ইফতেখার রহমান
ভারডান্ট গ্লোবাল
জবাবদিহির পরীক্ষা
২০১৬ সালের অক্টোবরে প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের ঢাকা সফরের এক দশক পর বাংলাদেশ এখন অবকাঠামো নির্মাণের চেয়েও কঠিন এক পরীক্ষার মুখে। প্রশ্নটি হলো, চীনা অর্থায়নে জনগণের জন্য প্রকৃত মূল্য তৈরি হয়েছে কি না। সফরের সময় প্রায় ২৪.৪৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সম্ভাব্য প্রতিশ্রুতি আসে। এতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উচ্চতর পর্যায়ে পৌঁছায় এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের আওতায় সহযোগিতা জোরদার হয়।¹
মূল যুক্তিটি প্রাতিষ্ঠানিক। প্রকল্পের স্বচ্ছ হিসাব, বিশ্বাসযোগ্য চাহিদা-পূর্বাভাস এবং কাজ শেষের পর স্বাধীন পর্যালোচনা না থাকলে সরকার উৎপাদনশীল বিনিয়োগ আর ব্যয়বহুল নির্মাণের পার্থক্য নির্ভরযোগ্যভাবে ধরতে পারে না। বাংলাদেশ-চীন সহযোগিতার পরবর্তী ধাপ বিচার হওয়া উচিত পরিমাপযোগ্য প্রতিদান দিয়ে, কূটনৈতিক ঘোষণা দিয়ে নয়। এজন্য আর্থিক কর্মক্ষমতা, বৃহত্তর সামাজিক সুফল এবং শেষ পর্যন্ত করদাতাদের কাঁধে চাপা ঝুঁকিকে আলাদা করে দেখতে হবে। ব্যবহারকারীর কাছ থেকে পর্যাপ্ত মাশুল না উঠলেও একটি প্রকল্প সামাজিকভাবে মূল্যবান হতে পারে। আবার চোখধাঁধানো নির্মাণের আড়ালে মূলধন বরাদ্দের দুর্বলতাও লুকিয়ে থাকতে পারে।
অবকাঠামো ও ব্যবহারের ঘাটতি
পদ্মা সেতু রেল সংযোগ ঢাকার সঙ্গে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ভৌত যোগাযোগ উন্নত করেছে। তবে যোগাযোগ ভালো হওয়া মানেই সম্পদের দক্ষ ব্যবহার নয়। ২০২৬ সালের মে মাসের একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, ঢাকা-যশোর রুটসহ নতুন নির্মিত রেললাইন লোকোমোটিভ ও কোচের সংকটে কম ব্যবহৃত হচ্ছে।² এ থেকে বোঝা যায়, পরিপূরক বিনিয়োগে ঘাটতি আছে। রেললাইনের দীর্ঘমেয়াদি মূল্য নেই, তা প্রমাণ হয় না। বিশ্বাসযোগ্য মূল্যায়নে মূল প্রাক্কলনের বিপরীতে যাত্রীসংখ্যা, মালামাল পরিবহনের পরিমাণ, ট্রেন চলাচলের সংখ্যা ও পরিচালন ব্যয় প্রকাশ করতে হবে। তাহলে নীতিনির্ধারকেরা বুঝতে পারবেন, রোলিং স্টকে বিনিয়োগ করলে লাইনটির সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাবে কি না।
কর্ণফুলী নদীর টানেল আর্থিক দিক থেকে আরও সরাসরি সতর্কসংকেত দেয়। ২০২৬ সালের জুনে সংসদকে জানানো হয়, টানেলের গড় মাসিক টোল আদায় ৩.৩৭ কোটি টাকা, অথচ পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় ৬.৯৫ কোটি টাকা।³ এই ব্যবধান পরিচালন পর্যায়ের ঘাটতি দেখায়, নেতিবাচক সামাজিক প্রতিদান নয়। ভ্রমণ সময়ের সাশ্রয়, আঞ্চলিক উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ যান চলাচল এখনো স্বাধীন মূল্যায়নের অপেক্ষায়।
পায়রার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আরেক ধরনের দুর্বলতা সামনে আনে। ২০২৬ সালের মার্চে তহবিল সংকট ও অপরিশোধিত ভর্তুকির বকেয়ার কারণে পায়রা ও রামপালের কয়লা আমদানি হুমকিতে পড়ে। দুই কেন্দ্রের সম্মিলিত বকেয়া ছিল ৪ হাজার ৭২৬ দশমিক ৩৭ কোটি টাকা।⁴ ঘটনাটি দেখায়, উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও জ্বালানি আমদানি ও বৈদেশিক মুদ্রার সীমাবদ্ধতা পিছু ছাড়ে না। এর কোনোটিই এককভাবে পদ্ধতিগত ব্যর্থতা প্রমাণ করে না। কিন্তু সবগুলো মিলিয়ে বোঝা যায়, কেন সম্পদ হস্তান্তরের পাশাপাশি পরিচালনগত প্রস্তুতি, ব্যয় ও অর্থনৈতিক সুফল যাচাই করা জরুরি।
প্রতিশ্রুতি, ছাড় ও ঋণঝুঁকি
অর্থায়নের হিসাবেও সুনির্দিষ্টতা দরকার। ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৩টি প্রকল্পের ঋণচুক্তির মোট পরিমাণ প্রায় ৮.৮৯ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত ছাড় হয়েছে ৫.৫৩ বিলিয়ন ডলার।⁵ এই অঙ্ক নির্দিষ্ট একটি প্রকল্প-তালিকার, ২০১৬ সালের মোট প্রতিশ্রুতির নয়। দুই দেশের অনুমোদন প্রক্রিয়া, মহামারির ধাক্কা এবং ঋণদানের অগ্রাধিকার বদলের কারণে বিলম্ব হয়েছে।
