ড. নুরুজ্জামান খান
অ্যাডিলেড ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়া
এ লেখায় নির্বাচন কমিশনের চলতি বছরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন না করার সিদ্ধান্ত এবং এর ফলে বাংলাদেশের আঞ্চলিক শাসনব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা ও ঝুঁকিতে থাকা নাগরিকদের সুরক্ষার ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
প্রথম দেখায়, নভেম্বর বা ডিসেম্বরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন না হওয়ার ঘোষণা নিছক একটি প্রশাসনিক সময়সূচির বিষয় বলে মনে হতে পারে। শুরুতে অক্টোবরকে লক্ষ্য করে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। পরে নভেম্বরের দিকে সময়সূচি ঘোষণার কথা ভাবা হয়। এখন সেই সময়ও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণের আগে সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করা হয়নি, এমন আপত্তি জানানোর পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে নির্ধারিত অংশীজনের আলোচনা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে পরিকল্পিত বৈঠকও বাতিল করা হয়েছে। প্রশাসনিক এই টানাপোড়েনের আড়ালে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি বাস্তবতা রয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভাসহ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো জন্মনিবন্ধন থেকে শুরু করে বিরোধ মীমাংসা এবং সংকটের সময়ে প্রাথমিক সাড়া দেওয়ার মতো নানা দায়িত্ব পালন করে। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানকে নতুন জনসমর্থন বা নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব ছাড়াই প্রত্যাশার চেয়ে আরও দীর্ঘ সময় কাজ করতে হবে। নির্বাচন কমিশনের বর্তমান বক্তব্যে সময়সূচি নিয়ে যে অনিশ্চয়তা দেখা যাচ্ছে, তাতে নির্বাচন পরের বছর পর্যন্তও গড়াতে পারে।
স্থানীয় সরকার অপেক্ষা করে থাকতে পারে না কেন
স্থানীয়ভাবে নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো আনুষ্ঠানিক কাঠামো মাত্র নয়। বিশেষ করে বড় শহরের বাইরে নাগরিকদের সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রথম, অনেক ক্ষেত্রে একমাত্র, সরাসরি যোগাযোগের জায়গা এসব প্রতিষ্ঠান।
নির্বাচিত পদগুলো যখন তত্ত্বাবধায়ক, প্রশাসক বা নির্ধারিত মেয়াদের পরও দায়িত্ব পালন করে যাওয়া কর্মকর্তাদের হাতে থাকে, তখন নির্বাচনের মাধ্যমে যে জবাবদিহি নিশ্চিত হওয়ার কথা, তা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়। সামনে নির্বাচন থাকলে স্থানীয় প্রতিনিধিদের যে রাজনৈতিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা তৈরি হয়, তা কমে যায়। স্থানীয় পুলিশ সমন্বয় ও বিরোধ নিষ্পত্তির ওপর নজরদারিও দুর্বল হতে পারে। ফলে জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর উপস্থিতি যেখানে তুলনামূলকভাবে কম, সেখানেই শাসনব্যবস্থায় একটি ফাঁক তৈরি হয়।
আঞ্চলিক আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রেও বিষয়টির গুরুত্ব অনেক। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও স্থানীয় পরিষদের সদস্যরা প্রায়ই এমন বিরোধে অনানুষ্ঠানিক মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেন, যা অন্যথায় সংঘাতে রূপ নিতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে অপরাধের নতুন প্রবণতা সম্পর্কে পুলিশ ও প্রশাসনকে তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
আইনশৃঙ্খলার বর্তমান পরিস্থিতিতে বিলম্বের প্রশ্ন
স্থানীয় সরকার নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তকে সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশে সম্প্রতি শিশু নির্যাতন ও হত্যার বেশ কিছু গুরুতর ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গত কয়েক মাসে নিখোঁজ বেশ কয়েকজন শিশুর মৃতদেহ উদ্ধারের ঘটনায় জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, বিশেষ করে দেশের আঞ্চলিক ও গ্রামীণ এলাকায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ নাগরিকদের সুরক্ষার দায়িত্ব আসলে কতটা কার্যকরভাবে পালন করা হচ্ছে।
