ফারাহ জেহির
নির্বাহী সম্পাদক, অনিকেত বুলেটিন
বাংলাদেশের সিনেমা ও স্ট্রিমিং খুব দ্রুত বদলে গেছে। কিছুদিন আগেও নায়কের কাছে কিছুটা নৈতিক মূল্যবোধ আশা করা হতো। এখন নায়করা ধীরগতির দৃশ্যে সিগারেট ধরান, মদ খান, মাদক নেন, সম্পর্কের পর সম্পর্কে ভেসে যান, আর ক্যামেরা সবকিছুকেই দেখায় স্টাইল হিসেবে। অনেকে একাই কয়েক ডজন প্রতিপক্ষকে পিটিয়ে ফেলেন, প্রতিটি বিরোধ মেটান ঘুষি বা অস্ত্রে। পর্দার কোণে ছোট একটি সতর্কবার্তা ভেসে ওঠে, গল্প এগিয়ে যায়। সমাজে এসব ঘটনা আছে বলে আপত্তি নয়। আপত্তি এগুলো কীভাবে দেখানো হচ্ছে, কাদের সামনে দেখানো হচ্ছে, আর এর পরিণতি কী দেখানো হচ্ছে, তা নিয়ে।
বাস্তবতা, না নতুন বাস্তবতা
নির্মাতারা বলেন, তাঁরা সমাজের সামনে আয়না ধরেন, আর সৎ শিল্পকে অস্বস্তিকর সত্যও দেখাতে হয়। কথাটা ঠিক। কিন্তু আয়না শুধু প্রতিফলন দেখায়, সিনেমা মানুষকে গড়েও। সবচেয়ে জনপ্রিয় তারকা যখন কোনো মূল্য না দিয়েই ধূমপান করেন, মদ খান, নিয়ম ভাঙেন, তখন দর্শক শেখে সফল মানুষ কেমন আচরণ করে।
বিভিন্ন দেশের গবেষণায় দেখা গেছে, পর্দায় ধূমপান দেখলে তরুণদের মধ্যে অভ্যাসটি শুরু করার প্রবণতা বাড়ে, বিশেষ করে ধূমপায়ী চরিত্রটি যখন আকর্ষণীয় নায়ক। কিশোররা প্রিয় তারকার চুলের ধরন, সংলাপ আর পোশাক নকল করে। তাহলে অভ্যাসও নকল করবে, এটাই স্বাভাবিক। একই প্রশ্ন ওঠে তখনও, যখন গল্পে নারী বা পুরুষ চরিত্র হানি ট্র্যাপ চালায়, প্রতারণা করে, কিংবা সম্পর্ককে সম্পদের সিঁড়ি বানায়। এমন আচরণ যখন টাকা আর হাততালি এনে দেয়, বার্তাটা পরিষ্কার। সরাসরি কার্যকারণ প্রমাণ করা কঠিন, তবে জনস্বাস্থ্য ও তরুণদের নিরাপত্তা যেখানে জড়িত, সেখানে সতর্ক থাকাই যুক্তিসংগত।
আইনের জায়গায় নায়ক
সহিংসতা নিয়ে আলাদা করে ভাবা দরকার। সাম্প্রতিক অনেক ছবিতে এমন নায়ক দেখা যায়, যিনি পুলিশ ও আদালতে আস্থা রাখেন না, নিজ হাতে প্রতিশোধ নিয়ে হাততালি কুড়ান। রক্তপাত দেখানো হয় খুঁটিয়ে, সঙ্গে থাকে এমন সংগীত, যা দর্শককে উল্লাসে উসকে দেয়। একদল লোক একজন সন্দেহভাজনকে পিটিয়ে মারে, ছবি তাকে বলে ন্যায়বিচার। আর বিচারব্যবস্থাকে দেখানো হয় দুর্নীতিগ্রস্ত, হাস্যকর বা অকেজো হিসেবে।
যে দেশে গণপিটুনিতে মানুষ আগেই প্রাণ হারিয়েছে, সেখানে এই বার্তা বিপজ্জনক। বারবার শুনলে দর্শক ভাবতে শুরু করে, আদালত অর্থহীন, অস্ত্রধারী শক্তিমান পুরুষই আসল রক্ষক। তখন অধৈর্য বাড়ে, আর তরুণরা আগ্রাসনকে সাহস এবং সংযমকে দুর্বলতা বলে ভাবতে শেখে। সমস্যা সহিংসতা দেখানোয় নয়, গুরুত্বপূর্ণ সিনেমাকে কখনো কখনো তা দেখাতেই হয়। সমস্যা তা দেখানোয়, যখন তাতে কোনো যন্ত্রণা, জবাবদিহি বা দ্বিধা থাকে না।