আইএমএফের হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চীনের কাছে বাংলাদেশের ঋণ ছিল ৫.৭৯ বিলিয়ন ডলার, যা মোট সরকারি ঋণের প্রায় ৩.১ শতাংশ। তুলনায় জাপানের কাছে ঋণ ১৩.৭৩ বিলিয়ন ডলার।⁶ ফলে চীনকে প্রধান সার্বভৌম ঋণদাতা হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ নেই। আবার এই অঙ্ক সব দায়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাবও নয়। সরবরাহকারী ঋণ, বেসরকারি বাণিজ্যিক দায় এবং কিছু প্রকল্পভিত্তিক দায় শ্রেণিবিন্যাস ও গ্যারান্টির ধরন অনুযায়ী সার্বভৌম ঋণদাতার সংজ্ঞার বাইরে থেকে যেতে পারে। তাই আইএমএফের অনুপাতকে সরকারি ঋণের একটি নির্দিষ্ট পরিমাপ হিসেবেই পড়তে হবে। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের পুরো বাণিজ্যিক সম্পর্কের হিসাবনিকাশ হিসেবে পড়া ঠিক হবে না।
নীতিগত ঝুঁকি তাই ঋণদাতার জাতীয়তা নয়। ঝুঁকি তৈরি হয় বৈদেশিক মুদ্রার দায়, অনিশ্চিত প্রকল্প আয় ও দুর্বল তথ্যপ্রকাশের পারস্পরিক প্রভাবে। অর্থবহ নিরীক্ষায় ঋণের তথ্যের সঙ্গে গ্যারান্টি, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের দায় ও চুক্তিভিত্তিক প্রতিশ্রুতি মিলিয়ে দেখতে হবে।
নির্মাণ থেকে শিল্পমূল্যে
সার্বভৌম ঋণ, প্রকৌশল চুক্তি ও সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ অর্থনৈতিকভাবে এক জিনিস নয়। ঋণ নিলে পরিশোধের দায় থাকে সরকারি খাতের ওপর। অন্যদিকে সুগঠিত ইক্যুইটি বিনিয়োগ বাণিজ্যিক ঝুঁকি বিনিয়োগকারীর দিকে সরিয়ে দিতে পারে এবং একই সঙ্গে দক্ষতা, সরবরাহকারী নেটওয়ার্ক ও রপ্তানিতে সহায়তা করে।
২০২৬ সালের দ্বিপক্ষীয় যৌথ বিবৃতিতে শিল্পের সরবরাহ শৃঙ্খল, রপ্তানি সক্ষমতা, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন এবং চট্টগ্রামের চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্প অঞ্চলে সহযোগিতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।⁷ এতে ঠিকাদারনির্ভর সম্পর্কের জায়গায় উৎপাদননির্ভর অংশীদারি গড়ার সুযোগ তৈরি হয়। বিনিয়োগের ঘোষণা আপনাআপনি শিল্প রূপান্তর ঘটাবে, এমন ধরে না নিয়ে বাংলাদেশের উচিত যাচাইযোগ্য দেশীয় উপকরণ সংগ্রহ, প্রযুক্তি আত্মস্থকরণ ও রপ্তানিসংশ্লিষ্ট কর্মসংস্থানকে অগ্রাধিকার দেওয়া। চুক্তিতে দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্য, স্থানীয় সরবরাহকারীর অংশগ্রহণ ও রপ্তানির মাইলফলক নির্দিষ্ট করে দিতে হবে। প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা রক্ষা হলো, তা নিয়ে স্বাধীন প্রতিবেদনও থাকতে হবে।
তাড়া আরও বেড়েছে, কারণ ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের কথা। উত্তরণ পেছানোর আবেদন অক্টোবরেও জাতিসংঘের বিবেচনায় ছিল।⁸ সময় যা-ই হোক, রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ ফেলে রাখার সুযোগ নেই।
জবাবদিহি কার্যকর করা
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) অর্থ বিভাগের সঙ্গে মিলে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে প্রকল্পওয়ারি একটি নিবন্ধন প্রকাশ করবে। তাতে থাকবে প্রতিশ্রুতি, স্বাক্ষরিত ঋণ, ছাড়, ঋণ পরিশোধের সূচি, গ্যারান্টি, কাজের অগ্রগতি ও দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থার নাম। বাণিজ্যিকভাবে স্পর্শকাতর তথ্য গোপন রাখা যেতে পারে, তবে সরকারের মোট দায় আড়াল করা চলবে না।
বড় ঋণ অনুমোদনের আগে পরিকল্পনা কমিশনের উচিত স্বাধীন ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ করানো। তাতে থাকবে বাস্তবসম্মত চাহিদার ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতি, বিনিময় হারের চাপ পরীক্ষা, পরিবেশগত ব্যয় এবং বিকল্প বিনিয়োগের সঙ্গে তুলনা। এই বিশ্লেষণের ফল ক্রয়প্রক্রিয়া ও মন্ত্রিসভার অনুমোদনের আগেই বিবেচনায় নিতে হবে, পরে নয়।