এর পাশাপাশি মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়েও বিভিন্ন প্রশ্ন উঠেছে। তদন্ত শেষ করতে দীর্ঘ সময় লাগা, স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহির দুর্বল কাঠামো এবং ঢাকার বাইরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতার অসমতা নিয়ে নাগরিক সমাজ ও সাধারণ মানুষের উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কার্যকর ও সদ্য নির্বাচিত স্থানীয় সরকার কোনো বিলাসিতা নয়। কমিউনিটি পর্যায়ে নজরদারি, তথ্য জানানোর ব্যবস্থা এবং সামাজিক জবাবদিহি তৈরি করার ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কোনো অপরাধ বা নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে দ্রুত সাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রেও এই কাঠামো কাজে আসতে পারে।
নির্বাচন কমিশন ও সরকারের মধ্যে পরামর্শ এবং সময়সূচি নিয়ে মতবিরোধের কারণে স্থানীয় নির্বাচন অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে গেলে জনমনে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে আঞ্চলিক পর্যায়ে কার্যকর শাসনব্যবস্থার ধারাবাহিকতা প্রক্রিয়াগত বিরোধের তুলনায় কম গুরুত্বপূর্ণ।
নির্বাচন কমিশনের সামনে যে বিকল্পগুলো ছিল
অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার বদলে নির্বাচন কমিশনের সামনে আরও কয়েকটি পথ খোলা ছিল। প্রশাসনিকভাবে প্রস্তুত এবং তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোতে আগে নির্বাচন আয়োজন করা যেত। একই সময়ে অধিক সংবেদনশীল এলাকাগুলোতে প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা সমন্বয়ের কাজ চালানো যেত। স্থানীয় সরকারের পুরো কাঠামোকে একসঙ্গে নির্বাচন হবে অথবা হবে না, এমন একটি ব্যবস্থার মধ্যে না রেখে ধাপে ধাপে নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব ছিল।
নির্বাচন কমিশন নির্দিষ্ট শর্ত ও সময়সীমাসহ একটি বাধ্যতামূলক কর্মপরিকল্পনাও প্রকাশ করতে পারত। এর বদলে বারবার অনানুষ্ঠানিক সময়ের কথা বলা হয়েছে। অক্টোবর থেকে নভেম্বর, এরপর নভেম্বরও বাদ পড়েছে। এখন জানুয়ারির কথা বলা হলেও সেটি কোনো নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি নয়, বরং একটি সম্ভাব্য সময় হিসেবে সামনে এসেছে।
পরামর্শ নিয়ে যে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে, তার প্রকৃত কারণও স্থানীয় সরকার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশনের যৌথভাবে প্রকাশ করা একটি বিবৃতির মাধ্যমে পরিষ্কার করা যেত। নির্বাচন কেন পিছিয়ে গেল, সে বিষয়ে অস্পষ্টতা অনেক সময় বিলম্বের চেয়েও বেশি জনআস্থার ক্ষতি করে।
সরকারের অভ্যন্তরীণ আলোচনা শেষ হওয়ার পর রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে কথা বলার বদলে সেই আলোচনা একই সময়ে চালানো যেত। তাতে অংশীজনদের সঙ্গে যে আস্থার সম্পর্ক রয়েছে, তা ধরে রাখার সুযোগ থাকত। নির্ধারিত বৈঠক বাতিল হওয়ায় সেই আস্থাই এখন প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
সামনে এগোতে যে সংস্কারগুলো প্রয়োজন
স্থানীয় সরকারকে আঞ্চলিক আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতা মোকাবিলায় আরও কার্যকর করতে কয়েকটি সংস্কার বিবেচনা করা যেতে পারে। নির্বাচন কমিশন ও স্থানীয় সরকার বিভাগের মধ্যে আগাম এবং বাধ্যতামূলক যৌথ পরামর্শের জন্য আইনি বিধান করা হলে শেষ মুহূর্তে কোনো পক্ষের আপত্তির কারণে নির্বাচন পিছিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমবে। প্রশাসকের অধীনে একটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান কতদিন পরিচালিত হতে পারবে, সে বিষয়েও স্পষ্ট আইনি সময়সীমা থাকা প্রয়োজন। এতে বর্তমান অনিশ্চয়তা অনেকটাই কমবে।
স্থানীয় পর্যায়ে নিরাপত্তা সমন্বয় আরও শক্তিশালী করা দরকার। ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের সঙ্গে শিশু সুরক্ষা কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ তৈরি করা গেলে সাম্প্রতিক নির্যাতনের ঘটনাগুলো মোকাবিলায় তা কাজে আসতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকেও আরও স্বচ্ছতা প্রয়োজন। শুধু সংক্ষিপ্ত বক্তব্য না দিয়ে নির্বাচন নিয়ে করা নিরাপত্তা মূল্যায়ন প্রকাশ করা হলে নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা কতটা বাস্তব, তা নাগরিকদের নিজেদের বিচার করার সুযোগ থাকবে। এসব সংস্কার ছাড়া নির্বাচনের তারিখ বারবার পরিবর্তন এবং অস্পষ্ট আশ্বাসই ধীরে ধীরে স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে।