পর্দায় যা থাকে না
যে নায়ক ধূমপান করেন আর মারামারি করেন, তাঁকে প্রায় কখনোই দেখা যায় না জিমে অনুশীলন করতে, খেলাধুলা করতে, প্রতিবেশীকে সাহায্য করতে, কিংবা অপরাধের খবর যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানাতে। পরিণতিও হারিয়ে যায়। নেশা, আঘাত, মানসিক ক্ষত, ঋণ, আইনি জটিলতা আর ভেঙে যাওয়া পরিবার খুব কমই দেখা যায়। দেখা গেলেও আসে শেষে একটুখানি নীতিকথার মতো। তরুণ দর্শকের মনে থাকে গল্প কী উদযাপন করেছে, শেষের ক্যাপশনে কী লেখা ছিল তা নয়।
যেখানে ব্যবস্থা দুর্বল
চলচ্চিত্র আইনে পরিবর্তন এসেছে। ২০২৩ সালের চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন আইন ১৯৬৩ সালের চলচ্চিত্র সেন্সরশিপ আইনের জায়গা নিয়েছে, আর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে সেন্সর বোর্ডের বদলে গঠিত হয়েছে চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ড। তবে সেন্সর বোর্ডকে যে পুরোনো বিধি ও কোড পথ দেখিয়েছে, তার মনোযোগ ছিল অশ্লীলতা, রাজনৈতিক স্পর্শকাতরতা আর জাতীয় ভাবমূর্তির দিকে। মহিমান্বিত ধূমপান ও মদ্যপান, কারসাজি কিংবা রক্তপাতের উদযাপন প্রায়ই ছাড়পত্র পেয়ে যায়, কারণ কোনো একটি দৃশ্য এত স্পষ্ট নয় যে কেটে ফেলা যায়, যদিও সব মিলিয়ে ছবির প্রভাব ক্ষতিকর। একটি স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা দিলেই নিয়ম রক্ষা হয়, প্রভাব কমে না।
স্ট্রিমিংয়ের জন্য কোনো আলাদা কনটেন্ট আইন নেই। ২০২০ সালের একটি আদালতের আবেদনের পর টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও তথ্য মন্ত্রণালয় বছরের পর বছর খসড়া করলেও স্বতন্ত্র কোনো ওটিটি আইন হয়নি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে উপদেষ্টা পরিষদে অনুমোদিত টেলিযোগাযোগ (সংশোধন) অধ্যাদেশ ওটিটি ও স্ট্রিমিং সেবাকে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) আওতায় এনেছে। এতে প্ল্যাটফর্মগুলো একটি নিয়ন্ত্রক সংস্থার অধীনে এল ঠিকই, কিন্তু তা টেলিযোগাযোগ বিষয়ক ব্যবস্থা, বয়সভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাসের কাঠামো নয়। মানবাধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করেছে, জনকল্যাণ ও জাতীয় নিরাপত্তার মতো বিস্তৃত শব্দের অপব্যবহার হতে পারে। প্ল্যাটফর্মগুলো এখনও নিজেদের কনটেন্টের রেটিং নিজেরাই ঠিক করে। ফলে পরিবারের একই লগইনে একটি শিশুও দেখতে পারে প্রাপ্তবয়স্ক যা দেখে। অনলাইনে একবার ছড়িয়ে পড়লে সহিংস দৃশ্য বা স্টাইলিশ ধূমপানের ক্লিপ সামাজিক মাধ্যমে অবিরাম ঘুরতে থাকে, প্রসঙ্গ ও সতর্কবার্তা ছাড়াই।
