ডেস্ক রিপোর্ট
আজকের বিশ্বে রোবট প্রযুক্তি ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ধীরে ধীরে একটি দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হয়ে উঠছে। এর প্রভাব কারখানার উৎপাদনশীলতার গণ্ডি ছাড়িয়ে বাণিজ্যিক সম্পর্ক, প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি এবং শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকেও প্রভাবিত করছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পরিচিতি মূলত পোশাক রপ্তানি ও শ্রম অভিবাসনের কারণে। ফলে রোবট প্রযুক্তিতে প্রবেশ বাংলাদেশের জন্য শুধু অর্থনীতির নতুন একটি খাত তৈরির বিষয় নয়, এর সঙ্গে ভূরাজনৈতিক গুরুত্বও জড়িয়ে আছে।
ভারত ও চীন তাদের শিল্প ও প্রতিরক্ষা কৌশলের কেন্দ্রে রোবট প্রযুক্তি এবং স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা রেখেছে। দুই দেশের কাছাকাছি অবস্থান বাংলাদেশের সামনে সীমিত হলেও বাস্তব একটি সুযোগ তৈরি করেছে। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে দক্ষিণ এশিয়ার প্রযুক্তি সরবরাহ ব্যবস্থায় বাংলাদেশ শুধু তৈরি রোবট কেনার দেশ না থেকে ছোট হলেও বিশ্বাসযোগ্য একটি অংশীদার হয়ে উঠতে পারে।
দেশের ভেতরে রোবট প্রযুক্তির সামান্য সক্ষমতাও দীর্ঘ মেয়াদে আমদানি করা স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা কমাতে পারে। বিশেষ করে পোশাক ও হালকা শিল্পে আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর চাপ যখন বাড়ছে, তখন এই সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ যদি অন্তত মৌলিক পর্যায়ে শিল্পকারখানায় ব্যবহারের রোবট তৈরি বা স্থানীয় প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন করতে পারে, তাহলে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ আলোচনায় দেশ কিছুটা বাড়তি দরকষাকষির ক্ষমতা পাবে। শুধু আমদানিনির্ভর অর্থনীতির পক্ষে যে সুবিধা পাওয়া কঠিন।
দেশীয় ও আঞ্চলিক বাজারের সুযোগ
বাংলাদেশকে মানবাকৃতির রোবট বা অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা রোবট তৈরির ক্ষেত্রে বিশ্বের শীর্ষ পর্যায়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে হবে না। সীমিত সম্পদ এমন খাতে ব্যয় করে দ্রুত সেই পর্যায়ে যাওয়ার চেষ্টা বরং স্থানীয় প্রয়োজন থেকে বাংলাদেশকে দূরে সরিয়ে নিতে পারে। বাস্তবসম্মত সুযোগ রয়েছে ছোট কৃষকের উপযোগী কৃষি রোবট তৈরিতে। জমি খণ্ড খণ্ড এবং কৃষকের পুঁজি সীমিত হওয়ায় বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি পশ্চিমা দেশগুলোর বৃহৎ আকারের কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ব্যবস্থার চেয়ে ভিন্ন হবে।
পোশাক কাটিং ও মান যাচাইয়ের কাজে কম খরচের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা আরেকটি বাস্তবসম্মত সূচনা হতে পারে। বিশেষ করে বড় পরিসরে নির্ভুলতা বজায় রেখে হাতে করা কাজ চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে এবং ক্রেতারাও এখন আরও বেশি নির্ভুলতা প্রত্যাশা করছেন।
দুর্যোগ মোকাবিলায় রোবট প্রযুক্তির ব্যবহারও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্ষেত্র হতে পারে। নিয়মিত বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের মুখে পড়া একটি দেশে উদ্ধারকাজে রোবট ব্যবহার করলে প্রাণহানি ও সাড়া দেওয়ার সময় দুটোই কমানো সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে এমন প্রযুক্তি দেশের মানুষের বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। এই ক্ষেত্রগুলোর প্রতিটি স্থানীয় সমস্যার সমাধানের পাশাপাশি ব্যবহারিক প্রযুক্তি সক্ষমতা তৈরির সুযোগ দেবে। সময়ের সঙ্গে সেই সক্ষমতা রপ্তানিযোগ্য দক্ষতায় পরিণত হতে পারে।
আঞ্চলিক বাজারের দিক থেকেও সুযোগটি গুরুত্বপূর্ণ, বরং দীর্ঘ মেয়াদে আরও টেকসই হতে পারে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর অনেকেই কম খরচে কৃষির যান্ত্রিকীকরণ ও হালকা শিল্পে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালুর একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি। এসব দেশের বাস্তবতা জমির খণ্ডিত মালিকানা, শ্রমবাজার ও স্থানীয় উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত, যা ধনী দেশগুলোর প্রয়োজনের তুলনায় আলাদা।
বাংলাদেশের প্রকৌশল দক্ষতা তুলনামূলকভাবে কম খরচে পাওয়া যায়। এই জনশক্তিকে যথাযথ প্রশিক্ষণ, গবেষণার সুযোগ ও দেশে কাজ করার পরিবেশ দেওয়া গেলে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো একই ধরনের উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী রোবট প্রযুক্তি সরবরাহ করতে পারে। তাতে বাংলাদেশ আমদানিকৃত প্রযুক্তির ক্রেতা থেকে স্থানীয় বাস্তবতার উপযোগী প্রযুক্তির রপ্তানিকারক হয়ে ওঠার সুযোগ পাবে।
