রেহান হোসেন
হেলথ ইকোনমিক্স,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব ও পরিবেশগত ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশে পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের সরকারি উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত সময়োপযোগী, প্রশংসনীয় ও ইতিবাচক একটি পদক্ষেপ। তবে কেবল বিশাল সংখ্যার চারা রোপণ করাই পরিবেশ সুরক্ষার চূড়ান্ত সমাধান নয়। চারাগুলোকে দীর্ঘমেয়াদে বাঁচিয়ে রেখে পরিপক্ব বৃক্ষে পরিণত করার চ্যালেঞ্জটিই এখানে সবচেয়ে মুখ্য।
কত কোটি চারা মাটিতে রোপণ করা হলো, তার চেয়ে কতগুলো গাছ বেঁচে থেকে প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য রক্ষা করছে – সেটাই হওয়া উচিত সফলতার মূল মাপকাঠি।
প্রাথমিক সাফল্য ও কাঠামোগত দুর্বলতা
কর্মসূচিটি শুরুতেই বেশ জোরালো গতি পেয়েছে এবং প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রার বড় একটি অংশ অর্জিত হয়েছে। এই সফলতার পেছনে মূল শক্তি হিসেবে কাজ করছে শিক্ষা খাত। ‘ওয়ান ট্রি ওয়ান চাইল্ড’ ধারণার আওতায় লাখ লাখ শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবককে যুক্ত করে মোট লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকেরও বেশি চারা রোপণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। জনসম্পৃক্ততার দিক থেকে এটি একটি অনন্য ও চমৎকার উদ্যোগ হলেও এতে কিছু বাস্তবসম্মত ঝুঁকি থেকে যায়। বন বিভাগের অভিজ্ঞ কর্মকর্তা বা বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের বদলে অনভিজ্ঞ শিশু বা সাধারণ মানুষের ওপর চারা রোপণ ও পরিচর্যার মূল দায়িত্ব থাকলে সঠিক দিকনির্দেশনা ও কারিগরি জ্ঞানের অভাবে শুরুতেই অনেক চারা নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
এশীয় ও বৈশ্বিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, পর্যাপ্ত পরিচর্যার অভাবে রোপণের প্রথম বছরেই প্রায় ২০ শতাংশ (প্রতি ৫টির ১টি) চারা মারা যায় এবং পাঁচ বছরের মধ্যে ক্ষতি বা ধ্বংসের হার ৪০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। ফলে সুনির্দিষ্ট তদারকি না থাকলে প্রাথমিক উৎফুল্লতা ও বড় পরিসংখ্যান কেবল কাগজের হিসাব বা বিভ্রান্তি হিসেবেই থেকে যাবে।
টেকসই বনায়নের তিনটি মূল স্তম্ভ
একটি চারার সঠিকভাবে বেঁচে থাকা ও বেড়ে ওঠা প্রধানত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল – উপযুক্ত প্রজাতি নির্বাচন, সঠিক ভৌগোলিক অবস্থান এবং নিরবচ্ছিন্ন যত্ন।
প্রজাতি নির্বাচন: অতীতে দ্রুত বৃদ্ধির আশায় ইউক্যালিপটাস বা অ্যাকাশিয়ার মতো ক্ষতিকর বিদেশি প্রজাতির বহুল ব্যবহার মাটির পুষ্টি ও ভূগর্ভস্থ পানি শুষে নেওয়ার পাশাপাশি দেশীয় জীববৈচিত্র্য নষ্ট করেছে। সরকার ২০২৫ সাল থেকে এসব প্রজাতি নিষিদ্ধ করে দেশীয় ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছ লাগানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। এই সিদ্ধান্তকে কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে কঠোর আইনি বাধ্যবাধকতায় রূপ দেওয়া জরুরি।
ভৌগোলিক অবস্থান: স্থান নির্বাচনে ভুল করলে বড় অঙ্কের সরকারি সম্পদ বিফলে যায়। খরাপ্রবণ বা পাহাড়ী অঞ্চলে স্যাঁতসেঁতে স্থানের গাছ বাঁচবে না। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা সহনশীল ম্যানগ্রোভ, শহরাঞ্চলে ছায়াদানকারী পথবৃক্ষ এবং গ্রামীণ বসতবাড়িতে ফলদ গাছ নির্বাচন করা উচিত। বৃক্ষ যখন মানুষের জীবিকা বা খাদ্যের যোগান দেয়, তখন স্থানীয় বাসিন্দারা স্বতঃস্ফূর্তভাবেই তা পাহারা দেয়।
নিরবচ্ছিন্ন পরিচর্যা: রোপণের পর গবাদিপশুর হাত থেকে বাঁচাতে বেড়া দেওয়া, নিয়মিত পানি ও সার দেওয়া এবং আগাছা পরিষ্কার করা অত্যন্ত জরুরি। প্রাকৃতিক কারণে কিছু চারা নষ্ট হওয়া স্বাভাবিক, তাই পরিকল্পনাতেই অন্তত ২০ শতাংশ অতিরিক্ত চারা প্রতিস্থাপনের বাজেট বরাদ্দ রাখা আবশ্যক।
