ড. নাঈমা পারভীন
কভেন্ট্রি ইউনিভার্সিটি
সাম্প্রতিক কয়েক দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর উন্নয়ন অর্থনীতির গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ধারাবাহিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং মানব উন্নয়নের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেশটিকে একটি নিম্ন-মধ্যম আয়ের অর্থনীতিতে পরিণত করেছে। তবে সমসাময়িক গবেষণা এখন শুধু প্রবৃদ্ধিনির্ভর উন্নয়ন নয়, বরং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের ওপর জোর দিচ্ছে, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধির জন্য লিঙ্গসমতা, বিশেষ করে শিক্ষা নীতির মাধ্যমে অর্জিত লিঙ্গসমতা, একটি কেন্দ্রীয় উপাদান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পূর্ণ অন্তর্ভুক্তি ছাড়া প্রবৃদ্ধি
কাঠামোগত দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ একটি পরিচিত উন্নয়নধারার প্রতিফলন, যেখানে দ্রুত জিডিপি প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি শ্রমবাজারে বিভাজনও বিদ্যমান। সময়ের সঙ্গে নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে, তবে তা এখনও পুরুষদের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। নারীদের অংশগ্রহণের হার প্রায় ৩৮ থেকে ৪৩ শতাংশ, যেখানে পুরুষদের ক্ষেত্রে তা ৮০ শতাংশেরও বেশি। এই বৈষম্য একটি মৌলিক অদক্ষতার ইঙ্গিত দেয়, কারণ দেশের প্রায় অর্ধেক মানবসম্পদ পূর্ণভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে না।
শ্রম অর্থনীতির গবেষণায় এ ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি প্রতিবন্ধকতার কথা উঠে এসেছে। কর্মরত নারীদের ৯৬ শতাংশেরও বেশি অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত, যেখানে চাকরির নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষার সুযোগ সীমিত। এই অনানুষ্ঠানিকতা উৎপাদনশীলতার উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে, মজুরি কমিয়ে দেয় এবং বৈষম্যকে দীর্ঘস্থায়ী করে। পাশাপাশি সামাজিক রীতি-নীতি, বৈষম্যমূলক আচরণ এবং অবৈতনিক পরিচর্যার দায়িত্ব নারীদের অর্থনৈতিক অংশগ্রহণকে নিয়মিতভাবে সীমিত করে।
একজন অর্থনীতিবিদের দৃষ্টিতে এটি শুধু একটি সামাজিক সমস্যা নয়, বরং একটি সামষ্টিক অর্থনৈতিক সমস্যা। লিঙ্গবৈষম্য শ্রমবাজারে সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টনকে ব্যাহত করে এবং সামগ্রিক উৎপাদনশীলতাকে কমিয়ে দেয়।
শিক্ষা ও লিঙ্গসমতার বৈপরীত্য
বাংলাদেশের অন্যতম উল্লেখযোগ্য বাস্তবতা হলো শিক্ষা ও লিঙ্গসমতার এই বৈপরীত্য। দেশটি বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। বর্তমানে নিম্ন মাধ্যমিক স্তরে মেয়েদের শিক্ষা সমাপ্তির হার ছেলেদের তুলনায় বেশি, এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে শিক্ষাগত অগ্রগতিও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এই সাফল্য শ্রমবাজারে সমানভাবে প্রতিফলিত হয়নি। গবেষণায় দেখা যায়, শিক্ষাগত অর্জন একাই কর্মসংস্থানে সমতা নিশ্চিত করতে পারে না। শ্রমবাজারের চাহিদা, সামাজিক মানসিকতা এবং কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতাগুলো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
অর্থনৈতিক তত্ত্ব এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা দেয়। মানবসম্পদ তত্ত্ব অনুযায়ী শিক্ষা উৎপাদনশীলতা ও আয় বৃদ্ধি করে। বাস্তব গবেষণাও দেখায় যে শিক্ষার ফলে নারীরা প্রায়ই পুরুষদের তুলনায় বেশি অর্থনৈতিক সুফল পেতে পারেন। ফলে নারীদের শিক্ষা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য একটি শক্তিশালী চালিকাশক্তি। তবে এই সুফল তখনই বাস্তবায়িত হয়, যখন শ্রমবাজার নারীদের পূর্ণ অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়। সুতরাং বাংলাদেশের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত চ্যালেঞ্জ হলো শিক্ষাগত সমতাকে অর্থনৈতিক সমতায় রূপান্তর করা।