আরও গভীর ফাঁক প্রয়োগে। ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫ (২০১৩ সালে সংশোধিত) বিনোদনমাধ্যমে তামাক ব্যবহারের চিত্রায়ণে বিধিনিষেধ দিয়েছে। ২০১৫ সালের বিধিমালায় এ ধরনের দৃশ্য দেখানোর অনুমতি আছে কিছু শর্তে, যার একটি পর্দায় স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা। তামাকবিরোধী সংগঠনগুলো এখনও ছবিতে লঙ্ঘন খুঁজে পাচ্ছে। বাংলাদেশ ২০০৫ সালে তামাক নিয়ন্ত্রণে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশনে যুক্ত হয়েছে, টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) অর্জনেও অঙ্গীকার করেছে। কিন্তু চলচ্চিত্রের সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা এর কোনোটির সঙ্গেই যুক্ত নয়। বাংলাদেশি দর্শক, বিশেষ করে তরুণরা, এসব চিত্রায়ণ থেকে কী গ্রহণ করে, সে বিষয়ে দেশীয় গবেষণাও নেই। তথ্য ছাড়া প্রতিটি বিতর্কই মতামতের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।
আইন ও সার্টিফিকেশন বোর্ডের করণীয়
শুরুটা হতে হবে এমন একটি স্পষ্ট কাঠামো দিয়ে, যা সিনেমা, টেলিভিশন ও স্ট্রিমিংকে এক ক্ষেত্র হিসেবে দেখে। কারণ একই গল্প সিনেমা হলে কড়া যাচাইয়ের মুখে পড়ে, আর মোবাইলে প্রায় কোনো যাচাই ছাড়াই পৌঁছে যায়। লাইসেন্সিং ও প্রযুক্তিগত সম্মতির দায়িত্ব থাকবে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রকের হাতে, কনটেন্ট দেখবে সার্টিফিকেশন সংস্থা। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, শিশু মনোবিজ্ঞানী, নারী প্রতিনিধি, অভিভাবক, আইনজীবী ও চলচ্চিত্র নির্মাতাদের নিয়ে গঠিত একটি স্বাধীন বোর্ড শ্রেণিবিন্যাস তদারক করবে। বয়সভিত্তিক রেটিং হবে বাস্তব, প্রোফাইল লক, পিন নিয়ন্ত্রণ ও বয়স যাচাইয়ের মাধ্যমে কার্যকর।
নিয়মগুলো এসডিজির সঙ্গেও যুক্ত করা উচিত। লক্ষ্যমাত্রা ৩.এ তামাক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে, তাই সার্টিফিকেশনকে তামাক আইনের সঙ্গে মেলানো সংগত। অভীষ্ট ১৬ চায় সহিংসতা কমুক (১৬.১), আইনের শাসন থাকুক (১৬.৩), প্রতিষ্ঠান হোক জবাবদিহিমূলক ও স্বচ্ছ (১৬.৬)। গণপিটুনিকে মহিমান্বিত করা রোধ এবং বোর্ডের জন্য স্পষ্ট প্রক্রিয়া তৈরি, দুটোই এর সঙ্গে মেলে। লক্ষ্যমাত্রা ৪.৭ স্কুলে ও ঘরে গণমাধ্যম সাক্ষরতার পক্ষে। অগ্রগতি মাপার জন্য বোর্ড প্রতি বছর দর্শকজরিপ প্রকাশ করবে।
