আলী আসাদ সাবির
বিশ্বব্যাংক
বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় যেকোনো দেশের তুলনায় দ্রুত গ্রামীণ দারিদ্র্য কমিয়েছে। পাকিস্তানও দারিদ্র্য হ্রাসে অগ্রগতি করেছিল, কিন্তু পরবর্তীতে সেই অর্জনের বড় অংশ ধরে রাখতে পারেনি। দুই দেশের অভিজ্ঞতা ভিন্ন মনে হলেও মূল সমস্যাটি একই। উভয় দেশই গ্রামীণ মানুষের আয় বৃদ্ধি করেছে মূলত বেশি মানুষকে কর্মসংস্থানে যুক্ত করার মাধ্যমে, সেই কাজের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর মাধ্যমে নয়।
এই কারণেই বাংলাদেশের অগ্রগতি এখন ধীর হয়ে আসছে এবং পাকিস্তানের গ্রামীণ অর্থনীতি দীর্ঘ সময় ধরে দরিদ্রতার চক্রে আটকে রয়েছে। দুই দেশের জন্য শিক্ষাটি একই এবং সেই সমাধানের শুরু ভূমি ব্যবস্থাপনা থেকে।
বাংলাদেশ: বাস্তব অগ্রগতি, কিন্তু এখন ধীরগতি
বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালে প্রকাশিত Bangladesh Poverty and Equity Assessment প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে এনেছে। একই সময়ে চরম দারিদ্র্যের হার ১২ দশমিক ২ শতাংশ থেকে কমে ৫ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে আসে।
এই অগ্রগতির বড় অংশ এসেছে গ্রামীণ অঞ্চল থেকে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রামীণ কর্মসংস্থানে অকৃষি কাজের অংশ ১৯৯১ সালের ৩০ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০১৯ সালে ৬২ শতাংশে পৌঁছেছে। অনেক কৃষক কৃষিকাজ ছেড়ে দোকান, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসার মতো কাজে যুক্ত হয়েছেন। তবে এই অগ্রগতির গতি এখন কমে এসেছে।
একই মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের পর থেকে প্রবৃদ্ধি আগের তুলনায় কম অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে। প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ মানুষ, অর্থাৎ দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ, এখনো এমন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে যে একটি বড় ধরনের ধাক্কায় তারা আবার দারিদ্র্যের মধ্যে ফিরে যেতে পারে। বাংলাদেশ কর্মসংস্থান তৈরি করেছে, কিন্তু সেই অর্জনকে দীর্ঘস্থায়ী করার মতো দ্রুত উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে পারেনি।
পাকিস্তান: দীর্ঘ ও কঠিন পথ
বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের Reclaiming Momentum Towards Prosperity: Pakistan’s Poverty, Equity and Resilience Assessment প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানে দারিদ্র্যের হার ২০০১-০২ সালের ৬৪ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে ২০১৮-১৯ সালে ২১ দশমিক ৯ শতাংশে নেমেছিল। এই অগ্রগতির প্রধান কারণ ছিল গ্রামীণ শ্রমিকদের অনানুষ্ঠানিক শহুরে কর্মসংস্থানে স্থানান্তর, বিশেষ করে পরিবহন ও নির্মাণ খাতে।
তবে এই অগ্রগতি বাংলাদেশের তুলনায় আরও সংকীর্ণ ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছিল এবং দ্রুত ভেঙে পড়ে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোভিড-১৯ মহামারি, ২০২২ সালের বন্যা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে ২০২৩-২৪ সালে দারিদ্র্যের হার আবার বেড়ে ২৫ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছেছে।
প্রতিবেদনটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে আগের প্রবৃদ্ধির পেছনে থাকা ভোগনির্ভর অর্থনৈতিক মডেল এখন তার সীমায় পৌঁছেছে। বর্তমানে পাকিস্তানের গ্রামীণ দারিদ্র্যের হার প্রায় ৩৬ শতাংশ, যা শহুরে দারিদ্র্যের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি। একই সঙ্গে দেশের ৮৫ শতাংশের বেশি কর্মসংস্থান এখনো অনানুষ্ঠানিক খাতে রয়েছে।
