আমিরা হায়দার
স্বতন্ত্র স্থপতি
২০২৬ সালের ২৬ আগস্ট সকালে নেপালের রাসুয়া জেলার তিমুরে ও সিয়ারুবেশি এলাকায় কোনো পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই প্রায় ১০ মিটার উঁচু পানির ঢল নেমে আসে। উজানে উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলের একটি হিমবাহ হ্রদের আকস্মিক বাঁধভাঙা স্রোতের ফলে ভোতেকোশি নদীর পানি দ্রুত বেড়ে যায়। সেই স্রোত বাণিজ্যিক অবকাঠামো ধ্বংস করে, সেতু ভেঙে দেয়, পুলিশের স্থাপনা নিশ্চিহ্ন করে এবং বহু বছরের প্রচেষ্টায় নির্মিত জলবিদ্যুৎ অবকাঠামোকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
দ্য ডেইলি স্টার-এ পরিবেশবিজ্ঞানী সন্দীপ যোশি লিখেছেন, নেপালের কর্তৃপক্ষ এমন ঘটনার পর একে ‘অভূতপূর্ব’ বলে উল্লেখ করতে পারে। কিন্তু গত এক দশকেই একই ধরনের বিপর্যয়ে এই অঞ্চল একাধিকবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে ঘটনাটি প্রকৃত অর্থে অভূতপূর্ব ছিল না। বরং ঘাটতি ছিল বাস্তবতাভিত্তিক পরিকল্পনায়।
নেপালের এই অভিজ্ঞতাকে বাংলাদেশের কাছে শুধু প্রতিবেশী দেশের দুর্ভাগ্য হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং নিজেদের ভবিষ্যতের একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা প্রয়োজন। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর মিলনস্থলে অবস্থিত বাংলাদেশ হিমালয় অঞ্চলের বিশাল জলাধারভূমির সম্মিলিত পানি প্রবাহ গ্রহণ করে। উজানে ঘটে যাওয়া যেকোনো বড় ধরনের প্রাকৃতিক ঘটনা, নেপালে হিমবাহ হ্রদের আকস্মিক বাঁধভাঙা স্রোত, ভুটানে অস্বাভাবিক বর্ষণ কিংবা মেঘালয়ের পাহাড়ি এলাকায় অতিবৃষ্টি, ভাটির বাংলাদেশে ভয়াবহ বন্যার রূপ নিতে পারে।
২০২৪ সালের আগস্টে এই ভৌগোলিক বাস্তবতার ভয়াবহ প্রতিফলন দেখা গিয়েছিল। ওই বন্যায় অন্তত ৭১ জনের মৃত্যু হয়, পাঁচ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হন এবং ৫০ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ১৪ হাজার ৪২১ কোটি টাকা। সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ বন্যা হিসেবে ঘটনাটি বিবেচিত হয়েছিল। কিন্তু সেটিই শেষ ঘটনা হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। বরং সামনে আরও বড় ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এই বাস্তবতাকে তাই বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা প্রয়োজন।
যে পরিসংখ্যানের সীমাবদ্ধতা বাংলাদেশ আর বহন করতে পারে না
নেপাল নিয়ে সন্দীপ যোশির বিশ্লেষণের মূল বক্তব্য বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়ার পরিকল্পনাবিদ ও প্রকৌশলীরা দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামো নির্মাণে অতীতের গড় পরিসংখ্যানের ওপর নির্ভর করেছেন। গড় বার্ষিক বৃষ্টিপাত, বর্ষায় নদীর গড় পানিপ্রবাহ কিংবা নির্দিষ্ট মৌসুমে সাধারণত যে উচ্চতায় পানি ওঠে, এসব তথ্যের ভিত্তিতেই অনেক প্রকল্পের নকশা তৈরি হয়েছে।
এই পরিসংখ্যান পাঁচ বছর মেয়াদি বাজেট ও উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্য সুবিধাজনক। কিন্তু যে ঘটনাগুলো একটি দেশের অবকাঠামো ধ্বংস করে দেয়, সেগুলো সাধারণ দিনের ঘটনা নয়। অবকাঠামো সাধারণ পরিস্থিতিতে ভেঙে পড়ে না। ভেঙে পড়ে যখন অস্বাভাবিক মাত্রার কোনো ঘটনা ঘটে, যখন নদী তার গড় রূপে নয়, চরম রূপে হাজির হয়।
স্বাভাবিক বর্ষার পানিপ্রবাহ সামলানোর মতো করে নির্মিত একটি সেতু বা বাঁধ অতিরিক্ত পানির চাপের মুখে ব্যর্থ হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয় অঞ্চলে পরিবর্তনও এখন আর ধীরে ধীরে তাপমাত্রা বৃদ্ধির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং চরম আবহাওয়ার ঘটনাগুলোর পরিসর বাড়ছে।