জলবায়ু ঝুঁকি ও লিঙ্গভিত্তিক প্রভাব
বাংলাদেশের উন্নয়ন আলোচনায় তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত একটি বিষয় হলো লিঙ্গ ও জলবায়ু ঝুঁকির আন্তঃসম্পর্ক। বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বন্যা, ঘূর্ণিঝড় এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি দেশের জন্য পুনরাবৃত্ত চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এসব পরিবেশগত ঝুঁকি দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে, বিশেষ করে নারীদের।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে জলবায়ুজনিত দুর্যোগ বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে তোলে। এসব আঘাত সম্পদ ক্ষয় করে, আয়ের স্থিতিশীলতা কমায় এবং দারিদ্র্যের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। নারীরা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ তারা কৃষির মতো জলবায়ু-সংবেদনশীল খাতের ওপর বেশি নির্ভরশীল। পাশাপাশি ভূমি, ঋণ এবং অন্যান্য সম্পদে তাদের প্রবেশাধিকার সীমিত থাকে এবং দুর্যোগের সময় অবৈতনিক পরিচর্যার দায়িত্বও তাদের ওপর বেশি পড়ে।
এ ছাড়া জলবায়ুজনিত বিপর্যয় অনেক সময় মেয়েদের বিদ্যালয় ত্যাগ, বাল্যবিবাহ এবং শ্রমবাজার থেকে দূরে সরে যাওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যা বিদ্যমান লিঙ্গবৈষম্যকে আরও দৃঢ় করে। ফলে জলবায়ু সহনশীলতাকে শিক্ষা ও শ্রমনীতি উভয়ের সঙ্গে সংযুক্ত করা প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ, জলবায়ু সহনশীল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি এবং নারীদের জন্য সবুজ দক্ষতা উন্নয়ন উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
লিঙ্গসমতা অর্জনের চালিকাশক্তি হিসেবে শিক্ষা নীতি
শিক্ষা নীতি শুধু দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যম নয়, এটি সামাজিক মানসিকতা ও শ্রমবাজারের বাস্তবতাও পরিবর্তন করতে পারে। গবেষণায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
১. মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি
নারী শিক্ষায় বিনিয়োগ সরাসরি জিডিপি প্রবৃদ্ধি ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে। আন্তর্জাতিক গবেষণা দেখিয়েছে, শিক্ষাক্ষেত্রে লিঙ্গবৈষম্য কমানো গেলে মাথাপিছু উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। এটি সেই তত্ত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে মানবসম্পদের উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
২. সামাজিক মানসিকতা ও প্রত্যাশার পরিবর্তন
শিক্ষাব্যবস্থা সমাজের প্রচলিত ধারণাকে শক্তিশালীও করতে পারে, আবার পরিবর্তনও করতে পারে। অন্তর্ভুক্তিমূলক পাঠ্যক্রম, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ এবং নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ সমন্বিত লিঙ্গ-সংবেদনশীল শিক্ষা নারীদের ভূমিকা সম্পর্কে সীমাবদ্ধ ধারণাগুলো পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশে, যেখানে এখনও অনেক ক্ষেত্রে নারীর কর্মজীবনকে নিরুৎসাহিত করা হয়, সেখানে এই ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
৩. শিক্ষা থেকে কর্মজীবনে উত্তরণের সুযোগ সৃষ্টি
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে এর দুর্বল সংযোগ। নারীদের জন্য কারিগরি শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষা এবং ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করতে পারে এবং উচ্চমূল্য সংযোজিত খাতে প্রবেশের পথ তৈরি করতে পারে।
৪. কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা হ্রাস
