নাঈমা অনামিকা
কমিশনিং সম্পাদক, অনিকেত বুলেটিন
বাংলাদেশ ও ভারতে যৌনকর্মের আইনগত অবস্থান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব বিদ্যমান। উভয় দেশই প্রাপ্তবয়স্কদের সম্মতিতে যৌনকর্মকে সরাসরি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত না করলেও যৌনকর্মকে ঘিরে থাকা বিভিন্ন কার্যক্রম, যেমন দালালি, পতিতালয় পরিচালনা, প্রকাশ্যে আহ্বান, শোষণ ও পাচার, আইনের আওতায় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। ফলে কাগজে কলমে যৌনকর্মের অস্তিত্ব স্বীকৃত হলেও বাস্তবে যৌনকর্মীরা নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, আইনি সহায়তা ও মানবিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হন। এই প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশ ও ভারতের বিদ্যমান আইন, প্রয়োগব্যবস্থা, পাচার, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পুনর্বাসন কাঠামোর তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে আইনগত ও বাস্তবতার ব্যবধান তুলে ধরা।
বাংলাদেশে ২০০০ সালের হাইকোর্টের রায়ের পর প্রাপ্তবয়স্ক নারীর যৌনকর্মের আইনগত স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু যৌনকর্মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বহু কার্যক্রম এখনও বিভিন্ন আইনের আওতায় নিয়ন্ত্রিত বা অপরাধ হিসেবে গণ্য হওয়ায় যৌনকর্মীরা একটি অনিশ্চিত আইনগত অবস্থানের মধ্যে রয়েছেন। এর ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হয়রানি, চাঁদাবাজি ও সামাজিক বৈষম্যের ঝুঁকি তৈরি হয়। একই সঙ্গে প্রতারণা, ঋণের ফাঁদ ও জোরপূর্বক যৌনকর্মে নিয়োজিত করার মতো ঘটনা মানবপাচারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
ভারতেও একই ধরনের বৈপরীত্য দেখা যায়। সেখানে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে যৌনকর্ম সরাসরি নিষিদ্ধ নয়; তবে অনৈতিক পাচার প্রতিরোধ আইন যৌনকর্মের পারিপার্শ্বিক বহু কার্যক্রমকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে। ২০২২ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট যৌনকর্মীদের মর্যাদা ও আইনের সমান সুরক্ষার অধিকার পুনর্ব্যক্ত করে। তবুও বাস্তব প্রয়োগে সামাজিক কলঙ্ক, স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য ও পাচারের ঝুঁকি রয়ে গেছে।
বাংলাদেশে স্বীকৃতি থাকলেও নিরাপত্তা সীমিত
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো আইনগত স্বীকৃতি ও বাস্তব সুরক্ষার মধ্যে ব্যবধান। দেশে নিবন্ধিত পতিতালয় ছাড়াও হোটেল ও রাস্তাভিত্তিক যৌনকর্মের অস্তিত্ব রয়েছে। বিভিন্ন হিসাবে নারী যৌনকর্মীর সংখ্যা এক লাখ থেকে দুই লাখের মধ্যে বলে উল্লেখ করা হয়। বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো তথাকথিত ‘চুকরি’ ব্যবস্থা, যেখানে প্রতারণা, বিক্রি বা জোরপূর্বক আনার পর কৃত্রিম ঋণের বোঝা চাপিয়ে নারীদের দীর্ঘ সময় যৌনকর্মে আটকে রাখা হয়। এই ব্যবস্থা কেবল যৌনকর্মের প্রশ্ন নয়; বরং মানবপাচার, জবরদস্তি ও আধুনিক দাসত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুতর মানবাধিকার সমস্যা। আরও উদ্বেগজনক হলো, পাচারবিরোধী আইন থাকলেও তদন্ত, বিচার ও দোষী সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে দুর্বলতা থাকলে আইন কার্যকর প্রতিরোধে পরিণত হতে পারে না।
ভারতের কাঠামো: আইনি স্বীকৃতি ও বিচারিক সুরক্ষার চেষ্টা
ভারতের আইনগত কাঠামো বাংলাদেশের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন হলেও মূল দ্বন্দ্ব একই। সম্মত প্রাপ্তবয়স্কদের যৌনকর্ম সরাসরি অপরাধ নয়; কিন্তু পতিতালয় পরিচালনা, প্রকাশ্যে যৌনকর্মের আহ্বান এবং তৃতীয় পক্ষের উপার্জনের মতো কর্মকাণ্ড অপরাধের আওতায় পড়ে। ২০২২ সালের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
