রুকসানা আখতার
স্বতন্ত্র স্থপতি
বাংলাদেশের জ্বালানি কৌশলে সৌরবিদ্যুৎকে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় নেওয়ার উদ্যোগ জোরদার হয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ছাদভিত্তিক ও বড় পরিসরের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে নানা ধরনের প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। দেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা সৌরবিদ্যুতের পক্ষে শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে সেই সম্ভাবনাকে দীর্ঘস্থায়ী ও সবার জন্য সমান সুফলে রূপ দিতে শুধু ভর্তুকি কিংবা সৌর প্যানেল স্থাপন যথেষ্ট নয়।
বাংলাদেশের জন্য সৌরবিদ্যুতের যৌক্তিকতা
বাংলাদেশ এমন একটি অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে সারা বছরই সূর্যের আলো তুলনামূলকভাবে প্রচুর পাওয়া যায়। নগরায়ণ ও মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ছে। পাশাপাশি সৌর প্যানেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রযুক্তির ব্যয় ক্রমেই কমছে। ফলে দেশের জন্য নতুন বিদ্যুৎ উৎপাদনের তুলনামূলক সাশ্রয়ী উৎস হিসেবে সৌরবিদ্যুতের গুরুত্ব আরও বাড়ছে।
বড় পরিসরে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ সম্ভব, তার বাস্তব প্রমাণও বাংলাদেশ দিয়েছে। দেশের বিদ্যুৎবিহীন অঞ্চলে সৌরবিদ্যুৎ কর্মসূচির মাধ্যমে লাখ লাখ গ্রামীণ পরিবার বিদ্যুতের আওতায় এসেছে। পাশাপাশি বড় আকারের কয়েকটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের উদ্যোগও এগিয়ে চলছে। এসব অর্জন নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ এবং ভবিষ্যতের প্রণোদনা কর্মসূচির জন্য শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে।
কোথায় এসে গতি থমকে যাচ্ছে
তবে এসব অগ্রগতির পরও সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের গতি যেন একটি সীমায় এসে আটকে গেছে। অর্থায়নের ঘাটতি, উচ্চ ঝুঁকির আশঙ্কা এবং অনিশ্চিত নিয়ন্ত্রক কাঠামোর কারণে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের বড় অংশ এখনো সতর্ক। বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণের কাঠামোয় অসামঞ্জস্য, অনুমোদন প্রক্রিয়ায় ধীরগতি এবং বিদ্যুৎ কেনার ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে।
বিদ্যুৎ সঞ্চয়ের সীমিত সক্ষমতা ও পুরোনো অবকাঠামোও বড় বাধা। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সূর্যের আলোর ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এর উৎপাদনে ওঠানামা থাকে। সেই পরিবর্তনশীল উৎপাদনকে সামাল দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত সঞ্চয় ও সঞ্চালন ব্যবস্থা না থাকলে উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি অংশ ব্যবহার না করেই ফেলে রাখতে হতে পারে। ফলে প্রকল্পের অর্থনৈতিক কার্যকারিতাও দুর্বল হয়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জমির সংকট। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশে বড় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় জমি পাওয়া কঠিন। কৃষিজমি ও বসতি এলাকার সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জমির চাহিদার সরাসরি প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে। ফলে শুধু সৌর প্যানেল স্থাপনের জন্য প্রণোদনা দিলেই এসব মৌলিক সমস্যার সমাধান হবে না।
উদ্যোগের স্থায়িত্ব কতটা
সৌরবিদ্যুৎ কর্মসূচির সাফল্য শুধু কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে, সেই হিসাব দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। সৌর প্যানেল কেনার জন্য ভর্তুকি দেওয়া হলেও যদি বিদ্যুৎ সঞ্চয় ও জাতীয় গ্রিড আধুনিকায়নে সমান বিনিয়োগ না থাকে, তাহলে উৎপাদিত বিদ্যুৎ নির্ভরযোগ্যভাবে ভোক্তার কাছে পৌঁছানো কঠিন হবে। ফলে কর্মসূচির পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক দুই ধরনের সুফলই প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
টেকসই সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে গ্রিড আধুনিকায়নের সঙ্গে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর কাজও সমান্তরালে এগিয়ে নিতে হবে। স্মার্ট মিটার, ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং বড় পরিসরের ব্যাটারি সঞ্চয় ব্যবস্থা সম্প্রসারণ জরুরি। নতুন সৌরবিদ্যুৎ যেন অপচয় না হয়ে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুতে পরিণত হয়, সেই নিশ্চয়তা দিতে হবে।
জমির ব্যবহারেও নতুন চিন্তা প্রয়োজন। জলাধারে ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা, একই জমিতে কৃষিকাজ ও সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সমন্বিত পদ্ধতি, ভবনের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপন এবং অনুর্বর বা পরিত্যক্ত জমির ব্যবহার করা যেতে পারে। খাদ্য উৎপাদন ও বসতি উচ্ছেদ না করে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের জন্য এমন পদ্ধতিই বাংলাদেশের মতো জমিসংকটপূর্ণ দেশের জন্য বেশি কার্যকর।
প্রকৃত সুফল কারা পাবে
সৌরবিদ্যুৎ উদ্যোগের প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে কারা সেই সুবিধা পাচ্ছে তার ওপর। যদি মূল সুবিধা উচ্চ আয়ের পরিবার ও বড় প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, যারা সহজেই অর্থায়ন পেতে পারে, তাহলে জ্বালানি বৈষম্য কমার বদলে আরও বাড়তে পারে।