অভিন্ন সংকটের জায়গা
দুই দেশের ভিন্ন ইতিহাস ও অভিজ্ঞতার আড়ালে মূল প্রক্রিয়াটি একই। বাংলাদেশ গ্রামীণ কর্মসংস্থানের বৈচিত্র্য বাড়িয়েছে, আর পাকিস্তান গ্রামীণ শ্রমশক্তিকে শহুরে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির দিকে ঠেলে দিয়েছে। কিন্তু কোনো দেশই শ্রমশক্তিকে পর্যাপ্ত দ্রুত উচ্চ উৎপাদনশীল খাতে স্থানান্তর করতে পারেনি, যাতে অর্জিত উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী হয়। এর ফল হলো উভয় দেশেই বৈষম্য বাড়ছে।
বাংলাদেশের মূল্যায়নে দেখা যায়, ২০১৬ সালের পর আয় বৃদ্ধির সুবিধা তুলনামূলকভাবে বেশি গেছে ধনী পরিবারের দিকে। অন্যদিকে পাকিস্তানের মূল্যায়নে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জিনি সহগ ২৮ দশমিক ৪ থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ৭ হয়েছে। দুটি ভিন্ন পথ শেষ পর্যন্ত একই জায়গায় পৌঁছেছে: এমন একটি গ্রামীণ অর্থনীতি, যা মানুষকে কর্মসংস্থানে যুক্ত করে, কিন্তু তাদের শ্রমের মূল্য যথেষ্ট বাড়ায় না।
উৎপাদনশীলতাভিত্তিক প্রবৃদ্ধির উদাহরণ
ভিয়েতনাম এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ১৯৮০-এর দশকের শেষ দিকে দেশটি সমবায়ভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থা বাতিল করে এবং কৃষকদের পরিবারভিত্তিক ভূমি ব্যবহারের অধিকার প্রদান করে। অর্থনীতিবিদ প্রভু পিঙ্গালি ও ভো তং সুয়ানের মতে, এই সংস্কার পরবর্তীতে ভিয়েতনামের ধান উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি তৈরি করে।
এর পর কৃষকরা কফি, কাজুবাদামসহ বিভিন্ন রপ্তানিমুখী ফসলে বৈচিত্র্য আনেন এবং কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্পও দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ২০২২ সালে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের কৃষি রূপান্তর বিষয়ক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই পরিবর্তনের ফলে ভিয়েতনামের গ্রামীণ দারিদ্র্য ৬ শতাংশের নিচে নেমে আসে। ভিয়েতনাম শুধু গ্রামীণ কর্মসংস্থান তৈরি করেনি, বরং গ্রামীণ কাজের অর্থনৈতিক মূল্য বাড়িয়েছে।
নীতিগত প্রয়োজন: উৎপাদনশীলতা এবং তার ভিত্তি হিসেবে ভূমি রেকর্ড
বাংলাদেশ ও পাকিস্তান উভয়ের জন্য প্রয়োজন এমন একটি গ্রামীণ উন্নয়ন কৌশল, যার মূল লক্ষ্য হবে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, শুধু কর্মসংস্থান সৃষ্টি নয়। এর মধ্যে থাকতে হবে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কার্যকর মূল্য শৃঙ্খল এবং এমন আনুষ্ঠানিক অকৃষি কর্মসংস্থান, যা টিকে থাকার কৃষিকাজের তুলনায় বেশি আয় নিশ্চিত করতে পারে।
তবে উৎপাদনশীলতাভিত্তিক বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজন একটি মৌলিক বিষয়: স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য ভূমি রেকর্ড। যে জমির মালিকানা ব্যাংক যাচাই করতে পারে না, সেই জমির বিপরীতে কৃষকের ঋণ পাওয়া কঠিন। রুয়ান্ডার জাতীয় ভূমি নিবন্ধন কর্মসূচি এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়।
