আরজা সাইত
ইউনিভার্সিটি অব বার্মিংহাম দুবাই
শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ শুরু হওয়ার পর থেকে দিল্লিতে রাজনৈতিক অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে, যার প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশেও। নির্বাচনী তালিকা সংশোধনের দাবিতে তরুণ বিক্ষোভকারীরা নতুন করে আন্দোলন জোরদার করেছেন। তাঁদের ক্ষোভের লক্ষ্য ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার। অক্টোবরজুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে দিল্লি পুলিশ। বন্ধ রাখা হয়েছে কয়েকটি মেট্রো স্টেশন, শহরের কেন্দ্রীয় এলাকায় জারি রয়েছে নিষেধাজ্ঞা এবং দুই হাজারের বেশি বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ককরোচ জনতা পার্টির দুই নেতাও রয়েছেন। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ঐতিহাসিক একটি বিক্ষোভস্থলে সমাবেশ করায় তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়।
২০২৪ সালে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে বিক্ষোভের মুখে শেখ হাসিনার সরকারের পতন এবং তাঁর ভারতে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা বাংলাদেশ প্রত্যক্ষ করেছে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিরতা ক্ষমতাসীন দলের ওপর কতটা চাপ সৃষ্টি করতে পারে, তা ঢাকার অজানা নয়। এই বিবেচনায় ভারতের চলমান অস্থিরতা নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য না করে বাংলাদেশের জন্য নীরব ও সংযত অবস্থান বজায় রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। কারণ, সরকারের যেকোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাড়তি গুরুত্ব পেতে পারে।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের জায়গা হলো ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে বাংলাভাষী মুসলমানদের পরিস্থিতি। নির্বাচনী তালিকা সংশোধনের সঙ্গে অবৈধ অভিবাসনের অভিযোগ জড়িয়ে পড়েছে। ফলে এই জনগোষ্ঠীই সবচেয়ে বেশি সন্দেহ ও নথিপত্র যাচাইয়ের মুখে পড়ছে। তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের দুর্ব্যবহার হলে বাংলাদেশের রাজনীতিকেরা ভারতের সঙ্গে সমঝোতার বিরোধিতায় সহজেই সেই ঘটনাকে যুক্তি হিসেবে তুলে ধরতে পারবেন। এমন পরিস্থিতিতে দুই দেশের সম্পর্ক আগে থেকেই চাপে রয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্থগিত সফর এবং শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে অমীমাংসিত বিরোধের কারণে।
২০২৪ সালে ভারতে চলে যাওয়ার পর থেকেই শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের দাবি জানিয়ে আসছে বাংলাদেশ। তবে আগস্টে ভারতের মাটি থেকে তাঁর সংবাদ সম্মেলনের পর দুই দেশের সম্পর্কে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়। ওই সংবাদ সম্মেলন ঢাকায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয় এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম সরকারি নয়াদিল্লি সফর পিছিয়ে দেওয়া হয়। ঢাকা জানায়, সফর এগিয়ে নেওয়ার আগে তাদের আরও কিছুটা সময় প্রয়োজন।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এখনো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের মুখে থাকা ভারতের সরকারের পক্ষে প্রতিবেশী একটি দেশের দাবি মেনে নেওয়ার সম্ভাবনা কম। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশের সঙ্গে পুনরায় যোগাযোগ ও আলোচনা শুরুর বিষয়ে নয়াদিল্লির আগ্রহের ইঙ্গিত পাওয়া যায় ভারতের হাইকমিশনারের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বৈঠকে। এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর সফরকে আলোচ্যসূচিতে রাখা এবং দুই পক্ষের আলোচনায় উঠে আসা নভেম্বরের সম্ভাব্য সময়সীমা সামনে রেখে প্রস্তুতি নেওয়া উচিত ঢাকার।
তবে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি এমনভাবে সামলাতে হবে, যাতে তা দুই দেশের সম্পর্কের অন্য সব ক্ষেত্রকে আড়াল করে না ফেলে এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে অগ্রগতি থমকে না যায়। পানি বণ্টন, বাণিজ্য ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এমনই কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। তার আগেই নতুন চুক্তি নিয়ে আলোচনা ও সমঝোতা প্রয়োজন। এমন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে হাসিনা ইস্যুকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের প্রধান নির্ধারক হতে দিলে বাংলাদেশের এই জরুরি স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর পরিবর্তে ঢাকা আনুষ্ঠানিক আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাঁর প্রত্যর্পণের দাবি অব্যাহত রাখতে পারে, পাশাপাশি অন্যান্য ক্ষেত্রে সহযোগিতাও সচল রাখতে পারে।
নয়াদিল্লির রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং নির্বাচনী তালিকা সংশোধন নিয়ে বিরোধ যেন সীমান্তে দুই দেশের সহযোগিতাকে ব্যাহত না করে, সেদিকে নজর রাখা জরুরি। সীমান্তসংক্রান্ত বিষয়গুলো আলাদাভাবে মানবিক ও কনস্যুলার দৃষ্টিকোণ থেকে মোকাবিলা করা উচিত। আইনসম্মতভাবে সীমান্ত অতিক্রমকারী নাগরিক ও দর্শনার্থীদের ওপর নির্বাচনী তালিকা সংশোধনের প্রভাব পড়তে দেওয়া যাবে না। এ ক্ষেত্রে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) মধ্যে নীরব ও কার্যকর পর্যায়ের আলোচনা ফলপ্রসূ হতে পারে। পাশাপাশি জাতীয়তা যাচাইয়ের জন্য একটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়া থাকা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে প্রকৃত বাংলাদেশি নাগরিকদের আইনসম্মতভাবে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে, একই সঙ্গে ভারতীয় নাগরিকদের ভুলভাবে বহিষ্কারের ঝুঁকিও কমবে।
ভৌগোলিক বাস্তবতা ভারত ও বাংলাদেশকে স্থায়ীভাবে পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল করে রেখেছে। দেশ দুটি এই অঞ্চলের দীর্ঘতম স্থলসীমান্তগুলোর একটি ভাগ করে নিয়েছে। তাদের অর্থনীতি ও নদীব্যবস্থা নিবিড়ভাবে পরস্পরসংযুক্ত। বাণিজ্য ও পরিবহনের জন্য বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে যাতায়াতের সুযোগের ওপর ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোও নির্ভরশীল। দিল্লির বিক্ষোভ দুই দেশের সম্পর্কের এই মৌলিক বাস্তবতা বদলে দেবে, এমন সম্ভাবনা কম। তবে এই অস্থিরতা মনে করিয়ে দিচ্ছে, কূটনৈতিক ভুলের মূল্য এখন আরও বেশি হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বিচক্ষণ পথ হলো সংযম ও ধৈর্য। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধে জড়িয়ে পড়া থেকে বিরত থাকতে হবে, নীরব কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে দেশের নাগরিক ও স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে হবে এবং প্রধানমন্ত্রীর সফরের সম্ভাবনা ধরে রাখতে হবে, তবে সেই সফর থেকে যেন বাস্তব ও দৃশ্যমান ফল পাওয়া যায়। দুই প্রতিবেশীর মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে প্রতিটি নতুন শিরোনামের প্রতিক্রিয়ায় তৎপর হওয়ার বদলে ধারাবাহিক ও পরিমিত কূটনৈতিক পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করতে হবে।