স্বল্প আয়ের পরিবার ও ছোট ব্যবসার কাছে সৌরবিদ্যুতের সুযোগ পৌঁছে দিতে এমন কিছু অর্থায়ন ব্যবস্থা প্রয়োজন, যা এখনো বড় পরিসরে গড়ে ওঠেনি। স্বল্পসুদে ঋণ, ঋণের নিশ্চয়তা ও বিনিয়োগের সমন্বয়ে মিশ্র অর্থায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার জন্য ব্যবহার অনুযায়ী ধাপে ধাপে মূল্য পরিশোধের সুযোগ এবং স্থানীয় মুদ্রায় অর্থায়নের ব্যবস্থাও করা দরকার। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের ঝুঁকি কমবে।
এসব ব্যবস্থা ছাড়া সৌরবিদ্যুতের প্রণোদনার সুফল মূলত শহরের ছাদ ও বড় বিদ্যুৎ প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা রয়েছে। প্রচলিত ঋণব্যবস্থার বাইরে থাকা পরিবার ও ছোট ব্যবসাগুলোর কাছেও সেই সুযোগ পৌঁছে দিতে অর্থায়ন ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন প্রয়োজন।
জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের আলোকে মূল্যায়ন
সাশ্রয়ী ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানি নিশ্চিত করার জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের সপ্তম লক্ষ্যের সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের উদ্যোগের যথেষ্ট সামঞ্জস্য রয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ আধুনিক জ্বালানির সুযোগ বাড়াতে পারে এবং ব্যয়বহুল জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সহায়তা করতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার ত্রয়োদশ লক্ষ্যের ক্ষেত্রেও সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা স্পষ্ট। জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন কমানো পরিবেশের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে। তবে সৌর প্যানেলের ব্যবহার শেষে পুনর্ব্যবহার এবং প্রকল্প স্থাপনের আগে পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব যাচাইয়ের ব্যবস্থা কর্মসূচির শুরু থেকেই রাখতে হবে। পরে ভাবার বিষয় হিসেবে রাখলে চলবে না।
অন্যদিকে শোভন কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার অষ্টম লক্ষ্য এবং বৈষম্য কমানোর দশম লক্ষ্যের সঙ্গে বাস্তব অগ্রগতির চিত্র অনেক বেশি অনিশ্চিত। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেই এসব লক্ষ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে অর্জিত হবে না। স্থানীয়ভাবে সৌর প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম উৎপাদন, দক্ষ কর্মী তৈরি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মালিকানা ও অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
বাস্তবায়নের পথে বাধা
সৌরবিদ্যুৎ উদ্যোগের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনের পথে বেশ কিছু বড় বাধা রয়েছে। ছোট উদ্যোক্তা ও সাধারণ পরিবারের জন্য অর্থায়ন এখনো কঠিন। বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ ও প্রকল্প বাস্তবায়নের নিয়মে অনিশ্চয়তা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করছে। অনুমোদন ও জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়াও বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে ধীর ও জটিল হয়ে আছে।
এর পাশাপাশি বিদ্যুৎ সঞ্চয় ও বিতরণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে দিতে হতে পারে। ফলে শুধু সৌর প্যানেল স্থাপনের সংখ্যা বাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব নয়।
এসব সমস্যার সমাধান একসঙ্গে না করলে প্রণোদনা কর্মসূচি হয়তো আংশিক সাফল্য অর্জন করবে, তবে তার সুফল সীমাবদ্ধ থাকবে প্রভাবশালী ও অর্থায়ন সুবিধাপ্রাপ্ত বড় উদ্যোক্তাদের মধ্যে। জাতীয় পর্যায়ে জ্বালানি ব্যবস্থার কাঙ্ক্ষিত রূপান্তর তখন সম্ভব হবে না।
সাফল্যের জন্য তিনটি সংস্কার
বাংলাদেশের জন্য সৌরবিদ্যুৎকে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করার নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গি যথার্থ। সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছাও আশাব্যঞ্জক। তবে এই সাফল্য ধরে রাখতে অন্তত তিনটি সংস্কার জরুরি।
প্রথমত, দীর্ঘমেয়াদি ও প্রযুক্তিনিরপেক্ষ নবায়নযোগ্য জ্বালানি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি ডিজিটাল পদ্ধতিতে দ্রুত অনুমোদনের ব্যবস্থা এবং অভিন্ন চুক্তির কাঠামো চালু করা প্রয়োজন। বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার জন্য নীতিগত নিশ্চয়তা দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণে স্থিতিশীল ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র এবং মিশ্র অর্থায়নের সুযোগ বাড়াতে হবে। এর ফলে শুধু বড় প্রতিষ্ঠান নয়, ছোট উদ্যোক্তা ও সাধারণ পরিবারও সৌরবিদ্যুৎ কর্মসূচিতে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে।
তৃতীয়ত, সামাজিক ন্যায্যতার একটি সুস্পষ্ট কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। স্থানীয় উৎপাদন, দক্ষ কর্মী তৈরি, জনগোষ্ঠীর মালিকানা এবং লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকিকে সেই কাঠামোর অংশ করতে হবে। সূর্যের আলো যেমন সবার জন্য উন্মুক্ত, সৌরবিদ্যুতের সুফলও যেন তেমনি সমাজের বিস্তৃত অংশের কাছে পৌঁছে যায়, নীতিনির্ধারণে সেই লক্ষ্যই অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।