শিক্ষা নীতিকে বিদ্যালয় ত্যাগ, বাল্যবিবাহ এবং নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের মতো বিষয়গুলোর সমাধান করতে হবে, কারণ এসব সমস্যা মেয়েদের ওপর অসমভাবে প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষার পর্যায়ে এখনও নানা চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান।
৫. আন্তঃপ্রজন্মগত প্রভাব
নারী শিক্ষা শিশুর স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পুষ্টিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই আন্তঃপ্রজন্মগত সুফলগুলো শিক্ষা ক্ষেত্রে লিঙ্গসমতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার যৌক্তিকতাকে আরও শক্তিশালী করে।
শিক্ষার বাইরে প্রয়োজনীয় পরিপূরক নীতি
যদিও শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তবে তা একাই যথেষ্ট নয়। গবেষণা দেখায় যে শ্রমবাজারে লিঙ্গবৈষম্য গভীরভাবে প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত। উদাহরণস্বরূপ, অবৈতনিক পরিচর্যার দায়িত্ব নারীদের কর্মঘণ্টা সীমিত করে এবং নিয়োগদাতাদের পক্ষপাতদুষ্ট মনোভাব কর্মসংস্থানের সুযোগ কমিয়ে দেয়।
তাই শিক্ষা নীতির পাশাপাশি প্রয়োজন:
• শ্রমবাজার সংস্কার ও কর্মসংস্থানের আনুষ্ঠানিকীকরণ
• শিশু পরিচর্যা ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা
• বৈষম্যবিরোধী আইন ও তার কার্যকর প্রয়োগ
• নিরাপদ পরিবহন ও কর্মপরিবেশ নিশ্চিতকরণ
উন্নয়নের অপরিহার্য শর্ত হিসেবে লিঙ্গসমতা
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি লিঙ্গসমতাকে উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান দিয়েছে। কারণ এটি যেমন অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি, তেমনি উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ফলাফলও। অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ আরও দেখায় যে শিক্ষা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং লিঙ্গসমতা পরস্পরকে শক্তিশালী করে এবং দীর্ঘমেয়াদে বৈষম্য হ্রাসে সহায়তা করে।
বাংলাদেশের জন্য বার্তাটি স্পষ্ট। অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে অর্থনৈতিক নীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে, বিশেষ করে শিক্ষা নীতিতে, লিঙ্গসমতাকে সংযুক্ত করতে হবে।
উপসংহার
বাংলাদেশ বর্তমানে তার উন্নয়নযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। অতীতের সাফল্য মূলত প্রবৃদ্ধি এবং কাঠামোগত পরিবর্তনের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু ভবিষ্যতের অগ্রগতি নির্ভর করবে অন্তর্ভুক্তি এবং সহনশীলতার ওপর।
শক্তিশালী শিক্ষা নীতির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত লিঙ্গসমতা এবং জলবায়ু-সচেতন উন্নয়ন কৌশল বাংলাদেশের টেকসই অগ্রগতির সবচেয়ে কার্যকর পথগুলোর একটি। এই বিষয়গুলোকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে পারলে বাংলাদেশ শুধু প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন করবে না, বরং একটি ন্যায়সঙ্গত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই উন্নয়নের মডেল হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে।
তথ্যসূত্র:
World Bank Gender Data Portal [genderdata…ldbank.org]
UNESCO Global Education Monitoring Report (2026) [unesco.org]
ILO Working Paper on Female Labour Force Participation [researchre…ry.ilo.org]
VoxDev (2024) on gender and labour markets [voxdev.org]
OECD / Thévenon et al. on gender and growth [jstor.org]
Seehuus & Strømme (2025) on returns to education [journals.sagepub.com]
UNGEI (2025) Gender-transformative education [ungei.org]
UN Women SDG analysis [unwomen.org]
Academic studies on Bangladesh labour participation [idosi.org]