যেসব হিমবাহ একসময় ধীরে ধীরে গলিত পানি সরবরাহ করে নদীর প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করত, সেগুলো এখন আকস্মিক ও বিপুল পানিপ্রবাহের ঝুঁকি তৈরি করছে। অর্থাৎ চরম ঘটনাগুলো এখন আর বিরল ব্যতিক্রম হিসেবে থাকছে না। বাংলাদেশের পরিকল্পনা কাঠামোকে সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলাতে হবে।
বাংলাদেশের সক্ষমতা আছে, ঘাটতিও স্পষ্ট
বন্যা মোকাবিলায় বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা কম নয়। ঘূর্ণিঝড় ও উপকূলীয় বন্যার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বিস্তৃত আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। উপকূলীয় অঞ্চলে দুর্যোগ মোকাবিলায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীভিত্তিক বিভিন্ন কর্মসূচিও বহু মানুষের জীবন রক্ষা করেছে।
বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র, বাঁধ এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের দীর্ঘদিনের কার্যক্রমও রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার বাস্তব উদাহরণ। বিশ্বব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোও সাম্প্রতিক সময়ে সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ ও মহড়ার মাধ্যমে বন্যার ঝুঁকি কমানো এবং স্থানীয় প্রস্তুতি বাড়াতে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবু কাঠামোগত দুর্বলতা রয়ে গেছে।
বাংলাদেশের বন্যা নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামোর বড় অংশ এখনও অতীতের গড় পানিপ্রবাহের ওপর নির্ভর করে পরিকল্পিত। ফলে অস্বাভাবিক মাত্রার পানিপ্রবাহ দেখা দিলে স্বাভাবিক বর্ষায় টিকে থাকা বাঁধও ভেঙে পড়তে পারে। নদী খনন ও নৌপথ রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমও দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনের তুলনায় কম অর্থায়ন এবং অসামঞ্জস্যপূর্ণ বাস্তবায়নের সমস্যায় রয়েছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ নদীপথে পলি জমে পানিপ্রবাহের স্বাভাবিক পথ সংকুচিত হচ্ছে এবং প্লাবনের ঝুঁকি বাড়ছে।
দেশে ৬৪টি জেলা থাকলেও বন্যা ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা এখনও ঢাকাকেন্দ্রিক। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের গ্রামাঞ্চল ও হাওর এলাকার জনগোষ্ঠী, যারা ভারত ও নেপালের জলাধারভূমি থেকে আসা আকস্মিক বন্যার সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে থাকে, স্থানীয় পর্যায়ে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এখনও পর্যাপ্ত সুবিধা পায় না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা সম্ভবত মানসিকতার জায়গায়। বাংলাদেশ এখনও অনেক ক্ষেত্রে বন্যাকে এমন একটি দুর্যোগ হিসেবে বিবেচনা করে, যার পর ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার ব্যবস্থা করতে হবে। অথচ বন্যার আগেই ঝুঁকি কমানো এবং ক্ষতি সহনীয় পর্যায়ে রাখার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। প্রতিবার বড় বন্যার পর একই জায়গায় একই ধরনের বাঁধ পুনর্নির্মাণ করা, কিন্তু নকশা ও সক্ষমতায় পরিবর্তন না আনা, দীর্ঘমেয়াদে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি একই বিপর্যয় পুনরাবৃত্তির সুযোগ তৈরি করে।
বাংলাদেশের এখন যে শিক্ষা বাস্তবায়ন করা জরুরি
প্রথম এবং সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ হওয়া উচিত বন্যাপ্রবণ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নকশায় শুধু গড় পরিসংখ্যানের ওপর নির্ভরতা বন্ধ করা। বাঁধ, সেতু, কালভার্ট, পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা এবং নদীর তীরবর্তী স্থাপনা নির্মাণে চরম পরিস্থিতির ঝুঁকি বিবেচনায় নিতে হবে।
