মেহরান সাজ্জাদ
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি
এই নিবন্ধে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের সাফল্য পর্যালোচনা করা হয়েছে। পাশাপাশি, ফলাফলের পেছনে থাকা দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে এমন কিছু সরকারি উদ্যোগের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অবস্থান উন্নত করার পাশাপাশি দক্ষ প্রোগ্রামারদের জাতীয় সফটওয়্যার শিল্পের শক্ত ভিত হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।
বাংলাদেশে প্রতিযোগিতামূলক প্রোগ্রামিংয়ের একটি শক্তিশালী সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দলগুলো নিয়মিতভাবে বিশ্বের অন্যতম প্রধান আন্তবিশ্ববিদ্যালয় প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে জায়গা করে নেয়। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও জাতীয় পর্যায়ের বাছাইপর্বেও বাংলাদেশের প্রতিযোগীরা নিয়মিতভাবে শীর্ষস্থানগুলোর কাছাকাছি থাকেন। স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীরাও ইনফরমেটিকস অলিম্পিয়াড ও জাতীয় পর্যায়ের প্রোগ্রামিং প্রশিক্ষণ শিবিরে অংশ নেয়।
এই অগ্রগতির বড় অংশ এসেছে তৃণমূল পর্যায় থেকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোগ্রামিং ক্লাব, জ্যেষ্ঠ শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে নবীনদের প্রশিক্ষণ এবং অনলাইনে সমস্যা ও সমাধান বিনিময়কারী বিভিন্ন সম্প্রদায় এই ধারাকে এগিয়ে নিয়েছে। সমালোচনায় যাওয়ার আগে এই স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগের শক্তি ও অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন। দেশের জন্য এটাই সবচেয়ে বড় সম্পদ।
সাফল্য যেখানে পিছিয়ে পড়ে
সমালোচনার জায়গাটি হলো, বাংলাদেশের ফলাফল প্রশংসনীয় হলেও সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় নিয়মিতভাবে শীর্ষস্থান অর্জনে তা খুব কমই রূপ নেয়। বাংলাদেশ সাধারণত চূড়ান্ত পর্বে জায়গা করে নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে, কিন্তু প্রতিযোগিতায় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। পূর্ব ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার শীর্ষ দেশগুলোর সঙ্গে ব্যবধানও স্পষ্ট। এর একটি কারণ হলো, সাফল্য এখনো অল্প কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কয়েকজন নিবেদিতপ্রাণ প্রশিক্ষকের ওপর নির্ভরশীল। দক্ষ একটি প্রজন্ম স্নাতক হয়ে বেরিয়ে গেলে তাদের অর্জিত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার বড় অংশও হারিয়ে যায়। পরবর্তী প্রজন্মের কাছে সেই অভিজ্ঞতা পৌঁছে দেওয়ার কোনো সুসংগঠিত ব্যবস্থা নেই।
প্রস্তুতিও শুরু হয় অনেক দেরিতে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ে ওঠার পরই প্রতিযোগিতামূলক প্রোগ্রামিংয়ের নিবিড় প্রশিক্ষণ শুরু হয়। অথচ শীর্ষস্থানীয় দেশগুলো মাধ্যমিক পর্যায়েই প্রতিভাবান শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করে এবং বছরের পর বছর ধরে তাদের দক্ষতা গড়ে তোলে। বাংলাদেশের স্কুলগুলোতে কম্পিউটার ব্যবহারের সুযোগ সীমিত, প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব রয়েছে এবং অ্যালগরিদমিক চিন্তাভাবনার চর্চাও খুব বেশি হয় না। ফলে জেলা ও গ্রামের মেধাবী শিক্ষার্থীদের অনেকেই শনাক্ত হওয়ার সুযোগ পায় না।
অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও অসমতা রয়েছে। মেয়ে শিক্ষার্থী এবং গ্রামীণ ও নিম্ন আয়ের পরিবারের শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে অনেক কম অংশ নেয়। ফলে দেশের বিপুল সম্ভাবনাময় প্রতিভার একটি ছোট অংশকে নিয়েই প্রতিযোগিতার আয়োজন ও প্রশিক্ষণ পরিচালিত হচ্ছে।
অর্থায়ন ও ব্যবস্থাপনাগত জটিলতাও অগ্রগতির পথে বাধা সৃষ্টি করে। প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে যাতায়াত, ভিসা, প্রস্তুতিমূলক প্রশিক্ষণ শিবির ও অন্যান্য ব্যয়ের জন্য দলগুলোকে প্রায়ই স্পনসর, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সদিচ্ছা কিংবা ব্যক্তিগত অনুদানের ওপর নির্ভর করতে হয়। শেষ মুহূর্তে আয়োজন করতে গিয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ ব্যাহত হয়। প্রশিক্ষকদের অধিকাংশই স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেন। দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি গড়ে তোলার মতো সময় ও দায়িত্বপ্রাপ্ত পেশাদার প্রশিক্ষকের সংখ্যাও কম।
প্রতিযোগিতা ও শিল্পের মধ্যে যে সংযোগ অনুপস্থিত
আরও গভীর দুর্বলতা হলো, প্রতিযোগিতা শেষ হওয়ার পর কী ঘটে। প্রতিযোগিতামূলক প্রোগ্রামিং দ্রুত সমস্যা সমাধান ও অ্যালগরিদমিক দক্ষতা বাড়ায়। কিন্তু সফটওয়্যার শিল্পে সফল হতে হলে নকশা প্রণয়ন, দলগত কাজ, সফটওয়্যার পরীক্ষা, নিরাপত্তা এবং পণ্য উন্নয়নের মতো দক্ষতাও প্রয়োজন।
অনেক মেধাবী প্রতিযোগী বিদেশি প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যান। ফলে দেশের ভেতরে প্রযুক্তিশিল্পের শক্তিশালী পরিবেশ গড়ে তুলতে যাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারতেন, তাঁদের একটি অংশকে হারাতে হয়। যাঁরা দেশে থাকেন, তাঁদের অনেকেই দেখেন যে নিয়োগদাতারা তাঁদের জীবনবৃত্তান্ত ও প্রতিযোগিতার অর্জনকে গুরুত্ব দিলেও গবেষণা, পণ্য উন্নয়ন কিংবা উদ্যোক্তা হিসেবে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ সীমিত। চূড়ান্ত পর্বে সাফল্য অর্জনকারী প্রতিযোগীদের নিয়ে দেশে উদ্যাপন হয়, কিন্তু সেই সাফল্যের গতি ধরে রাখার উদ্যোগ পরে আর তেমন দেখা যায় না।
সরকার কী করতে পারে
এই ক্ষেত্রে সরকার সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে সহায়ক হিসেবে, প্রতিযোগিতার আয়োজক হিসেবে নয়। প্রথমেই স্কুল পর্যায়ে তথ্যবিজ্ঞান ও প্রোগ্রামিং শিক্ষাকে গুরুত্বের সঙ্গে চালু করা প্রয়োজন। এর জন্য প্রশিক্ষিত শিক্ষক, আধুনিক কম্পিউটার ল্যাব এবং অ্যালগরিদমের প্রাথমিক পাঠ্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি এমন একটি জাতীয় অলিম্পিয়াড নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে, যার কার্যক্রম দেশের প্রতিটি জেলায় পৌঁছাবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত আঞ্চলিক প্রশিক্ষণকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হলে ঢাকার বাইরের মেধাবী শিক্ষার্থীরাও দক্ষ প্রশিক্ষক, নিয়মিত অনুশীলন ও প্রতিযোগিতার প্রস্তুতির সুযোগ পাবে। মেয়ে শিক্ষার্থী এবং সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে বিশেষ বৃত্তি ও সচেতনতামূলক উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য একটি স্থায়ী জাতীয় তহবিল গঠন করলে অর্থায়নের অনিশ্চয়তা কমবে। এই তহবিল থেকে যাতায়াত, ভিসা, প্রস্তুতিমূলক প্রশিক্ষণ শিবির ও পেশাদার প্রশিক্ষণের ব্যয় বহন করা যেতে পারে। স্বচ্ছ বাছাইপ্রক্রিয়া ও সময়মতো আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক প্রোগ্রামিংকে জাতীয় পর্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষামূলক কার্যক্রম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া প্রয়োজন। এতে ব্যক্তিগত স্পনসরের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে এবং প্রতিযোগীরা স্থিতিশীল পরিবেশে প্রস্তুতি নিতে পারবেন।
