙ্গে প্রকৃত ব্যয় যতটা বেড়েছে, তার চেয়ে বেশি ভাড়া বাড়ানো হচ্ছে কি না, তা নজরদারির আওতায় আনতে হবে। পরিবহন খাতে কার্যকর ভাড়া সীমা নির্ধারণ ও তা পর্যবেক্ষণ করা হলে যাত্রীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ ঠেকানো সম্ভব হতে পারে।
বড় ধরনের মূল্য নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে অর্থবহ আলোচনা প্রয়োজন। একতরফা ঘোষণা এবং তার পরপরই রাজপথের প্রতিবাদ কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান দেয় না। জ্বালানির দাম এমন একটি বিষয়, যার প্রভাব দেশের প্রতিটি শ্রেণি ও খাতের ওপর পড়ে। তাই এর সমাধানও কোনো একটি দলের রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে জাতীয় স্বার্থের প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