সরকারি প্রকল্প অনুমোদনের আগে উচ্চমাত্রার বন্যার সম্ভাব্যতা যাচাই এবং চাপ সহনশীলতা পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্প পরিকল্পনায় শতবর্ষের মতো দীর্ঘমেয়াদি বন্যা ঝুঁকির মডেল অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, দুর্যোগের পর ত্রাণ ও পুনর্গঠনের পরিবর্তে পূর্বাভাসভিত্তিক পদক্ষেপে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। নেপাল, ভুটান এবং ভারতের আসাম ও মেঘালয় অঞ্চলের উজান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য বাস্তব সময়ভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
সীমান্ত পেরিয়ে তথ্য বিনিময়ের কার্যকর চুক্তি এবং সমন্বিত সতর্কীকরণ ব্যবস্থা থাকলে উজানে অস্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বা হিমবাহ হ্রদের বাঁধভাঙার লক্ষণ দেখা দেওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগেই ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সতর্ক করা সম্ভব। প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এখন অনেকটাই রয়েছে। প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কার্যকর আন্তঃদেশীয় সহযোগিতা।
তৃতীয়ত, নদী ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ নীতিতে মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন। অপরিকল্পিত উন্নয়ন এবং ভূমি ব্যবহারের দুর্বল নিয়ন্ত্রণের কারণে জলাভূমি ও বন্যাপ্রবণ অঞ্চল দখল হচ্ছে। ফলে হাওর ও নদীতীরবর্তী এলাকার প্রাকৃতিকভাবে পানি ধারণ করার সক্ষমতা কমে যাচ্ছে। জলাভূমি ও বন্যাপ্রবণ ভূমিকে আইনগতভাবে সুরক্ষিত করা শুধু পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয় নয়। বন্যা মোকাবিলার ক্ষেত্রেও এগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক অবকাঠামো।
যে জলবায়ু আছে, তার জন্য অবকাঠামো গড়তে হবে
নেপাল নিয়ে সন্দীপ যোশির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণগুলোর একটি হলো, দেশটি এমন একটি জলবায়ুর জন্য অবকাঠামো তৈরি করছে, যে জলবায়ু বাস্তবে আর নেই। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা, অবকাঠামোর নকশা বিধিমালা এবং দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অনেক ধারণা এমন একটি স্থিতিশীল জলবায়ুর ভিত্তিতে তৈরি হয়েছিল, যাকে জলবায়ু পরিবর্তন ইতোমধ্যে বদলে দিয়েছে। তাই বন্যা ব্যবস্থাপনায় অতীতের গড় পরিসংখ্যানের পরিবর্তে সম্ভাব্য চরম পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন এখনই। প্রতিটি বছর দেরি মানে ভবিষ্যতের আরও বড় দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ানো।
বাংলাদেশ বহুবার প্রমাণ করেছে, ভয়াবহ প্রতিকূলতার মধ্যেও একটি জাতি কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারে। কিন্তু প্রতিরোধযোগ্য দুর্যোগের পর বারবার ঘুরে দাঁড়ানোর মূল্যও কম নয়। সেই মূল্য শুধু টাকায় পরিমাপ করা যায় না। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের জীবন, জীবিকা এবং বছরের পর বছর নিজেদের ঘরবাড়ি ও অর্থনীতি পুনর্গঠনে বাধ্য হওয়া জনগোষ্ঠীর মানসিক ও সামাজিক ক্লান্তি।
নেপালের প্লাবিত উপত্যকা বাংলাদেশের জন্য যে শিক্ষা রেখে যাচ্ছে, তা প্রকৃতি অনির্দেশ্য, শুধু এতটুকু নয়। বরং বড় প্রশ্ন হলো, যেসব বিপদের লক্ষণ আগে থেকেই দেখা যাচ্ছে, সেগুলোর সামনে আমরা কেন বারবার বিস্মিত হচ্ছি।
বাংলাদেশ চাইলে ভিন্নভাবে প্রস্তুতি নিতে পারে। বন্যা আসার পর ক্ষতি সামলানোর বদলে বন্যা আসার আগেই ঝুঁকি কমানো, অবকাঠামোকে চরম পরিস্থিতির উপযোগী করা এবং নদী ও জলাভূমির প্রাকৃতিক ভূমিকা পুনরুদ্ধার করাই হতে পারে সেই পরিবর্তনের শুরু।
তথ্যসূত্র