অবকাঠামোগত ঘাটতি ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা
তবে এসব সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে হলে প্রথমেই দেশের গুরুতর অবকাঠামোগত ঘাটতিগুলো মোকাবিলা করতে হবে। রোবট প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণার জন্য নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, উন্নত উৎপাদন সরঞ্জাম, সূক্ষ্ম যন্ত্রাংশের সরবরাহব্যবস্থা এবং বিশেষায়িত গবেষণাগার প্রয়োজন। বাংলাদেশের মাত্র কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে এই সুবিধাগুলো রয়েছে। আঞ্চলিক অন্যান্য দেশের তুলনায় এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোই দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনের তুলনায় কম অর্থায়ন পেয়ে আসছে।
রোবটের নকশা ও কার্যক্রমের কম্পিউটারভিত্তিক অনুকরণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে প্রযুক্তির সমন্বয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ইন্টারনেট সংযোগ ও কম্পিউটিং অবকাঠামোও দেশের সব জায়গায় সমান নয়। বড় শহরের বাইরে এই সুবিধার ঘাটতি থাকায় কোথায় কার্যকর গবেষণা চালানো সম্ভব, সেই পরিসরও সীমিত হয়ে আছে।
সরবরাহব্যবস্থা ও দক্ষ জনশক্তির ওপর নির্ভরতা
এর চেয়েও বড় দুর্বলতা সম্ভবত সরবরাহব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা। রোবট তৈরির গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব যন্ত্রাংশ, যেমন সংবেদক, চালনাযন্ত্র, ক্ষুদ্র নিয়ন্ত্রক এবং বিশেষায়িত অর্ধপরিবাহী, অল্প কয়েকটি দেশের ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে প্রধান সরবরাহকারী চীন, যুক্তরাষ্ট্র এবং পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশ। ফলে বাংলাদেশের কোনো রোবট প্রযুক্তি উদ্যোগ এমন ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে, যার ওপর দেশের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ খুবই সীমিত। রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা, বাণিজ্য বিরোধ কিংবা বিশ্ববাজারে অর্ধপরিবাহী যন্ত্রাংশের সরবরাহে আকস্মিক সংকট, যেকোনো ঘটনাই এই খাতকে প্রভাবিত করতে পারে।
দক্ষ জনশক্তির ওপর নির্ভরতাও সেই দুর্বলতাকে আরও বাড়ায়। বাংলাদেশে বর্তমানে বিশেষায়িত রোবট প্রকৌশলীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। যারা বিদেশে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেন, তাদের অনেকেরই দেশে ফিরে থাকার চেয়ে বিদেশে থেকে যাওয়ার কারণ বেশি থাকে। সেখানে গবেষণার অর্থায়ন, যন্ত্রপাতি ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তুলনামূলকভাবে ভালো।
সরকার যদি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা অর্থায়ন, প্রতিযোগিতামূলক বেতন এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের যৌথ কাজের সুযোগ নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে রোবট প্রযুক্তির যেকোনো উদ্যোগ অল্পসংখ্যক দক্ষ ও সহজে স্থানান্তরযোগ্য জনশক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। দক্ষ মানুষের এই ঘাটতি অব্যাহত থাকলে রোবট প্রযুক্তির মতো দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় ধারাবাহিকতা ধরে রাখা কঠিন হবে।
সরকারের সিদ্ধান্তের গুরুত্ব
বাংলাদেশের রোবট প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন পরীক্ষামূলক প্রকল্প বা প্রতীকী অর্থ বরাদ্দের ওপর নির্ভর করবে না। প্রয়োজন হবে দীর্ঘমেয়াদি ও ধারাবাহিক সরকারি নীতির। রোবট প্রযুক্তির গবেষণায় কয়েক বছর ধরে বিনিয়োগ করতে হয়, অথচ অল্প সময়ে তার সুফল পাওয়া নাও যেতে পারে। সীমিত জাতীয় বাজেটে তাই দ্রুত দৃশ্যমান অবকাঠামো বা সামাজিক খাতে ব্যয়ের সঙ্গে এই গবেষণার প্রতিযোগিতা তৈরি হয়।
অবকাঠামো উন্নয়ন, সরবরাহব্যবস্থার বৈচিত্র্য এবং দক্ষ জনশক্তি ধরে রাখার বিষয়গুলো একসঙ্গে নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সুসংহত কৌশল না থাকলে রোবট প্রযুক্তির যুগে বাংলাদেশ কেবল আমদানিকারক হিসেবেই থেকে যেতে পারে। তখন প্রযুক্তি খাতে আঞ্চলিক অংশীদার হওয়ার পাশাপাশি আগেভাগে ও ধারাবাহিক বিনিয়োগের মাধ্যমে যে অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব তৈরির সুযোগ ছিল, তার বড় অংশই হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।