আলী, ডেইনিঙ্গার ও গোল্ডস্টেইনের (২০১১) বিশ্বব্যাংক গবেষণায় দেখা যায়, এই কর্মসূচি ভূমি সংক্রান্ত বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে, বিশেষ করে নারী ও অনিরাপদ মালিকানার অধিকারী ব্যক্তিদের মধ্যে। তবে রুয়ান্ডা ও ইথিওপিয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে পরবর্তী গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু ভূমি নিবন্ধন করলেই ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত হয় না। এর জন্য প্রয়োজন কার্যকর আর্থিক খাত, উন্নত নিবন্ধন ব্যবস্থা এবং সহায়ক নীতি। শিক্ষাটি হলো, ভূমি রেকর্ড সব সমস্যার সমাধান নয়। তবে এর অভাবে অন্য কোনো সংস্কারের শক্ত ভিত্তি তৈরি হয় না।
পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা: ভূমি রেকর্ডে অগ্রগতি
পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এটি কোনো তাত্ত্বিক বিষয় নয়। ২০১০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে পাঞ্জাব প্রদেশ Land Records Management and Information System (LRMIS) চালু করে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত এই প্রকল্পের মাধ্যমে ৩৬টি জেলার গ্রামীণ ভূমি রেকর্ড ডিজিটাল করা হয়। এর ফলে ভূমি লেনদেন সম্পন্ন করার সময় প্রায় দুই মাস থেকে কমে এক ঘণ্টারও নিচে নেমে আসে।
বর্তমানে পাঞ্জাব Punjab Urban Land Systems Enhancement Project (PULSE) এর মাধ্যমে এই উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত করছে। এর আওতায় শহর ও শহরতলি এলাকায় ডিজিটাল ভূমি রেকর্ড, ক্যাডাস্ট্রাল ম্যাপিং এবং সমন্বিত ভূ-তথ্য ব্যবস্থা তৈরি করা হচ্ছে। পাঞ্জাব আগে ও দ্রুত এগিয়েছে, তবে অন্যান্য প্রদেশও ধীরে ধীরে একই পথে এগোচ্ছে। এই ক্রম কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। কারণ ভূমি রেকর্ড ছিল প্রথম প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। ঋণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প ও মূল্য শৃঙ্খল সবকিছুর ভিত্তিই হলো নির্ভরযোগ্য ভূমি তথ্য।
বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশও একই ধরনের সমাধানের চেষ্টা করেছে, তবে পথটি তুলনামূলক কঠিন হয়েছে। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া সরকারি ভূমি ডিজিটালাইজেশন প্রকল্প ২০২২ সাল পর্যন্ত বরাদ্দ অর্থের ১ শতাংশেরও কম ব্যবহার করতে পেরেছিল এবং নির্ধারিত সময়সীমা পূরণ করতে পারেনি বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরবর্তীতে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (UNDP) সহায়তায় Land Data Digitalization for Inclusive Growth উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা ২০২৫ সালের আগস্টে প্রথম বড় পরিসরের পরীক্ষামূলক জেলায় কার্যক্রম শুরু করে।
গ্রামীণ বৈচিত্র্য ও দারিদ্র্য হ্রাসে পাকিস্তানের তুলনায় এগিয়ে থাকলেও বাংলাদেশ এই গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরিতে পিছিয়ে রয়েছে। উন্নয়নের ভালো গল্প থাকলেই উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সংস্কার স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসে না। এর জন্য আলাদা পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ প্রয়োজন।
একই গল্প, ভিন্ন গতিতে
বাংলাদেশ ও পাকিস্তান দুটি বিপরীত গল্প নয়। বরং একই গল্পের দুটি ভিন্ন গতি। উভয় দেশই গ্রামীণ কর্মসংস্থান বাড়িয়েছে, কিন্তু গ্রামীণ উৎপাদনশীলতা যথেষ্ট বাড়াতে পারেনি, যাতে সেই উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী হয়। এই সংকটের সমাধানের শুরু খুব সাধারণ একটি বিষয় থেকে: জমির মালিক যেন নিজের জমির মালিকানা প্রমাণ করতে পারেন, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