আদালত স্পষ্ট করে যে যৌনকর্মীদের শুধু পেশার কারণে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয় এবং তাদেরও আইনের সমান সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। এই অবস্থান যৌনকর্মীদের অধিকারকে কেবল নৈতিকতার প্রশ্ন হিসেবে না দেখে মানবাধিকার ও আইনের শাসনের প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনার সুযোগ তৈরি করেছে।
স্বাস্থ্য ও মানবপাচার: দুই দেশেরই অভিন্ন সংকট
বাংলাদেশ ও ভারতে যৌনকর্মীদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সামাজিক কলঙ্ক, স্বাস্থ্যকর্মীদের বৈষম্যমূলক আচরণ এবং গোপনীয়তার অভাব অনেককে প্রাতিষ্ঠানিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে দূরে রাখে। ফলে যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্য, এইচআইভি এবং অন্যান্য সংক্রমণ প্রতিরোধে ঝুঁকি বাড়ে।
মানবপাচারের ক্ষেত্রেও দুই দেশের বাস্তবতা পরস্পর সম্পর্কিত। বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তবর্তী অঞ্চল দিয়ে নারী ও শিশু পাচারের ঘটনা দুই দেশের যৌনশিল্পের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ। তাই পাচার মোকাবিলায় শুধু জাতীয় আইন যথেষ্ট নয়; সীমান্তপারের সমন্বিত তদন্ত ও বিচারব্যবস্থাও প্রয়োজন।
পুনর্বাসন ও সামাজিক সুরক্ষায় পার্থক্য
ভারতের কেন্দ্র ও রাজ্যভিত্তিক প্রশাসনিক কাঠামোর কারণে বিভিন্ন রাজ্য নিজস্ব পুনর্বাসন ও কল্যাণমূলক কর্মসূচি পরিচালনা করতে পারে। পাশাপাশি সেখানে পাচারের শিকার ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংগঠনের একটি তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক রয়েছে।
বাংলাদেশে সামাজিক সুরক্ষা ও পুনর্বাসন কাঠামো তুলনামূলকভাবে বেশি কেন্দ্রীভূত এবং প্রয়োজনের তুলনায় সীমিত। বিশেষ করে পতিতালয়ে জন্ম নেওয়া শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, জন্মনিবন্ধন ও পরিচয়পত্র পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য তাদের প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সামাজিক বঞ্চনার ঝুঁকিতে ফেলছে।
কী ধরনের সংস্কার প্রয়োজন?
আমার মতে, দুই দেশের ক্ষেত্রেই শুধু যৌনকর্ম বৈধ না অবৈধ, এই বিতর্কের বাইরে গিয়ে বাস্তব সুরক্ষার দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। মানবপাচারের বিরুদ্ধে কার্যকর তদন্ত ও দ্রুত বিচার, যৌনকর্মীদের জন্য বৈষম্যহীন স্বাস্থ্যসেবা, আইনি সহায়তা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং নির্যাতন থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি।
একই সঙ্গে যারা যৌনকর্ম থেকে বেরিয়ে আসতে চান, তাদের জন্য প্রশিক্ষণ, বিকল্প কর্মসংস্থান, নিরাপদ আবাসন, শিক্ষা ও আর্থিক সহায়তাভিত্তিক পুনর্বাসন ব্যবস্থা প্রয়োজন। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে তাদের পিতামাতার পেশার কারণে কোনো ধরনের বৈষম্য করা উচিত নয়।
উপসংহার
বাংলাদেশ ও ভারতের অভিজ্ঞতা দেখায়, আইনগত স্বীকৃতি নিজে থেকে মানবিক সুরক্ষা নিশ্চিত করে না। যখন একটি পেশা কাগজে সরাসরি অপরাধ নয়, কিন্তু সেই পেশাকে ঘিরে থাকা প্রায় সব কার্যক্রম অপরাধের আওতায় থাকে, তখন সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী সহজেই আইনগত অনিশ্চয়তা ও শোষণের মধ্যে পড়ে।
অতএব, দুই দেশের নীতিনির্ধারকদের সামনে মূল প্রশ্ন যৌনকর্মকে নতুন করে বৈধ বা অবৈধ ঘোষণা করা নয়; বরং বিদ্যমান আইন কীভাবে মানবপাচার, জবরদস্তি ও শোষণ প্রতিরোধ করবে এবং একই সঙ্গে যৌনকর্মীদের মানবিক মর্যাদা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করবে। আইনের স্বীকৃতি তখনই অর্থবহ হবে, যখন তার সঙ্গে বাস্তব সুরক্ষা যুক্ত হবে।
Reference:
