রেহান হোসেন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
প্রতি বছর পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের দিনটি বাংলাদেশে এক অদ্ভুত বাস্তবতা তৈরি করে। ফলাফলের রেজাল্ট কার্ডটি যখন একজন শিক্ষার্থীর হাতে আসে, তখন তা কেবল কয়েকটি বিষয়ের নম্বর তুলে ধরে না; বরং আমাদের সমাজে এটি একজন শিক্ষার্থীর মেধা, অস্তিত্ব এবং পুরো ভবিষ্যতের ওপর এক চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করে। সমাজ ও পরিবারের তৈরি করা এই কৃত্রিম মানদণ্ডের চাপে পড়ে প্রতি বছরই অসংখ্য আলোকময় প্রাণ অকালে ঝরে যায়।
সাম্প্রতিক একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২৫ সালে প্রায় ৪০৩ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে যার অর্ধেকই স্কুল শিক্ষার্থী।এরমধ্যে সবাই পরীক্ষার ফলাফল জনিত কারণে আত্মহত্যা না করলেই বেশিরভাগক্ষেত্রেই কারণ এইটায়।ফলাফল প্রকাশের মাত্র কয়েক দিনের মাথায় যখন শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার খবর শোনা যায়, কিংবা বছরজুড়ে শত শত কিশোর-কিশোরীর আত্মহননের পথ বেছে নেওয়ার পরিসংখ্যান দেখি, তখন এক গভীর আত্মউপলব্ধি ও আক্ষেপ তৈরি হয়।
প্রশ্ন জাগে-আমরা কোন সভ্যতার দিকে যাচ্ছি, যেখানে একটি কাগজের টুকরো একটি অমূল্য জীবনের চেয়েও দামি হয়ে ওঠে?প্রথমেই আমাদের স্বীকার করে নিতে হবে যে, এই চরম সংকটের মূলে রয়েছে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সামাজিক অজ্ঞতা ও সামাজিক কুসংস্কার। পরিসংখ্যান বলছে, দেশের প্রায় ১২.৬ শতাংশ শিশু মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে, অথচ তাদের ৯০ শতাংশেরও বেশি কোন প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা পায় না। আমার কাছে মনে হয়, এই উপাত্তটি বাস্তব পরিস্থিতির সামান্য অংশ মাত্র।
আমাদের সমাজে মানসিক স্বাস্থ্যকে বরাবরই বিলাসিতা হিসেবে দেখা হয়। একজন শিক্ষার্থী যখন হতাশায় ভোগে, তখন তাকে ‘অলস’ বা ‘নাটকবাজ’ বলে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা হয়। দুশ্চিন্তাকে বিবেচনা করা হয় তার ব্যক্তিত্বের দুর্বলতা হিসেবে। মানসিক যন্ত্রণাকে যখন ব্যক্তিত্বের ত্রুটি হিসেবে চিহ্নিত করে চেপে দেওয়া হয়, তখন শিক্ষার্থীরা নিজেদের কষ্ট প্রকাশ না করে ভেতরে ভেতরে নিঃশেষ হতে থাকে।
কিন্তু আসলেই এই প্রাণঘাতী পরিবেশ কি শিক্ষার্থীরা নিজেরা তৈরি করেছে? এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির জন্য এই বাচ্চারা এক ফোঁটাও দায়ী নয়। তারা তো বড়দের তৈরি করা এই দমবন্ধ পরিবেশের শিকার। আমাদের অভিভাবকরা নিজেরাই দিনশেষে চরম অনিশ্চয়তা, দিন দিন বাড়তে থাকা সংসারের খরচ আর ভবিষ্যতের ভয় নিয়ে চলেন। তাদের মনে একটা গভীর ভয় ঢুকে গেছে -‘ভালো করে পড়াশোনা না করলে সন্তান না খেয়ে মরবে’। সেই ভয়টাই তারা অবচেতন মনে সন্তানের ওপর চাপিয়ে দেন: “আরও পড়তে হবে”, “রেজাল্ট ভালো করতেই হবে”, “মুখ উজ্জ্বল করতে হবে”।
যে মা-বাবা নিজেরা সারাদিন মানসিক চাপে পিষ্ট, তারা সন্তানের মনের গহীনের নীরব কান্না শুনবেন টায় কীভাবে? অনেক অভিভাবক নিজেদের অর্থনৈতিক,সামাজিক মর্যাদার ভয়কে অবচেতনভাবেই সন্তানের ওপর চাপিয়ে দেন। ‘ভালো নম্বর পেতেই হবে’, ‘আমাদের মুখ রক্ষা করো’ -এই ধরনের প্রত্যাশার বোঝা শিশুর মনস্তত্ত্ব চুরমার করে দেয়।
অন্যদিকে, শিক্ষকরাও এই ব্যবস্থার বাইরে নন। গাদাগাদি করা ক্লাসরুম, বিশাল সিলেবাস, সামান্য বেতন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর নাম সর্বস্ব র্যাঙ্কিং ধরে রাখার মানসিক চাপ তাদেরও ক্লান্ত ও সংবেদনশীলতাহীন করে তোলে। একজন ক্লান্ত বা মানসিক চাপে থাকা শিক্ষক যখন কোনো শিক্ষার্থীকে নিয়ে উপহাস করেন বা অন্য কারও সাথে তুলনা করেন, সেই ক্ষতের দাগ ওই শিক্ষার্থীর মনে আজীবন রয়ে যায়।শিক্ষকের একটা ছোট অপমানজনক মন্তব্য বা অবহেলার কথা একটা বাচ্চার মনে বছরের পর বছর কাটার মতো বিঁধে থাকে। ফল কী হচ্ছে? মানসিকভাবে বিষাদগ্রস্ত প্রাপ্তবয়স্করা তৈরি করছেন বিষাদগ্রস্ত একটা সমাজ। আর সেখান থেকেই তৈরি হচ্ছে আমাদের আগামী দিনের প্রজন্ম।
সমাজ ও রাষ্ট্রের এই অনমনীয় মনোভাব আমাদের ভাবিয়ে তোলার জন্য যথেষ্ট। কোনো একটি একক পরীক্ষা বা সামন্য কয়েক ঘণ্টার মূল্যায়ন কী একটি মানুষের গোটা জীবনের যোগ্যতা নির্ধারণ করতে পারে? এই অবাস্তব মূল্যায়ন প্রথা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া দরকার।তা না হলে আজকের এই মানসিক চাপে থাকা শিক্ষার্থীরাই পরবর্তী জীবনে গিয়ে মানসিক চাপ দেওয়া অভিভাবক এবং সমাজ হয়ে উঠবে।
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক মানসিকতায় আমূল সংস্কার প্রয়োজন।
মূল্যায়ন পদ্ধতির মানবিকীকরণ: শুধুমাত্র বছরের শেষে একটি বড় পরীক্ষার ওপর নির্ভর না করে সারা বছরের ধারাবাহিক মূল্যায়ন, মেধাভিত্তিক প্রজেক্ট এবং জীবনমুখী দক্ষতাকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের নিয়ে অতিরিক্ত উম্মাদনা ও সংবাদমাধ্যমে ফলাও করে খবর প্রচার বন্ধ করতে হবে, যা মূলত অকৃতকার্য বা কম নম্বর পাওয়া বাকি বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর মনে হীনমন্যতার জন্ম দেয়।
মানসিক স্বাস্থ্য সেবার প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ: প্রতিটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সাপোর্ট হিসেবে অন্তত একজন প্রশিক্ষিত মেন্টর বা কাউন্সেলর থাকা বাধ্যতামূলক করা উচিত। ফল প্রকাশের সংকটময় মুহূর্তে বিশেষ করে এমন কিছু মানুষের সক্রিয় উপস্থিতি দরকার, যারা শিক্ষার্থীদের কোনো ধরনের বিচার বা বকাঝকা ছাড়া কেবল সহানুভূতির সাথে শুনবেন।
শিক্ষক ও অভিভাবক কেন্দ্রিক সংস্কার: শিক্ষকদের কাজের পরিবেশ উন্নত করতে হবে, উপযুক্ত সম্মান ও বেতন নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তাদের কোচিং নির্ভরতা কমে। পাশাপাশি বিদ্যালয়গুলোতে ‘প্যারেন্টিং’ বিষয়ক কাউন্সেলিং রাখা দরকার নিয়মিত , যেখানে মা-বাবাদেী বোঝাতে হবে যে সন্তানকে অন্য কারও সাথে তুলনা করা এক ধরনের মানসিক নির্যাতন এবং এটি সন্তানের ভবিষ্যতের বাঁধা সৃষ্টি করে।
পেশাগত বৈচিত্র্যের স্বীকৃতি: আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। ডাক্তার বা প্রকৌশলী হওয়াটাই জীবনের একমাত্র সফলতার মাপকাঠি হতে পারে না। কারিগরি, ভোকেশনাল, শিল্প ও সৃজনশীল পেশাকে সমমর্যাদা দিলে পরীক্ষার ফলাফলের ওপর এই দৌড় অনেকটাই কমে আসবে।
কোনো মানুষই একটি নিছক সংখ্যা বা জিপিএ দিয়ে মূল্যায়ন পাওয়ার যোগ্য নয়। পরীক্ষায় ফলাফল ন জীবনের কোনো চূড়ান্ত হার কিংবা জিত নয়, এটি কেবল পথচলার একটি ক্ষুদ্র সাময়িক অভিজ্ঞতা।কোনো শিশুর পরিচয় বা যোগ্যতা শুধু একটা রেজাল্ট কার্ডের সংখ্যা দিয়ে ঠিক হতে পারে না। একটা সুস্থ আর আত্মবিশ্বাসী জাতি গড়তে হলে আমাদের আগে সন্তানদের পাশে শক্ত হয়ে দাঁড়াতে হবে।জীবনের এই চিরন্তন সত্যটি কোমলমতি শিশুদের বোঝানোর দায়িত্ব আমাদের প্রত্যেকের।
একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে আমাদের বিশ্বাস করতে হবে, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর পাশাপাশি আমাদের পারিবারিক স্তরেও বিচারহীন ও সহানুভূতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। ফলাফল যাই হোক না কেন, জীবনের চরম বিপদের দিনেও পরিবার ও সমাজের কাছ থেকে ‘আমরা তোমার পাশে আছি’-এই আশ্বাসের হাতটুকু পেলেই একটি অমূল্য জীবন বেঁচে যেতে পারে।
পরীক্ষায় খারাপ করা মানেই জীবনের শেষ নয়-এটা একটা অতি সামান্য বিষয় মাত্র।কঠিন এই সময়ে শিশুদেরকে বিচার না করে, বকা না দিয়ে কেবল ভালোবেসে তাদের মনে এই চিন্তার প্রকাশ ঘটাতে হবে যে এটিই জীবনের সবকিছু না।এই সহজ ও মানবিক সত্যটি শিশুদের সামনে তুলে ধরার দায়িত্ব সমাজের প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের।বিচারহীন, সহানুভূতিশীল ও আশ্বস্তকারী একজন মানুষের স্পর্শই পারে একটি থমকে যাওয়া জীবনকে নতুন করে টিকিয়ে রাখতে,একটি শিশুর মনে নতুন করে আশার বীজ বপন করতে পারে।