নির্দেশিকার লক্ষ্য হওয়া উচিত মহিমান্বিতকরণ, উপস্থিতি নয়। ক্ষতিকর আচরণ পরিণতিসহ সততার সঙ্গে দেখানো এক কথা, আর তাকে আকর্ষণীয় ও আকাঙ্ক্ষিত করে উপস্থাপন করা সম্পূর্ণ আলাদা। স্টাইল করে ধূমপান ও মদ্যপান, পণ্যের প্রচার, গণবিচার ও প্রতিশোধের উদযাপন এবং প্রতারণা বা শোষণকে বীরত্ব হিসেবে দেখানো নিরুৎসাহিত করতে হবে। একই সঙ্গে এসব সমস্যা নিয়ে গুরুতর নাটক নির্মাণ সুরক্ষিত থাকবে। স্বাস্থ্যবার্তা পুরো দৃশ্য জুড়ে দৃশ্যমান থাকা উচিত। তারকারাও সচেতনতা কর্মসূচিতে যুক্ত হতে পারেন, কারণ তাঁদের প্রভাব দুই দিকেই কাজ করে।
শুধু নিয়ন্ত্রণ দিয়ে ভালো গল্প তৈরি হয় না, তাই ভালো গল্পকে পুরস্কৃত করার ব্যবস্থাও থাকা চাই। কর সুবিধা, অনুদান ও পুরস্কার উৎসাহ দিতে পারে এমন নায়কদের জন্য, যাঁরা খেলোয়াড়, বিজ্ঞানী, শিক্ষক, পুলিশ কর্মকর্তা বা উদ্যোক্তা। তাঁদের দেখাতে হবে রোমাঞ্চকরভাবে, শুধু আদর্শবান হিসেবে নয়। পুরো প্রক্রিয়ায় নিয়ন্ত্রণের মানদণ্ড হবে স্পষ্ট, সিদ্ধান্ত হবে প্রকাশিত, আর থাকবে আপিলের অধিকার, যাতে জনগণ সুরক্ষা পায় এবং নিয়ন্ত্রণ খেয়ালখুশি বা রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার না হয়ে ওঠে।
সরকারের নীতি কেমন হওয়া উচিত
সরকারের উচিত পর্দার কনটেন্টের জন্য একটি জাতীয় নীতি গ্রহণ করা, যা সিনেমা, টেলিভিশন ও স্ট্রিমিংকে অভিন্ন বয়সভিত্তিক রেটিংয়ের আওতায় আনবে। প্ল্যাটফর্মগুলো নিবন্ধিত হবে এবং প্রকাশিত নিয়ম মেনে নিজেদের কনটেন্টের রেটিং দেবে, প্রতিটি শিরোনামের জন্য আলাদা অনুমোদন চাইতে হবে না। কনটেন্টের শ্রেণিবিন্যাসের দায়িত্ব থাকবে সার্টিফিকেশন বোর্ডের, লাইসেন্সিংয়ের দায়িত্ব টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রকের, যাতে কোনো ভূমিকাই অন্যটির ওপর চাপ সৃষ্টির উপায় না হয়। বিধিতে বিচার হবে মহিমান্বিতকরণের, উপস্থিতির নয়। এর সঙ্গে থাকবে তামাকের দৃশ্যের নজরদারি, বারবার লঙ্ঘনকারীর জন্য শাস্তি, প্রতিটি প্ল্যাটফর্মে অভিভাবকীয় নিয়ন্ত্রণ এবং যেকোনো কনটেন্ট সরানো বা রেটিংয়ের বিরুদ্ধে আপিলের অধিকার। নীতিতে প্রতিবছর দর্শকগবেষণার জন্য তহবিল রাখতে হবে, গঠনমূলক গল্পকে কর ছাড়, অনুদান ও পুরস্কার দিয়ে উৎসাহিত করতে হবে। আর সরকার যেসব এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা পূরণে অঙ্গীকার করেছে, তার অগ্রগতি নিয়ে প্রতি বছর প্রতিবেদন প্রকাশ করবে।
দায় সবার
সৃজনশীল স্বাধীনতা ও সামাজিক দায়িত্ব একে অপরের শত্রু নয়। সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সিনেমা সবসময়ই মানুষের দুর্বলতা নিয়ে সৎ থেকেছে, আবার মানুষের মর্যাদায় আস্থাও রেখেছে। নির্মাতা, প্ল্যাটফর্ম, নিয়ন্ত্রক ও পরিবার, প্রত্যেকের হাতেই সমাধানের একটি অংশ আছে। সবাই মিলে এগোলে বাংলাদেশের পর্দা সাহসী ও সত্যনিষ্ঠ থেকেই তরুণদের সামনে এমন নায়ক তুলে ধরতে পারবে, যাঁদের অনুসরণ করা যায়।