প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, তদারকি ও অর্থায়ন
কর্মসূচিকে সফল করতে সরকারের মনিটরিং ব্যবস্থা হতে হবে অত্যাধুনিক ও স্বচ্ছ। ‘ট্রি মনিটরিং অ্যাপ’ ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করে নার্সারি থেকে শুরু করে ১, ২ ও ৩ বছর পর ঠিক কতগুলো চারা বেঁচে আছে – তার নির্ভুল ডাটাবেজ তৈরি করে তা সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। একই গাছকে একাধিক সংস্থার খাতায় গণনার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। তথ্যের সততা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে পরিবেশবাদী সংগঠন, গবেষক ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়কে স্বাধীন পর্যবেক্ষক হিসেবে যুক্ত করা যেতে পারে।অর্থায়নের নীতিতেও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। কেবল চারা কেনাতেই সব টাকা খরচ না করে রোপণকৃত চারার পরবর্তী ৩ বছরের তদারকি ও পরিচর্যার খরচ বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। প্রতিটি চারা রোপণ প্রকল্পের সঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির নাম ও রক্ষণাবেক্ষণের সুনির্দিষ্ট বাজেট থাকা বাধ্যতামূলক।
সামাজিক বনায়ন ও লোকাল মডেল
নেপালসহ অন্যান্য দেশের ‘কমিউনিটি ফরেস্ট্রি’ বা সামাজিক বনায়ন মডেল এ ক্ষেত্রে শিক্ষণীয় হতে পারে। সেখানে স্থানীয় জনগণকে বনের অভিভাবক বানিয়ে বনজ সম্পদের সুনির্দিষ্ট সুবিধা দেওয়া হয়, ফলে মানুষ নিজের স্বার্থেই বন রক্ষা করে। বাংলাদেশেও মসজিদ, স্কুল, ক্লাব ও স্থানীয় সামাজিক সংগঠনগুলোকে সুবিধাভোগী হিসেবে যুক্ত করলে সরকারি কর্মকর্তাদের চেয়ে সাধারণ মানুষ আরও ভালোভাবে চারা তদারকি করতে পারবে।কারিগরি নির্দেশিকাগুলোকে সহজ ও সাবলীল বাংলায় ছোট পুস্তিকা আকারে ইউনিয়ন পরিষদ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পৌঁছে দেওয়া দরকার, যাতে সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে কোন মাটিতে কোন চারা লাগাতে হবে এবং তা কীভাবে পরিচর্যা করতে হয়।
সমন্বিত পরিবেশ নীতি ও নাগরিক দায়িত্ব
এই ২৫ কোটি চারা রোপণ কর্মসূচিকে দেশের সার্বিক পরিবেশ নীতির সঙ্গে মেলাতে হবে। একদিকে শতবর্ষী প্রাচীন গাছ কেটে ফেলা আর অন্যদিকে দুটি ক্ষুদ্র চারা রোপণ করে আত্মতুষ্টি পাওয়ার মানসিকতা পরিবেশের স্থায়ী ক্ষতি ঠেকাবে না। পুরাতন বৃক্ষ রক্ষা, নদী-হাওরের ইকোসিস্টেম বজায় রাখা এবং কার্বন পরিমাপের সঠিক ব্যবস্থা করা গেলে এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিলের সঙ্গে যুক্ত হতে পারবে।একই সঙ্গে নাগরিক ও বেসরকারি দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সাধারণ নাগরিকেরা নিজেদের প্রাঙ্গণে দেশীয় চারা রোপণ করে অন্তত ৩ বছরের পরিচর্যার দায়িত্ব নিতে পারেন। কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো বিজ্ঞাপনী চটক হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যায় তাদের সিএসআর (CSR) তহবিল বরাদ্দ দিতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিটি শিক্ষার্থীকে একটি গাছের অভিভাবক হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে।
উপসংহার
এই ২৫ কোটি চারা রোপণের প্রকৃত গুরুত্ব আজ উদ্যাপিত অনুষ্ঠানে মাপা যাবে না। এর আসল হিসাব মিলবে ২০৩১ সালে। তখন মূল প্রশ্ন হবে – এই ২৫ কোটির মধ্যে কতগুলো গাছ বাস্তবে সতেজ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এবং তা আমাদের পরিবেশ ও মানুষের জীবিকায় কতটা অবদান রাখছে।স্বচ্ছ নজরদারি, উপযুক্ত প্রজাতি নির্বাচন, স্থানীয়দের সম্পৃক্ততা এবং পরিচর্যার দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলেই কেবল এই কর্মসূচী বাংলাদেশের জলবায়ু সুরক্ষার ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হয়ে থাকবে। তা না হলে এটি সরকারি রিপোর্টের পাতায় কেবলই একটি বিশাল সংখ্যা হয়ে থেকে যাবে, যার আসল সুবিধা দেশের মাটিতে খুব কমই দেখা যাবে।