একই সঙ্গে অভিজ্ঞ প্রোগ্রামারদের মধ্য থেকে একটি মূল প্রশিক্ষক দল গড়ে তুলতে হবে। তাঁদের উপযুক্ত পারিশ্রমিক ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগের ওপর নির্ভর না করে দীর্ঘমেয়াদি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
প্রতিযোগিতার সাফল্য থেকে প্রযুক্তিশিল্প গড়ে তোলা
প্রতিযোগিতায় সফল প্রোগ্রামারদের দেশের প্রযুক্তিশিল্পের বিকাশে কাজে লাগানোই হবে আরও বড় অর্জন। সরকার প্রতিযোগীদের সম্মতি নিয়ে একটি জাতীয় প্রতিভা তালিকা তৈরি করতে পারে, যাতে সরকারি সংস্থা ও নিয়োগদাতারা দক্ষ ব্যক্তিদের সহজে শনাক্ত করতে পারেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, সিস্টেম সফটওয়্যার ও তথ্য প্রকৌশলের মতো ক্ষেত্রে দেশের ভেতরে কাজের সুযোগ বাড়াতে মেধাবী স্নাতকদের জন্য ফেলোশিপ ও গবেষণা অনুদান দেওয়া যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানের অংশীদারত্বে ইন্টার্নশিপ, পরামর্শদান এবং যৌথ প্রকল্প চালু করা হলে প্রতিযোগিতায় অর্জিত দক্ষতা বাস্তব প্রকৌশল অভিজ্ঞতায় রূপ নেবে।
নতুন উদ্যোগ গড়ে তোলার সহায়তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিক মূলধন, ব্যবসা শুরুর সহায়ক কেন্দ্র, নতুন সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানের জন্য কর প্রণোদনা এবং বিদেশে অর্থ লেনদেনের নিয়ম সহজ করা হলে মেধাবী প্রোগ্রামাররা দেশেই পণ্য ও প্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে উৎসাহিত হবেন।
সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় দেশীয় সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো যেতে পারে। সরকারি ডিজিটাল প্রকল্পগুলোতেও দক্ষ প্রোগ্রামারদের জন্য বাস্তব সমস্যার সমাধানে কাজ করার সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে অভিজ্ঞতা অর্জনকারী ব্যক্তিরা পরবর্তী সময়ে প্রশিক্ষক, পরামর্শক ও প্রতিযোগিতার আয়োজক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন। এর মধ্য দিয়ে এমন একটি ধারাবাহিক ব্যবস্থা গড়ে উঠবে, যেখানে প্রতিটি প্রজন্ম পরবর্তী প্রজন্মের বিকাশে অবদান রাখবে।
উপসংহার
প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় সাফল্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় মূল সম্পদ বাংলাদেশের রয়েছে: মেধা, উদ্যম এবং প্রাণবন্ত একটি প্রতিযোগিতামূলক সম্প্রদায়। কিন্তু প্রতিভা অল্প বয়সে শনাক্ত করা, নিয়মিত প্রশিক্ষণের অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং প্রতিযোগিতায় সফলদের সঙ্গে প্রযুক্তিশিল্পের কার্যকর সংযোগ গড়ে তোলার মতো সুসংগঠিত ব্যবস্থা এখনো দুর্বল।
সরকার যদি স্কুলশিক্ষা, প্রশিক্ষক তৈরি, অর্থায়ন ও উদ্যোক্তা বিকাশে বিনিয়োগ করে, তাহলে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের ফলাফল যেমন উন্নত হবে, তেমনি সেই দক্ষতা দেশের ভেতরে নতুন প্রতিষ্ঠান, কর্মসংস্থান ও সফটওয়্যার রপ্তানির পথও তৈরি করবে। প্রতিযোগিতার মঞ্চে একটি পদক জয় ক্ষণিকের অর্জন, কিন্তু সমৃদ্ধ প্রোগ্রামিং শিল্প গড়ে তোলা হবে দীর্ঘস্থায়ী উত্তরাধিকার।