সবশেষে, বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) প্রকল্প চালুর তিন ও পাঁচ বছর পর প্রকাশ্য পর্যালোচনা করবে। সেখানে থাকবে সম্পদের ব্যবহারের মাত্রা, পরিচালন ভর্তুকি ও অর্জিত উৎপাদনশীলতা। উল্লেখযোগ্য বিচ্যুতির ব্যাখ্যা দেওয়া এবং সংশোধনী পরিকল্পনা প্রকাশ করা হবে প্রকল্প পৃষ্ঠপোষকদের দায়িত্ব। এগুলো প্রাতিষ্ঠানিক চর্চার প্রস্তাব মাত্র, এমন ব্যবস্থা ইতিমধ্যে চালু আছে বলে দাবি করা হচ্ছে না। জবাবদিহি চীনা অর্থদাতা ও ঠিকাদারদের ক্ষেত্রেও খাটতে হবে। ঋণের শর্ত, ক্রয় পদ্ধতি, ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও কাজের মান খতিয়ে দেখা দরকার। প্রকাশ্য প্রতিবেদনে ন্যায্য বাণিজ্যিক গোপনীয়তা রক্ষা পাবে, কিন্তু উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি চাপা পড়বে না।
উপসংহার
শি চিনপিংয়ের সফর দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার পরিধি বদলে দিতে ভূমিকা রেখেছে, আর বেশ কিছু সম্পদের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনাও রয়েছে। কিন্তু অবকাঠামো হস্তান্তর কিংবা সার্বভৌম ঋণের সামান্য অংশ, কোনোটিই প্রমাণ করে না যে মূলধন কার্যকরভাবে বরাদ্দ হয়েছে। বাংলাদেশের পরবর্তী কাজ হলো রাজস্ব নমনীয়তা ও কৌশলগত বিকল্প ধরে রেখে অর্থায়নকে প্রমাণযোগ্য সুফলে রূপ দেওয়া।
আগামী দশকের চূড়ান্ত মাপকাঠি হওয়া উচিত উৎপাদনশীলতা, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা জনমূল্য। পরবর্তী প্রতিশ্রুতির আকার সেই মাপকাঠি নয়।
তথ্যসূত্র:
1. Byron, R. K. and Rahman, M. F. (2016) ‘$24.45b deals’, The Daily Star, 14 October. Available at: https://www.thedailystar.net/frontpage/2445b-deals-1298929.
2. Hasan, R. (2026) ‘BR fails to fully utilise 340km new rail lines set up with Tk55,000cr’, Daily Sun, 17 May. Available at: https://www.daily-sun.com/back-page/875127.
3. Star Online Report (2026) ‘Karnaphuli Tunnel earns Tk 3.37cr, costs Tk 6.95cr a month to operate: Rabiul’, The Daily Star, 29 June. Available at: https://www.thedailystar.net/news/the-parliament-watch/parliament/news/karnaphuli-tunnel-earns-tk-337cr-costs-tk-695cr-month-operate-rabiul-4211316.
4. Kashem, A. (2026) ‘Payra, Rampal won’t supply power in summer unless subsidy payments released’, The Business Standard, 4 March. Available at: https://www.tbsnews.net/bangladesh/payra-rampal-wont-supply-power-summer-unless-subsidy-payments-released-1376701.
5. Byron, R. K. and Chakma, J. (2026) ‘A decade on, half of China’s $20 billion pledge enters aid pipeline’, The Daily Star, 22 June. Available at: https://www.thedailystar.net/spotlight/news/decade-half-chinas-20-billion-pledge-enters-aid-pipeline-4204616.
6. International Monetary Fund (2026) Bangladesh: Debt Sustainability Analysis, IMF Country Report No. 26/024. Available at: https://www.elibrary.imf.org/abstract/journals/002/2026/024/article-A003-en.xml.
7. Ministry of Foreign Affairs of the People’s Republic of China (2026) Joint Communiqué between China and Bangladesh, 26 June. Available at: https://asean.china-mission.gov.cn/eng/zgyw/202606/t20260626_11953170.htm.
8. United Nations Committee for Development Policy (2026) Bangladesh Graduation Status. Available at: https://www.un.org/ldcportal/content/bangladesh-graduation-status
